উম্মুস সুন্নাহ দারস শীট – 9

Share this article
উম্মুস সুন্নাহ দারস ৯ এর শীট

শীট ডাউনলোড করুন নিচের লিংক থেকে

ইন্সট্রাকটরঃ উস্তায সাঈদুল মোস্তফা

উম্মুস সুন্নাহ কোর্স ইনরোল করুন- https://www.iqrahouse.com/courses/ummus-sunnah/

দারসের কনটেন্ট এখানেও দেয়া হলো-

সামারিঃ

হাদিসে জিবরিল বা উম্মুস সুন্নাহ নিয়ে আমাদের প্রথম আলোচনা ছিল সনদ নিয়ে। মুহাদ্দিসদের হাদিস জমা করার ক্ষেত্রে দুই ধরণের প্রক্রিয়া দেখা যায়। একটি হলো, একই বিষয়ের সাথে সম্পর্কিত সব হাদিস একটি অধ্যায়ে জমা করা। দ্বিতীয়টি হলো, একটি হাদিসের সবগুলো সনদ একটি অধ্যায়ে জমা করা। আমরা হাদিসে জিবরিলে দ্বিতীয় পদ্ধতিতে এর সবগুলো সনদ জমা করেছি। সেই সাথে হাদিসটির সবগুলো প্রেক্ষাপটও জমা করেছি। হাদিসে জিবরিল নিয়ে ইতিপূর্বে এভাবে কোন বিশদ সংকলন হয়নি। তাই আমরা একাজটি করার প্রয়াস পেয়েছিলাম।

হাদিসে জিবরিলের শুরুতে আমরা জিবরিল (আ) এর আগমন, তাঁর পোশাক, বৈশিষ্ট ও আচরণ নিয়ে বিশ্লেষণ করেছি। এক্ষেত্রে স্মরণীয় বিষয় হলো, তিনি একইসাথে বিপরীতধর্মী বৈশিষ্ট্য নিয়ে উপস্থিত হয়েছিলেন। একটি বৈশিষ্ট তাঁকে অপরিচিত থাকতে সহায়তা করেছে, আরেকটি বৈশিষ্ট তাঁর মধ্যে তালেবে ইলমের গুনাগুণ ফুটিয়ে তুলেছে। এখান থেকে আমরা আরেকটি বিষয়ের দিকে যেতে চাই। তা হলো ঈমান নিয়ে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের উলামাদের মধ্যে একটি মতবিরোধ। বিষয়টি হলো- ঈমান কি বাড়ে-কমে? হ্রাস-বৃদ্ধি পায় নাকি একই রকম থাকে? একদল উলামাদের মতে ঈমান হ্রাস বৃদ্ধি পায়, আরেকদল উলামাদের মতে ঈমান নিশ্চল, বাড়েও না, কমেও না। এটা নিয়ে প্রায়ই আপনারা চরম বিতর্ক শুনে থাকবেন, বা এখনও না শুনে থাকলে সামনে শুনতে পাবেন। কিন্তু প্রকৃত বিষয় হলো- এ দুই মতের মধ্যে কোন বিরোধ নেই। উভয় পক্ষই দুইটি আলাদা কনসেপ্ট বা দৃষ্টিভঙ্গিতে দুই রকমের মত দিয়েছেন। যেমনটা আমরা দেখেছি জিবরিল (আ) দুইটি ভিন্ন উদ্দেশ্যে দুই রকমের বৈশিষ্ট্য গ্রহণ করেছিলেন। ঐ দুই বৈশিষ্ট আদতে দেখতে বিপরীতধর্মী মএন হলেও তা ছিলো আসলে একটু সামগ্রিক উদ্দেশ্যকে সফল করার লক্ষ্যে। কোরআনের দুইটি আয়াতের মধ্যে বিরোধ দেখতে পায় যাদের ইলমে কমতি আছে, দুইটি হাদিসের মধ্যে বিরোধ দেখতে পায় যাদের ইলমের গভীরতা নেই, একইভাবে উলামাদের মতামতের মধ্যে সমন্বয় তৈরির বদলে বিরোধ খুঁজতে চায় যাদের ইলমী অন্তর সংকীর্ণ। আমরা জানি ছোট স্থানে বেশিকিছুর স্থান হয়না, প্রশস্ত স্থানে সবকিছু ধরে। তাই ইলমের জগতে কামিয়াব হতে অন্তরকে প্রশস্ত করার বিকল্প নেই। আসুন আমরা এবার ঈমানের হ্রাস-বৃদ্ধি ও নিশ্চলতার মধ্যে সমন্বয় করার বিষয়টি জানি। আপনারা সাধারণত এই বিষয়টি কারো কাছে শুনবেন না। কথাগুলো অনেক আলেমই বলেন না বা জানেন না। যাই হোক।

যে পক্ষ বলেন ঈমান বাড়েনা বা কমেওনা- তাঁদের উদ্দেশ্য হলো ঈমানের প্রথম বিন্দুর কথা। আমরা জানি কোন কিছু সৃষ্টি হতে হলে তা একটি সূচনা বিন্দু থেকে শুরু হতে হয়। আর কেউ যখন ঈমান আনে তখন তাঁর মধ্যে ঈমানের একটি বিন্দু তৈরি হয়। এখন সেই মৌলিক বিন্দুটির হ্রাস-বৃদ্ধি হওয়ার উপায় নেই। কারণ অনু বা পরমাণুর আকার হ্রাস-বৃদ্ধি হয়না। তবে এর সাথে আরো অনু পরমাণু বা যোগ হতে পারে, কিন্তু মূল পরমাণু কখনও আকারে বৃদ্ধি পাবেনা। আর যারা বলছে ঈমান হ্রাস-বৃদ্ধি হয় তাদের উদ্দেশ্য হলো ঐ মূল বিন্দুর উপর আরো বাড়তি ঈমান যোগ হতে পারে, আবার যোগ হওয়া ঈমান আমলের কমতির কারণে কমতেও পারে।

তাই হাদিসে এসেছে, যার মধ্যে তিল পরিমাণ ঈমান থাকবে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। কোরআনও বলে যে, আল্লাহ ঈমানকে মুমিনদের অন্তরে লিখে দিয়েছেন। আবার কোরআন এটাও বলছে, যখন কোরআন তিলাওয়াত করা হয় তখন মুমিনদের ঈমান বৃদ্ধি পায়। এভাবেই মূলত সবগুলো আয়াত-হাদিস-মতামতের মধ্যে সমন্বয় করা সম্ভব।

সফরের উপকারিতাঃ

সফর ব্যক্তির চরিত্রকে উন্মোচন করে, নিজের অদেখা দিকগুলো প্রকাশ করে। ধর্য্যের যোগ্যতা সৃষ্টি করে। পবিত্র কোরআনের অসংখ্য আয়াতে দেশ-বিদেশে ভ্রমণের প্রতি তাগিদ দেওয়া হয়েছে। এক আয়াতে আল্লাহ বলেন, ‘বলো, তোমরা পৃথিবীতে পরিভ্রমণ করো এবং দেখো, তোমাদের আগের লোকদের কী পরিণাম হয়েছিল! তাদের বেশির ভাগই ছিল মুশরিক। ’ (সুরা : রুম, আয়াত : ৪২)

মূলত সফরের মাধ্যমে দেশ-বিদেশের নানা বৈচিত্র্য বিষয় অবলোকন করে জীবনের পাথেয় সঞ্চয় করা খুবই সহজ। সফরের কারণে মানুষের চোখ-কান খুলে যায়। সত্য, সঠিক পথ ও পন্থা গ্রহণে সহায়ক হয়। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তবে কি তারা পৃথিবীতে পরিভ্রমণ করে না, যাতে তাদের অন্তর অনুধাবন করতে পারত এবং তাদের কান (সত্য কথা) শুনে নিত। ’ (সুরা : হজ, আয়াত : ৪৬)

নির্দিষ্ট ভূখণ্ড থেকে বের না হলে সৃষ্টিজগতের অনেক কিছুই অজানা থেকে যায়। পৃথিবীর একেক স্থান একেক বৈশিষ্ট্যের অধিকারী। চিত্তবিনোদনের পাশাপাশি সেসব স্থানে চিন্তাশীলদের জন্যও রয়েছে চিন্তার খোরাক। আল্লাহ বলেন, ‘বলে দাও, তোমরা ভূপৃষ্ঠে ভ্রমণ করো এবং দেখো, কিভাবে আল্লাহ প্রথমবারে সৃষ্টি করেছেন। আবার তিনি শেষবারেও সৃষ্টি করবেন। ’ (সুরা : আনকাবুত, আয়াত : ২০)

সফরের প্রতি ইসলাম কখনো নিরুৎসাহ করেনি। ইসলামের একটি অন্যতম রুকন বা স্তম্ভ হলো হজ। আর হজ পালন করতে হয় দীর্ঘপথ পাড়ি দিয়ে। ইসলামের আরেকটি রুকন হলো জাকাত। জাকাত আদায়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ খাত হলো বিত্তহীন মুসাফিরকে দান করা। কারো যাত্রাপথকে মসৃণ করা। এ ছাড়া নির্দিষ্ট পরিমাণ সফরের কারণে শ্রেষ্ঠতম ইবাদত নামাজকে সংক্ষিপ্ত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এভাবেই বিভিন্ন উপায়ে ইসলাম ভ্রমণের প্রতি উৎসাহিত করেছে। ইমাম শাফেয়ি (রহ.) ভ্রমণের পাঁচটি উপকারিতা উল্লেখ করেছেন। এক. দুশ্চিন্তা দূর হয়। দুই. জীবিকা অর্জন করা যায়। তিন. জ্ঞানার্জন করা যায়। চার. সৌজন্যতা ও শিষ্টাচার শেখা যায়। পাঁচ. শারীরিক সুস্থতা অর্জন হয়।

রাসূলুল্লাহ সা: বলেন, তোমরা ভ্রমণ করো, সুস্থ থাকবে এবং তোমরা গণিমত লাভ করবে। (সিলসিলাতুল আহাদিস, হাদিস নং-২৫৫) তিনি আরো বলেন, ‘তোমরা ভ্রমণ করো, সুস্থ থাকবে এবং তোমরা যুদ্ধে শরিক হও, গনিমত লাভ করবে।’ (সিলসিলাতুল আহাদিস, হাদিস নং-৩৩৫২)

‘সফর’ বা ভ্রমণ পৃথিবীর আদিকাল থেকে চলে আসছে। নবী রাসূলরা মহান আল্লøাহর নির্দেশে বিভিন্ন জনপদ ও লোকালয়ে সফর করে ‘দাওয়াতি মিশন’ বাস্তবায়ন করেছেন। তাঁদের একনিষ্ঠ অনুসারীরা ধর্ম প্রচারে কিংবা ধর্ম ও জীবন বাঁচানোর তাগিদে আল্লøাহর নির্দেশে সফর তথা হিজরত করেছেন। বিশ্বনবী হজরত মুহাম্মদ সা:-কে মহান আল্লাহ মিরাজ রজনীতে ঊর্র্ধ্বাকাশে একান্তে নিজের কাছে ‘সফর’ করিয়েছেন। তাই তো পৃথিবীর আদি থেকে অদ্যাবধি ইতিহাসের পাতায় অসংখ্য জ্ঞানী-গুণী, পণ্ডিত, নবী-রাসূলের নাম পাওয়া যায়, যাঁরা পৃথিবীর নানা প্রান্ত ভ্রমণ করে ভ্রমণেতিহাসে চির স্মরণীয় ও অমর হয়ে আছেন।

সফর বা ভ্রমণের প্রকারভেদ :

সফর বা ভ্রমণকে কুরআন-হাদীছের আলোকে পাঁচ ভাগে ভাগ করা যায়।

১. হারাম বা নিষিদ্ধ সফর। ২. মাকরূহ বা অপসন্দনীয় সফর। ৩. মুবাহ বা জায়েয সফর। ৪. মুস্তাহাব বা পসন্দনীয় সফর। ৫. ওয়াজিব বা আবশ্যকীয় সফর।[7]

(১) হারাম বা নিষিদ্ধ সফর : এটা হ’ল আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (ছাঃ)-এর বিরোধিতা বা নিষিদ্ধ কাজ সম্পন্ন করার জন্য সফর করা। যেমন- কুরআন-হাদীছে নিষিদ্ধ এমন কাজ সম্পন্ন করার জন্য সফর করা এবং যেখানে মহামারী আরম্ভ হয়েছে এমন স্থান থেকে সফর করা। রাসূল (ছাঃ) বলেন,فَإِذَا سَمِعْتُمْ بِهِ بِأَرْضٍ فَلاَ تَقْدَمُوا عَلَيْهِ، وَإِذَا وَقَعَ بِأَرْضٍ وَأَنْتُمْ بِهَا فَلاَ تَخْرُجُوا فِرَارًا مِنْهُ ‘যদি তোমরা শুনতে পাও (কোন স্থানে মহামারী আক্রান্ত হয়েছে) তাহ’লে সেখানে যেয়ো না। আর তোমরা যেখানে আছ সেখানে আক্রান্ত হ’লে সেখান থেকে বের হয়ো না’।[8]

এছাড়া কোন মহিলার মাহরাম ছাড়া সফর করা। রাসূল (ছাঃ) বলেন,لاَ تُسَافِرِ الْمَرْأَةُ إِلاَّ مَعَ ذِيْ مَحْرَمٍ، وَلاَ يَدْخُلُ عَلَيْهَا رَجُلٌ إِلاَّ وَمَعَهَا مَحْرَمٌ- ‘মহিলারা মাহরাম (যার সঙ্গে বিবাহ নিষিদ্ধ) ব্যতীত অন্য কারো সাথে সফর করবে না। মাহরাম কাছে নেই এমতাবস্থায় কোন মহিলার নিকট কোন পুরুষ গমন করতে পারবে না’।[9]

(২) মাকরূহ বা অপসন্দনীয় সফর : এটা হ’ল ইসলামী পদ্ধতি ছাড়া অন্য পদ্ধতিতে সফর করা। যেমন- একাকী রাতে সফর করা, তিন জনের অধিক হ’লে কাউকে আমীর নিযুক্ত না করে সফর করা। ইবনে ওমর (রাঃ) নবী করীম (ছাঃ) থেকে বর্ণনা করেন,لَوْ يَعْلَمُ النَّاسُ مَا فِي الْوَحْدَةِ مَا أَعْلَمُ مَا سَارَ رَاكِبٌ بِلَيْلٍ وَحْدَهُ، ‘যদি লোকেরা একা সফরে কি ক্ষতি আছে তা জানত, যা আমি জানি, তবে কোন আরোহী রাতে একাকী সফর করত না’।[10]

(৩) মুবাহ বা বৈধ সফর : দুনিয়ার হালাল কোন কাজের প্রয়োজনে সফর করা। যেমন বিনোদনের জন্য, ব্যবসায়িক কাজে বা কোন দর্শনীয় স্থান দেখার জন্য সফর করা ইত্যাদি।

(৪) মুস্তাহাব বা পসন্দনীয় সফর : এটা হ’ল মসজিদে হারাম, মসজিদে নববী ও মসজিদে আক্বছার উদ্দেশ্যে ভ্রমণ করা। রাসূল ছোঃ) বলেন,لاَ تُشَدُّ الرِّحَالُ إِلاَّ إِلَى ثَلاَثَةِ مَسَاجِدَ الْمَسْجِدِ الْحَرَامِ، وَمَسْجِدِ الرَّسُولِ صلى الله عليه وسلم وَمَسْجِدِ الأَقْصَى، ‘মসজিদুল হারাম, মসজিদুর রাসূল (ছাঃ) এবং মসজিদুল আক্বছা (বাইতুল মাক্বদিস) তিনটি মসজিদ ব্যতীত অন্য কোন মসজিদের উদ্দেশ্যে সফর করা যাবে না।[11]

ইমাম কুরতুবী (রহঃ) বলেন, ‘উপদেশ গ্রহণের জন্য, পূর্ববর্তী জাতিসমূহের ধ্বংসাবশেষ ও তাদের স্মৃতিসমূহ দেখার জন্য সফর করা মুস্তাহাব’।[12]

(৫) ওয়াজিব বা অবশ্যিক সফর : এটা হ’ল আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (ছাঃ)-এর কোন আদেশকে বাস্তবায়নের জন্য সফর করা। যেমন- হজ্জের জন্য মক্কা সফর করা এবং মুসলিম রাষ্ট্রনায়ক যুদ্ধের আদেশ দিলে যুদ্ধের জন্য সফর করা ইত্যাদি। যেমন আল্লাহ বলেন,وَأَذِّن فِي النَّاسِ بِالْحَجِّ يَأْتُوْكَ رِجَالًا وَعَلَى كُلِّ ضَامِرٍ يَّأْتِيْنَ مِنْ كُلِّ فَجٍّ عَمِيْقٍ- ‘আর তুমি জনগণের মধ্যে হজ্জের ঘোষণা প্রচার করে দাও। তারা তোমার কাছে আসবে পায়ে হেঁটে এবং সকল প্রকার (পথশ্রান্ত) কৃশকায় উটের উপর সওয়ার হয়ে দূর-দূরান্ত হ’তে’ (হজ্জ ২২/২৭)।

ফরয ইলম অর্জন করার জন্য যে কোন স্থানে ভ্রমণ করা। রাসূল (ছাঃ) বলেন,مَنْ سَلَكَ طَرِيقًا يَلْتَمِسُ فِيهِ عِلْمًا سَهَّلَ اللهُ لَهُ طَرِيقًا إِلَى الْجَنَّةِ، ‘কোন ব্যক্তি জ্ঞানার্জনের জন্য কোন পথ অবলম্বন করলে, আল্লাহ এই অসীলায় তার জন্য জান্নাতের একটি পথ সুগম করে দেন’।[13]

ইমাম ইবনুল ক্বাইয়িম (৬৯১-৭৫১ হিঃ) বলেন, রাসূল (ছাঃ)-এর সফরসমূহ চার ধরনের ছিল। হিজরতের জন্য সফর[14], জিহাদের জন্য সফর, আর এটাই বেশী ছিল[15], ওমরাহ-এর জন্য[16] এবং হজ্জের জন্য সফর।[17]

সফরের আদব সমূহ :

ইসলাম একটি পরিপূর্ণ জীবন ব্যবস্থা। জীবনের অন্যান্য বিষয়ের ন্যায় ইসলাম সফরের কিছু ইসলামী নিয়ম-কানূন প্রবর্তন করেছে। যা পালন করলে সফরের মাধ্যমে আমরা আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করতে পারি। সফরের আদবগুলোকে তিনভাগে ভাগ করা যেতে পারে- ১. সফরে বের হওয়ার পূর্বের আদব। ২. সফর অবস্থায় আদব। ৩. সফর থেকে ফেরার পথে আদব। এখানে আমরা উপরোক্ত বিষয়গুলিকে কুরআন ও ছহীহ হাদীছের আলোকে বিস্তারিতভাবে তুলে ধরার প্রয়াস পাব ইনশাআল্লাহ।

সফরে বের হওয়ার পূর্বের আদব :

সফরে বের হওয়ার পূর্বে ইসলামে কিছু নিয়ম রয়েছে, যা পালনের মাধ্যমে একজন মুসাফির তার সফরকে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের মাধ্যম হিসাবে গ্রহণ করতে পারে।

    বিশুদ্ধ নিয়ত করা :

প্রত্যেক আমলের ফলাফল নিয়তের উপর নির্ভরশীল।[18]  মুসলিমের প্রতিটি কাজ আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই হ’তে হবে (যুমার ৩৯/২; আল-বাইয়নাহ ৯৮/৫; গাফির ৪০/৬৫)। সুতরাং সফরের পূর্বে বিশুদ্ধ নিয়ত করা যরূরী। বিশেষ করে হজ্জ, ওমরাহসহ অন্যান্য উত্তম সফরে। ভাল নিয়তের মাধ্যমে প্রার্থিব সফরও ইবাদতে পরিণত হ’তে পারে। যেমন- কেউ ব্যবসায়িক সফরের পূর্বে যদি নিয়ত করে যে, হালালভাবে ব্যবসার মাধ্যমে অর্জিত লাভের কিছু অংশ গরীবদের মাঝে বিতরণ করা হবে, তাহ’লে সফরটি ইবাদত হবে। আবার নিয়তের কারণে ইসলামী সফরও শিরকী কাজে পরিণত হ’তে পারে এবং জাহান্নামে যাওয়ার কারণও হ’তে পারে। লোক দেখানো হজ্জ ও ওমরাহ করা। নাম-যশের উদ্দেশ্যে জ্ঞান অর্জনের জন্য বের হওয়া (হূদ/১৫-১৬)।

    ইস্তেখারার মাধ্যমে সফর শুরু করা :

ইস্তেখারা হ’ল কল্যাণ প্রার্থনা। মানুষ যেহেতু তার ভবিষ্যৎ জানে না, তাই নিজের কল্যাণ-অকল্যাণ আল্লাহর উপরে ছেড়ে দেওয়ার জন্য অথবা কোন ইঙ্গিত পাওয়ার জন্য ছালাতুল ইস্তেখারা আদায় করতে হয়। দিনে বা রাতে দুই রাক‘আত ছালাত আদায় করবে এবং ছালাতের সিজদায়, শেষ বৈঠকে অথবা সালাম ফিরানোর পরে নিমেণর দো‘আটি পড়বে।[19]

اللَّهُمَّ إنِّيْ أسْتَخِيْرُكَ بِعِلْمِكَ، وَأْسْتَقْدِرُكَ بِقُدْرَتِكَ، وَأَسْألُكَ مِنْ فَضْلِكَ العَظِيْمِ، فَإنَّكَ تَقْدِرُ وَلاَ أقْدِرُ، وَتَعْلَمُ وَلاَ أعْلَمُ، وَأنْتَ عَلاَّمُ الْغُيُوْبِ. الَّلْهُمَّ إنْ كُنْتَ تَعْلَمُ أنَّ هَذَا الأمْرَ خَيْرٌ لِي فِي دِينِي وَمَعَاشِي وَعَاقِبَةِ أمْرِي فَاقْدِرْهُ لِي وَيَسِّرْهُ لِي، ثُمَّ بَارِكْ لِي فِيْهِ. وَإنْ كُنْتَ تَعْلَمُ أنَّ هَذَا الأَمْرَ شَرٌّ لِي فِيْ دِيْنِيْ وَمَعَاشِي وَعَاقِبَةِ أَمْرِيْ فَاصْرِفْهُ عَنِّيْ، وَاصْرِفْنِيْ عَنْهُ، وَاقْدِرْ لِيَ الخَيْرَ حَيْثُ كَانَ، ثُمَّ أرْضِنِيْ بِهِ-

‘হে আল্লাহ! আমি তোমার নিকট তোমার জ্ঞানের সাহায্যে কল্যাণের প্রার্থনা করছি এবং তোমার শক্তির মাধ্যমে শক্তি প্রার্থনা করছি। আমি তোমার মহান অনুগ্রহ ভিক্ষা চাইছি। কেননা তুমিই ক্ষমতা রাখ, আমি ক্ষমতা রাখি না। তুমিই জান, আমি জানি না। তুমিই অদৃশ্য বিষয় সমূহের মহাজ্ঞানী। হে আল্লাহ! যদি তুমি জান যে, এ কাজটি (এখানে যে কাজের জন্য ইস্তেখারা করা হচ্ছে তা মনে মনে উল্লেখ করবে) আমার জন্য উত্তম হবে আমার দ্বীনের জন্য, আমার জীবিকার জন্য ও আমার পরিণাম ফলের জন্য, তাহ’লে ওটা আমার জন্য নির্ধারিত করে দাও এবং সহজ করে দাও। অতঃপর ওতে আমার জন্য বরকত দান কর। আর যদি তুমি জান যে, এ কাজটি আমার জন্য মন্দ হবে আমার দ্বীনের জন্য, আমার জীবিকার জন্য ও আমার পরিণাম ফলের জন্য, তাহ’লে এটা আমার থেকে ফিরিয়ে নাও এবং আমাকেও ওটা থেকে ফিরিয়ে রাখ। অতঃপর আমার জন্য মঙ্গল নির্ধারণ কর, যেখানে তা আছে এবং আমাকে তা দ্বারা সন্তুষ্ট কর’।[20]

    আল্লাহর নিকট সমস্ত পাপ থেকে তওবা করা :

প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনায় বহু মানুষ মারা যাচ্ছে। মানুষ জানে না কখন কোথায় তার মরণ হবে; বরং আল্লাহই জানেন (লোক্বমান ৩১/৩৪)। তাই সফরের পূর্বে আল্লাহর কাছে সমস্ত গোনাহ থেকে তওবা করা উচিত। সাথে সাথে কারো উপর যুলুম করে থাকলে মাফ চেয়ে নেওয়া এবং ঋণ থাকলে পরিশোধ করা বা জানিয়ে যাওয়া উচিত।

    হালাল পাথেয়র ব্যবস্থা করা :

সফরে যাওয়ার আগে পরিবারের জন্য থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করার পাশাপাশি সফরের জন্য হালাল পাথেয়র ব্যবস্থা করা। হালাল রূযী ছাড়া কোন ভাল কাজই আল্লাহ কবুল করেন না। আবু হুরায়রা (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, রাসূল (ছাঃ) বলেন,

إِنَّ اللهَ طَيِّبٌ وَلاَ يَقْبَلُ إِلاَّ طَيِّبًا وَإِنَّ اللهَ أَمَرَ الْمُؤْمِنِيْنَ بِمَا أَمَرَ بِهِ الْمُرْسَلِيْنَ فَقَالَ ‏:‏ ‏(‏يَا أَيُّهَا الرُّسُلُ كُلُوْْا مِنَ الطَّيِّبَاتِ وَاعْمَلُوْا صَالِحًا)‏ وَقَالَ (يأَيُّهَا الَّذِيْنَ آمَنُوْا كُلُوْ‏‏‏‏‏‏‏‏‏‏‏‏‏‏‏‏‏‏‏‏‏‏‏‏‏‏‏‏‏‏‏‏‏‏‏‏‏‏‏‏‏ثم َذَكَرَ الرَّجُلَ يُطِيْلُ السَّفَرَ أَشْعَثَ أَغْبَرَ يَمُدُّ يَدَهُ إِلَى السَّمَاءِ: يَا رَبِّ. يَا رَبِّ. وَمَطْعَمُهُ حَرَامٌ، وَمَشْرَبُهُ حَرَامٌ، وَمَلْبَسُهُ حَرَامٌ، وَغُذِيَ بِالْحَرَامِ، فَأَنَّى يُسْتَجَابُ لِه لِذَلِكَ؟

‘আল্লাহ তা‘আলা পবিত্র, তিনি পবিত্র জিনিস ব্যতীত কবুল করেন না। নিশ্চয়ই আল্লাহ মুমিনদেরকে সেই আদেশই দিয়েছেন, যে আদেশ রাসূলগণকে দিয়েছেন, আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ‘হে রাসূলগণ! পবিত্র বস্ত্ত আহার কর এবং নেক আমল কর’ (মুমিন ৪০/৫১)। তিনি আরো বলেন, ‘হে মুমিনগণ! আমরা তোমাদের যে পবিত্র জীবিকা দান করেছি তা থেকে আহার কর’ (বাক্বারাহ ২/১৭২)। অতঃপর তিনি এক ব্যক্তির কথা উল্লেখ করলেন, যে ব্যক্তি দীর্ঘ সফরে বের হয় এবং তার চুলগুলো এলামেলো হয়ে আছে ও কাপড় ধুলোমলিন। অতঃপর সে তার দু’হাত আকাশের দিকে তুলে বলে, হে রব! হে রব! অথচ তার খাদ্য হারাম, তার পানীয় হারাম, তার পোষাক হারাম, সে হারাম দ্বারা পরিপুষ্ট হয়েছে। এ অবস্থায় কেমন করে তার দো‘আ কবূল হ’তে পারে’?[21] 

    দেনা-পাওনা ও অছিয়ত লিখে রাখা :

সফরের পূর্বে কর্তব্য হ’ল দেনা-পাওনা অথবা অছিয়ত থাকলে লিখে রাখা। কেননা মানুষ জানে না সে কোথায়, কখন মারা যাবে (লোক্বমান ৩১/৩৪)। এজন্য রাসূল (ছাঃ) বলেন, مَا حَقُّ امْرِئٍ مُسْلِمٍ لَهُ شَىْءٌ، يُوْصِيْ فِيْهِ يَبِيتُ لَيْلَتَيْنِ، إِلاَّ وَوَصِيَّتُهُ مَكْتُوبَةٌ عِنْدَهُ، ‘কোন মুসলিম ব্যক্তির উচিত নয় যে, তার কাছে অছিয়তযোগ্য কিছু (সম্পদ) থাকাবস্থায় সে দু’রাত কাটাবে অথচ তার নিকট অছিয়ত লিখিত থাকবে না’।[22]

    পিতা-মাতার অনুমতি নিয়ে সফরে বের হওয়া :

পিতা-মাতা জীবিত থাকলে তাদের অনুমতি নিয়ে সফরে যাওয়া উত্তম। আর মহিলা হ’লে তার অভিভাবকের অনুমিত এবং স্বামী বা মাহরাম (যার সাথে বিবাহ হারাম, যেমন-পিতা, ভাই, চাচা, ছেলে ইত্যাদি) সহ সফরে বের হওয়া। ইবনু আববাস (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, নবী করীম (ছাঃ) বলেন,

لاَ تُسَافِرِ الْمَرْأَةُ إِلاَّ مَعَ ذِيْ مَحْرَمٍ، وَلاَ يَدْخُلُ عَلَيْهَا رَجُلٌ إِلاَّ وَمَعَهَا مَحْرَمٌ.‏ فَقَالَ رَجُلٌ يَا رَسُوْلَ اللهِ إِنِّيْ أُرِيْدُ أَنْ أَخْرُجَ فِيْ جَيْشِ كَذَا وَكَذَا، وَامْرَأَتِيْ تُرِيْدُ الْحَجَّ‏.‏ فَقَالَ‏ اخْرُجْ مَعَهَا-

‘মহিলারা মাহরাম ব্যতীত সফর করবে না। মহিলার মাহরাম ব্যতীত কোন পুরুষ তার নিকট গমন করবে না। তখন এক ব্যক্তি বলল, হে আল্লাহর রাসূল (ছাঃ)! অমুক অমুক সেনাদলের সাথে আমি জিহাদ করতে যাচ্ছি। কিন্তু আমার স্ত্রী একাকিনী হজ্জের উদ্দেশ্যে বের হয়েছে। তিনি বললেন, তুমি তোমার স্ত্রীর সাথে যাও’।[23] মহিলাদের জন্য হজ্জের সফরেও মাহরাম থাকা যরূরী।

    ব্যবস্থা থাকলে স্ত্রী সাথে নেওয়া :

দীর্ঘ দিনের উদ্দেশ্যে সফরকালে সম্ভব হ’লে ও ব্যবস্থা থাকলে স্ত্রীকে সাথে নেওয়া। আর কারো একাধিক স্ত্রী থাকলে  এবং সে একজনকে সাথে নিতে চাইলে অথবা একজনের যাওয়ার ব্যবস্থা থাকলে লটারীর মাধ্যমে একজনকে নির্ধারণ করবে। আয়েশা (রাঃ) বলেন,إِذَا أَرَادَ سَفَرًا أَقْرَعَ بَيْنَ نِسَائِهِ، فَأَيَّتُهُنَّ خَرَجَ سَهْمُهَا خَرَجَ بِهَا مَعَهُ ‘রাসূল (ছাঃ) সফরের মনস্থ করলে স্ত্রীগণের মধ্যে লটারী করতেন। যার নাম আসত তিনি তাঁকে নিয়েই সফরে বের হ’তেন’।[24] তবে হজ্জের সফরে তিনি সকল স্ত্রীকে সাথে নিয়েছিলেন।[25]

    সৎ কর্মশীল ব্যক্তির নিকট থেকে উপদেশ নেওয়া :

সফরে বের হওয়ার পূর্বে সফর স্থান সম্পর্কে অভিজ্ঞ অথবা সৎ ও পুণ্যবান লোকেদের নিকট থেকে উপদেশ নেওয়া যেতে পাবে। আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, এক ব্যক্তি বলল, হে আল্লাহর রাসূল! আমি সফরে যাওয়ার ইচ্ছা পোষণ করেছি, অতএব আমাকে উপদেশ দিন। তিনি বলেন,عَلَيْكَ بِتَقْوَى اللهِ وَالتَّكْبِيْرِ عَلَى كُلِّ شَرَفٍ‏.‏ فَلَمَّا أَنْ وَلَّى الرَّجُلُ قَالَ اللَّهُمَّ اطْوِ لَهُ الأَرْضَ وَهَوِّنْ عَلَيْهِ السَّفَرَ- ‘অবশ্যই তুমি আল্লাহভীতি (তাক্বওয়া) অবলম্বন করবে এবং প্রতিটি উঁচু স্থানে ওঠার সময় তাকবীর ধ্বনি দিবে (আল্লাহ আকবার বলবে)। লোকটি যখন চলে যাচ্ছিল সে সময় রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বললেন, হে আল্লাহ! তার পথের ব্যবধান কমিয়ে দাও এবং তার জন্য সফর সহজতর করে দাও’।[26]

    সম্ভব হ’লে বৃহস্পতিবার বের হওয়া :

বৃহস্পতিবার সফরে বের হওয়া উত্তম। কা‘ব বিন মালেক (রাঃ) হ’তে বর্ণিত,خَرَجَ فِي غَزْوَةِ تَبُوْكَ يَوْمَ الخَمِيْسِ، وَكَانَ يُحِبُّ أَنْ يَّخْرُجَ يَوْمَ الْخَميسِ- ‘নবী করীম (ছাঃ) তাবূক অভিযানে বৃহস্পতিবারে বের হ’লেন। আর তিনি বৃহস্পতিবার (সফরে) বের হওয়া পসন্দ করতেন’।[27] অন্য বর্ণনায় আছে, রাসূল (ছাঃ) বৃহস্পতিবার ছাড়া অন্য দিনে কমই সফরে বের হ’তেন।[28]

    দিনের প্রথম অংশে সফর আরম্ভ করা :

অন্যান্য কাজের ন্যায় সকাল সকাল সফরে বের হওয়াও সফরের অন্যতম আদব। ছাখার ইবনে আদা‘আহ গামেদী (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, রাসূল (ছাঃ) বলেন,

اَللهم بَارِكْ ِلأُمَّتِي فِيْ بُكُوْرِهَا. وَكَانَ إِذَا بَعَثَ سَرِيَّةً أَوْ جَيْشَاً بَعَثَهُمْ مِنْ أوَّلِ النَّهَارِ. وَكَانَ صَخْرٌ تَاجِراً، وَكَانَ يَبْعَثُ تِجَارَتَهُ أوَّلَ النَّهَار، فَأَثْرَى وَكَثُرَ مَالُهُ،

‘হে আল্লাহ! তুমি আমার উম্মতের জন্য তাদের সকালে বরকত দাও। আর তিনি যখন ছোট-বড় কোন অভিযানে সৈন্যবাহিনী পাঠাতেন, তখন তাদেরকে সকালে পাঠাতেন। আর ছাখার ব্যবসায়ী ছিলেন। সুতরাং তিনি তাঁর ব্যবসার পণ্য সকালেই প্রেরণ করতেন। ফলে তিনি (এর বরকতে) ধনী হয়ে গিয়েছিলেন এবং তাঁর প্রচুর সম্পদ হয়েছিল’।[29]

    রাত্রিতে সফর করা :

প্রয়োজনে রাতের বেলায়ও সফর করা যায়। রাসূল (ছাঃ) বলেছেন, عَلَيْكُمْ بِالدُّلْجَةِ فَإِنَّ الأَرْضَ تُطْوَى بِاللَّيْلِ ‘তোমাদের ফজরের পূর্বে অন্ধকার অবস্থায় সফর করা উচিত। কেননা রাতের বেলা যমীন সংকুচিত হয়’।[30] গ্রীষ্মকালে রাতের বেলা মরুভূমির পরিবেশ ঠান্ডা থাকে এবং দিনের বেলা থাকে উত্তপ্ত। যখন চলাচল কষ্টসাধ্য। ফলে রাত্রে ভ্রমণ সহজতর হয় এবং বাহনও স্বাচ্ছন্দ্যে চলতে পারে।[31]

    বিদায়কালীন দো‘আ পাঠ করা :

আত্মীয়-স্বজনের অর্থাৎ যারা বাড়ীতে থাকবে তাদের থেকে বিদায় নেয়ার সময় নিমেণাক্ত দো‘আ পাঠ করে বিদায় নিবে-

أَسْتَوْدِعُكَ اللهَ الَّذِيْ لاَ تَضِيْعُ وَدَائِعُهُ،

উচ্চারণ: ‘আস্তাউদি‘উকাল্লাহাল্লাযী লা-তাযি‘উ ওয়াদা-ই‘য়াহু’। অর্থ- ‘আমি তোমাদেরকে সেই আল্লাহর হেফাযতে রেখে যাচ্ছি যার হেফাযতে অবস্থানকারী কেউই ক্ষতিগ্রস্ত হয় না’।[32]  আর যারা মুসাফিরকে বিদায় দিবে তারা নিমেণাক্ত দো‘আটি পাঠ করে বিদায় দিবে।

أَسْتَوْدِعُ اللهَ دِيْنَكَ وَأَمَانَتَكَ وَخَوَاتِيْمَ عَمَلِكَ،

উচ্চারণ: আস্তাউদি‘উল্লা-হা দীনাকা ওয়া আমা-নাতাকা ওয়া খাওয়া-তীমা আ‘মা-লিকা’। অর্থ- ‘আপনার দ্বীন, আপনার আমানত সমূহ ও আপনার শেষ আমল সমূহকে আল্লাহর হেফাযতে ন্যস্ত করলাম’।[33] এছাড়া নিমেণর দো‘আটিও পাঠ করা যায়, যা রাসূল (ছাঃ) জনৈক ছাহাবীকে বলেছিলেন, যিনি রাসূল (ছাঃ)-কে সফরে যাওয়ার কথা বলেছিলেন,

زَوَّدَكَ اللهُ التَّقْوَى‏‏ وَغَفَرَ ذَنْبَكَ ‏‏ وَيَسَّرَ لَكَ الْخَيْرَ حَيْثُمَا كُنْتَ

উচ্চারণ: যাওয়াদাকাল্লা-হুত তাক্বওয়া ওয়া গাফারা যাম্বাকা ওয়া ইয়াস্সারা লাকাল খায়রা হায়ছুমা কুনতা। অর্থ- ‘আল্লাহ তোমাকে তাক্বওয়ার পুঁজি দান করুন, তোমার গোনাহ মাফ করুন এবং তুমি যেখানেই থাক তোমার জন্য কল্যাণকে সহজ করে দেন’।[34]

    বিদায়কালে পরিবার-পরিজনকে তাক্বওয়ার অছিয়ত করা :

সফরকারী পরিবার প্রধান হ’লে পরিবারের ভাল-মন্দ তার উপর নির্ভরশীল। আর আল্লাহর দরবারে তাদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে।[35] আল্লাহ তা‘আলা মানব জাতির সকলকে লক্ষ্য করে বলেন,

وَلَقَدْ وَصَّيْنَا الَّذِيْنَ أُوتُواْ الْكِتَابَ مِنْ قَبْلِكُمْ وَإِيَّاكُمْ أَنِ اتَّقُواْ اللهَ وَإِن تَكْفُرُوْا فَإِنَّ لِلّهِ مَا فِي السَّمَاوَاتِ وَمَا فِي الأَرْضِ وَكَانَ اللهُ غَنِيّاً حَمِيْداً-

‘আর তোমাদের পূর্বে যাদেরকে কিতাব দেয়া হয়েছে তাদেরকে এবং তোমাদেরকে আমি নির্দেশ দিয়েছি যে, তোমরা আল্লাহকে ভয় কর। আর যদি কুফরী কর তাহ’লে আসমানসমূহে যা আছে এবং যা আছে যমীনে সব আল্লাহরই। আর আল্লাহ অভাবহীন, প্রশংসিত’ (নিসা ৪/১৩১)।

    ঘর থেকে বের হওয়ার সময় দো‘আ পাঠ করা :

আনাস (রাঃ) বলেন, রাসূলূল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, যে ব্যক্তি বাড়ী থেকে বের হওয়ার সময় বলবে,بِسْمِ اللهِ تَوَكَّلْتُ عَلَى اللهِ لاَ حَوْلَ وَلاَ قُوَّةَ إِلاَّ بِاللهِ উচ্চারণ: বিসমিল্লা-হি তাওয়াক্কালতু ‘আলাল্লা-হি ওয়া লা হাওলা ওলা-লা কুউওয়াতা ইল্লা বিল্লা-হ। অর্থঃ ‘আল্লাহর নামে (বের হচ্ছি), তাঁর উপরে ভরসা করছি। আল্লাহ ব্যতীত কোন ক্ষমতা নেই, কোন শক্তি নেই’। তাকে বলা হবে এটা তোমার জন্য যথেষ্ট হয়ে গেছে, তোমাকে বাঁচানো হয়েছে, তোমাকে সুপথ দেখিয়ে দেয়া হয়েছে। তখন শয়তান তার কাছ থেকে দূরে চলে যায়। এক শয়তান অপর শয়তানকে বলে, তুমি ঐ ব্যক্তির সাথে কি করতে পার? যাকে সুপথ দেখানো হয়েছে এবং সব রকমের অনিষ্ট থেকে রক্ষা করা হয়েছে’।[36]

উম্মু সালামা (রাঃ) বর্ণনা করেন, রাসূলূল্লাহ (ছাঃ) যখন ঘর থেকে বের হ’তেন তখন বলতেন,

بِسْمِ اللهِ تَوَكَّلْتُ عَلَى اللهِ اللَّهُمَّ إِنَّا نَعُوْذُ بِكَ مِنْ أَنْ نَزِلَّ أَوْ نَضِلَّ أَوْ نَظْلِمَ أَوْ نُظْلَمَ أَوْ نَجْهَلَ أَوْ يُجْهَلَ عَلَيْنَا-

উচ্চারণ: বিসমিল্লা-হি তাওয়াক্কালতু ‘আলাল্লা-হি আল্লা-হুম্মা ইন্না না‘উযুবিকা মিন আন নাযিল্লা আও নাযিল্লা আও নাযলিমা আও নুযলামা আও নাজহালা আও ইউজহালা ‘আলাইনা। অর্থ: ‘(বের হচ্ছি) আল্লাহর নামে, আল্লাহর উপর আমি ভরসা করলাম। হে আল্লাহ! আমরা আপনার নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করছি পদস্খলন হ’তে কিংবা পথভ্রষ্টতা হ’তে কিংবা যুলুম করা হ’তে কিংবা অত্যাচারিত হওয়া থেকে কিংবা অজ্ঞতাবশত কারো প্রতি মন্দ আচরণ করা হ’তে বা আমাদের প্রতি কারো অজ্ঞতা প্রসূত আচরণ হ’তে’।[37]

সফর অবস্থায় কিছু আদব :

সফর অবস্থায় কিছু ইসলামী আদব রয়েছে, যা প্রত্যেক মুসলিম সফরকারীকে পালন করা প্রয়োজন। যেমন-

১. সফরের শুরুতে সফরের দো‘আ পাঠ করা :

আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর (রাঃ) হ’তে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূল (ছাঃ) সফরে বের হওয়ার সময় উটের উপর ধীর-স্থিরতার সাথে বসার পর তিনবার ‘আল্লাহু আকবার’ বলতেন। তারপর বলতেন,

﴿سُبْحَانَ الَّذِيْ سَخَّرَ لَنَا هَذَا وَمَا كُنَّا لَه مُقْرِنِيْنَ وَإِنَّا إِلَى رَبِّنَا لَمُنْقَلِبُوْنَ﴾ اَللّٰهُمَّ إِنَّا نَسْأَلُكَ فِىْ سَفَرِنَا هَذَا الْبِرَّ وَالتَّقْوى وَمِنَ الْعَمَلِ مَا تَرْضى اَللَّهُمَّ هَوِّنْ عَلَيْنَا سَفَرَنَا هَذَا وَاطْوِ لَنَا بُعْدَه اَللّٰهُمَّ أَنْتَ الصَّاحِبُ فِى السَّفَرِ وَالْخَلِيْفَةُ فِى الْأَهْلِ وَالْمَالِ، اَللَّهُمَّ إِنِّىْ أَعُوْذُ بِكَ مِنْ وَعْثَاءِ السَّفَرِ وَكَابَةِ الْمَنْظَرِ وَسُوْءِ الْمُنْقَلَبِ فِى الْمَالِ وَالْأَهْلِ.

‘মহা পবিত্র সেই সত্তা, যিনি একে আমাদের জন্য অনুগত করে দিয়েছেন। অথচ আমরা একে বশীভূত করতে সক্ষম ছিলাম না। আর আমরা আমাদের প্রতিপালকের নিকট অবশ্যই প্রত্যাবর্তন করব’ (যুখরুফ ৪৩/১৩-১৪)। হে আল্লাহ! আমরা আপনার নিকটে আমাদের এই সফরে কল্যাণ ও তাক্বওয়া এবং এমন কাজ প্রার্থনা করি, যা আপনি পসন্দ করেন। হে আল্লাহ! আমাদের উপরে এই সফরকে সহজ করে দিন এবং এর দূরত্ব কমিয়ে দিন। হে আল্লাহ! আপনি এই  সফরে আমাদের একমাত্র সাথী এবং পরিবারে ও মাল-সম্পদে আপনি আমাদের একমাত্র প্রতিনিধি। হে আল্লাহ! আমি আপনার নিকটে পানাহ চাই সফরের কষ্ট, খারাপ দৃশ্য এবং মাল-সম্পদ ও পরিবারের নিকটে মন্দ প্রত্যাবর্তন হ’তে’।[38]

২. সৎ লোকের সঙ্গী হয়ে সফর করা :

সফরে ভাল সঙ্গী থাকা যরূরী। কারণ সঙ্গী-সাথীর কারণে মানুষ ভাল-মন্দের দিকে ধাবিত হয়। সৎ সঙ্গীর আদেশ দিয়ে আল্লাহ তাঁর রাসূল (ছাঃ)-কে বলেন, ‘তুমি নিজেকে রাখবে তাদেরই সঙ্গে যারা সকাল ও সন্ধ্যায় আহবান করে তাদের প্রতিপালককে তাঁর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে এবং তুমি পার্থিব জীবনের শোভা কামনা করে তাদের দিক থেকে তোমার দৃষ্টি ফিরিয়ে নিয়ো না; যার চিত্তকে আমি আমার স্মরণে অমনোযোগী করে দিয়েছি, সে তার খেয়াল-খুশির অনুসরণ করে ও যার কার্যকলাপ সীমা অতিক্রম করে তুমি তার আনুগত্য করো না’ (কাহাফ ১৮/২৮)।

অনুরূপভাবে ঈমানদারদেরকে বলেন,يَا أَيُّهَا الَّذِيْنَ آمَنُوْا اتَّقُوا  اللهَ وَكُونُوْا مَعَ الصَّادِقِيْنَ ‘হে ঈমানদারগণ! আল্লাহকে ভয় কর এবং সত্যবাদীদের সঙ্গে থাক’ (তাওবা ৯/১১৯)। আর এ প্রসঙ্গে রাসূল (ছাঃ) বলেছেন,‏‏‏‏‏‏‏‏‏‏‏‏‏‏‏‏‏‏‏‏‏‏‏‏‏‏‏‏‏‏‏‏‏‏‏‏‏‏‏‏‏‏‏‏‏‏‏‏‏‏‏‏‏‏‏‏‏‏‏‏‏‏‏‏‏‏‏‏‏‏‏‏ ‘তুমি মুমিন ব্যক্তি ব্যতীত অন্য কারো সঙ্গী হবে না এবং তোমার খাদ্য যেন পাহেযগার লোক ব্যতীত অন্য কেউ না খায়’।[39]

অন্যত্র রাসূল (ছাঃ) বলেন,الرَّجُلُ عَلَى دِيْنِ خَلِيْلِهِ فَلْيَنْظُرْ أَحَدُكُمْ مَنْ يُخَالِلُ، ‘মানুষ তার বন্ধুর রীতি-নীতির অনুসারী হয়। কাজেই তোমাদের প্রত্যেকেই যেন লক্ষ্য করে, সে কি ধরনের বন্ধু গ্রহণ করেছে’।[40] অন্য হাদীছে রাসূল (ছাঃ) সৎসঙ্গীকে সুগন্ধী বহনকারীর সাথে তুলনা করেছেন। যার সাথে থাকলে সুগন্ধী পাওয়া যায়। আর অসৎ সঙ্গীকে কামারের সাথে তুলনা করেছেন। যার সাথে থাকলে কাপড় জ্বালিয়ে দিবে অথবা দুর্গন্ধ পাওয়া যাবে’।[41]

৩. একাকী সফর না করা :

সফরকালীন সময়ে একাকী না গিয়ে তিনজন বা তার বেশী লোক সাথে রাখা উত্তম। কেননা রাসূল (ছাঃ) বলেছেন, الرَّاكِبُ شَيْطَانٌ وَالرَّاكِبَانِ شَيْطَانَانِ وَالثَّلاَثَةُ رَكْبٌ ‘একাকী সফরকারী হচ্ছে একটি শয়তান, আর একত্রে দু’জন সফরকারী দু’টি শয়তান। তবে একত্রে তিনজন সফরকারীই হচ্ছে প্রকৃত কাফেলা’।[42] একাকী সফরে কোন সমস্যা হ’লে বা মারা গেলে তাকে গোসল দেয়া, দাফন কাফনের ব্যবস্থা করা, তার সাথে থাকা জিনিসগুলো সংরক্ষণ করা এবং তার মৃত্যুসংবাদ তার পরিবারে কাছে পৌঁছানোর সুবিধার্থে একাধিক ব্যক্তির সমন্বয়ে কাফেলার সাথে সফর করতে শরী‘আত উৎসাহ দিয়েছে।[43]

ইবনে ওমর (রাঃ) নবী করীম (ছাঃ) থেকে বর্ণনা করেন,لَوْ يَعْلَمُ النَّاسُ مَا فِي الْوَحْدَةِ مَا أَعْلَمُ مَا سَارَ رَاكِبٌ بِلَيْلٍ وَحْدَهُ ‘যদি লোকেরা একা সফরে কি ক্ষতি আছে তা জানত, যা আমি জানি, তবে কোন আরোহী রাতে একাকী সফর করত না’।[44] ইবনে আববাস (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, নবী করীম (ছাঃ) বলেছেন,خَيْرُ الصَّحَابَةِ أرْبَعَةٌ، وَخَيْرُ السَّرَايَا أرْبَعُمِئَةٍ، وَخَيْرُ الجُيُوْشِ أرْبَعَةُ آلاَفٍ، وَلَنْ يُغْلَبَ اثْنَا عَشَرَ ألْفاً مِنْ قِلةٍ- ‘সর্বোত্তম সঙ্গী হ’ল চারজন, সর্বোত্তম ছোট বাহিনী হ’ল চারশ’ জন, সর্বোত্তম বড় সেনাবাহিনী হ’ল চার হাযার জন। আর বারো হাযার সৈন্য স্বল্পতার কারণে কখনো পরাজিত হবে না’।[45]

৪. তিন বা তার অধিক হ’লে একজনকে আমীর বানানো :

আবূ সাঈদ খুদরী (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, রাসূল (ছাঃ) বলেছেন, إِذَا خَرَجَ ثَلاَثَةٌ فِيْ سَفَرٍ فَلْيُؤَمِّرُوْا أَحَدَهُمْ ‘তিন ব্যক্তি একত্রে সফর করলে তারা যেন নিজেদের মধ্য হ’তে একজনকে আমীর বানায়’।[46]

৫. সফর অবস্থায় বিভক্ত না হয়ে একত্রিত থাকা :

আবু ছা‘লাবাহ আল-খুশানী (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর সাথে সেনাবাহিনীর লোকজন যখন কোন স্থানে (বিশ্রামের জন্য) নামতেন তখন তারা বিভিন্ন গিরিপথে ও উপত্যকায় ছড়িয়ে পড়তেন। সেজন্য রাসূলূল্লাহ (ছাঃ) বলেন,

إِنَّ تَفَرُّقَكُمْ فِيْ هَذِهِ الشِّعَابِ وَالأَوْدِيَةِ إِنَّمَا ذَلِكُمْ مِنَ الشَّيْطَانِ. فَلَمْ يَنْزِلْ بَعْدَ ذَلِكَ مَنْزِلاً إِلاَّ انْضَمَّ بَعْضُهُمْ إِلَى بَعْضٍ حَتَّى يُقَالُ لَوْ بُسِطَ عَلَيْهِمْ ثَوْبٌ لَعَمَّهُمْ-‏‏

‘এসব গিরিপথে ও পাহাড়ী উপত্যকায় তোমাদের বিভক্ত হয়ে পড়াটা শয়তানের ষড়যন্ত্র। (বর্ণনাকারী বলেন) এরপর থেকে যেখানেই তিনি নামতেন দলের লোকজন একত্রে অবস্থান করত। এমনকি এরূপ বলা হ’ল যে, যদি একটি কাপড় তাদের উপর বিছিয়ে দেয়া হয় তাদের সবাইকে এর মধ্যে ঢেকে নেয়া সম্ভব’।[47] একত্রিত হয়ে সব কাজ করার গুরুত্ব বর্ণনা করে অন্যত্র রাসূল (ছাঃ) বলেন, مَا مِنْ ثَلاَثَةٍ فِيْ قَرْيَةٍ وَلاَ بَدْوٍ لاَ تُقَامُ فِيْهِمُ الصَّلاَةُ إِلاَّ قَدِ اسْتَحْوَذَ عَلَيْهِمُ الشَّيْطَانُ فَعَلَيْكَ بِالْجَمَاعَةِ فَإِنَّمَا يَأْكُلُ الذِّئْبُ الْقَاصِيَةَ- ‘কোন তিন ব্যক্তি তারা (জনবহুল) গ্রামে থাকুক অথবা জনবিরল অঞ্চলে থাকুক, তাদের মধ্যে ছালাতের জামা‘আত কায়েম করা হয় না, নিশ্চয়ই তাদের উপর শয়তান প্রভাব বিস্তার করে। সুতরাং অবশ্যই তুমি জামা‘আত কায়েম করবে। কেননা নেকড়ে বাঘ সেই ছাগল-ভেড়াকেই খায় যে দল ছেড়ে একা থাকে’।[48]

৬. যালেমদের অঞ্চল দিয়ে অতিক্রম করার সময় করণীয় :

আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত, নবী করীম (ছাঃ) যখন হিজর (তাবূক যুদ্ধে যাওয়ার সময় ছামূদ জাতির ধ্বংসস্তূপের) এর পাশ দিয়ে অতিক্রম করেন তখন বলেন,لاَ تَدْخُلُوْا مَسَاكِنَ الَّذِيْنَ ظَلَمُوْا إِلاَّ أَنْ تَكُوْنُوْا بَاكِيْنَ، أَنْ يُصِيْبَكُمْ مَا أَصَابَهُمْ.‏ ثُمَّ تَقَنَّعَ بِرِدَائِهِ، وَهْوَ عَلَى الرَّحْلِ، ‘তোমরা এমন লোকদের আবাসস্থলে প্রবেশ করো না যারা নিজেরাই নিজেদের উপর যুলুম করেছে। প্রবেশ করবে ক্রন্দনরত অবস্থায়, যেন তাদের প্রতি যে বিপদ এসেছিল তোমাদের প্রতি সে রকম বিপদ না আসে। অতঃপর রাসূল (ছাঃ) বাহনের উপর আরোহী অবস্থায় নিজ চাদর দিয়ে চেহারা ঢেকে নিলেন’।[49]

৭. উপরে উঠতে ও নীচে নামতে দো‘আ পাঠ করা :

সফরে বা অন্য সময় উঁচু স্থানে উঠতে আল্লাহর বড়ত্ব প্রকাশ স্বরূপ ‘আল্লাহু আকবার’ এবং নীচে নামতে ‘সুবাহানা-ল্লাহ’ বলা। জাবির (রাঃ) বলেন,كُنَّا إِذَا صَعِدْنَا كَبَّرْنَا وَإِذَا نَزَلْنَا سَبَّحْنَا ‘আমরা যখন উপরের দিকে উঠতাম, ‘আল্লা-হু আকরাব’ ও যখন নীচের দিকে নামতাম তখন ‘সুব্হা-নাল্লাহ’ বলতাম’।[50] আবূ মূসা আল-আশ‘আরী (রাঃ) বলেন, এক সফরে আমরা আল্লাহর রাসূল (ছাঃ)-এর সঙ্গে ছিলাম। আমরা যখন কোন উপত্যকায় আরোহণ করতাম, তখন ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু’ এবং ‘আল্লাহু আকবার’ বলতাম। আর আমাদের আওয়াজ অতি উঁচু হয়ে যেত। নবী করীম (ছাঃ) আমাদেরকে বললেন,يَا أَيُّهَا النَّاسُ ارْبَعُوْا عَلَى أَنْفُسِكُمْ فَإِنَّكُمْ لَا تَدْعُوْنَ أَصَمَّ وَلَا غَائِبًا إِنَّهُ مَعَكُمْ إِنَّهُ سَمِيْعٌ قَرِيْبٌ تَبَارَكَ اسْمُهُ وَتَعَالَى جَدُّهُ، ‘হে লোক সকল! তোমরা নিজেদের প্রতি সদয় হও। তোমরা তো বধির বা অনুপস্থিত কাউকে ডাকছ না। বরং তিনি তো তোমাদের সঙ্গেই আছেন, তিনি তো শ্রবণকারী ও নিকটবর্তী’।[51]

৮. নির্দিষ্ট গন্তব্যে পৌছার পর দো‘আ পড়া :

খাওলাহ্ বিনতু হাকীম (রাঃ) বলেন, আমি রাসূলূল্লাহ (ছাঃ)-কে বলতে শুনেছি, যে ব্যক্তি কোন জায়গায় অবতরণ করে নিমেণাক্ত দো‘আটি পাঠ করবে তাহ’লে তাকে কোন জিনিস অনিষ্ট করতে পারবে না, তার ফিরে না যাওয়া পর্যন্ত।

أَعُوْذُ بِكَلِمَاتِ اللهِ التَّامَّاتِ مِنْ شَرِّ مَا خَلَقَ،

‘আমি আল্লাহর পরিপূর্ণ কালেমা সমূহের মাধ্যমে আল্লাহর সৃষ্টি সকল কিছুর অনিষ্টতা হ’তে আশ্রয় চাই’।[52]

৯. সফর অবস্থায় বেশী বেশী দো‘আ করা :

সফর অবস্থায় আল্লাহ দো‘আ কবুল করেন। তাই সফর অবস্থায় বেশী বেশী দো‘আ করতে হবে। নবী করীম (ছাঃ) বলেন, ثَلاَثُ دَعَوَاتٍ مُسْتَجَابَاتٌ لاَ شَكَّ فِيهِنَّ دَعْوَةُ الْوَالِدِ وَدَعْوَةُ الْمُسَافِرِ وَدَعْوَةُ الْمَظْلُومِ ‘তিন ব্যক্তির দো‘আ নিঃসন্দেহে কবুল হয়: পিতা-মাতার দো‘আ, মুসাফিরের দো‘আ, মাযলূমের দো‘আ’।[53]  হজ্জ বা ওমরার সফর হ’লে হজ্জের কাজের মধ্যে, ফাঁকে ফাঁকে অধিক দো‘আ করা। ইবনু ওমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত, নবী করীম (ছাঃ) বলেন,الْغَازِي فِيْ سَبِيْلِ اللهِ وَالْحَاجُّ وَالْمُعْتَمِرُ وَفْدُ اللهِ دَعَاهُمْ فَأَجَابُوْهُ وَسَأَلُوْهُ فَأَعْطَاهُمْ، ‘আল্লাহর পথের সৈনিক, হজ্জ ও ওমরা যাত্রীগণ আল্লাহর প্রতিনিধি। তারা আল্লাহর নিকট দো‘আ করলে তিনি তা কবুল করেন এবং কিছু চাইলে তা তাদেরকে দান করেন’।[54]

১০. ঘুম বা বিশ্রামের প্রয়োজন হ’লে চলাচলের রাস্তা পরিত্যাগ করা :

আবু হুরায়রা (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, রাসূল (ছাঃ) বলেন,

إِذَا سَافَرْتُمْ فِي الْخِصْبِ فَأَعْطُوا الإِبِلَ حَظَّهَا مِنَ الأَرْضِ وَإِذَا سَافَرْتُمْ فِي السَّنَةِ فَبَادِرُوا بِهَا نِقَيَهَا وَإِذَا عَرَّسْتُمْ فَاجْتَنِبُوا الطَّرِيْقَ فَإِنَّهَا طُرُقُ الدَّوَابِّ وَمَأْوَى الْهَوَامِّ بِاللَّيْلِ،

‘তোমরা যখন উর্বর ভূমি দিয়ে পথ অতিক্রম কর, তখন উটকে ভূমি থেকে তার অংশ দাও (অর্থাৎ কিছুক্ষণের বিচরণের জন্য ছেড়ে দাও)। আর যখন দুর্ভিক্ষগ্রস্ত বা অনুর্বর ভূমি দিয়ে পথ অতিক্রম কর তখন তাড়াতাড়ি (তাদের চলার শক্তি বাকী থাকতে) তা অতিক্রম করে যাও। আর যখন রাত্রি যাপনের জন্য কোথাও অবতরণ কর, তখন পথে (তাবু খাটানো) থেকে সরে থাকবে। কেননা তা হচ্ছে জীবজন্তু ও সাপ-বিচ্ছু ইত্যাদির রাত্রিবেলার আশ্রয়স্থল’।[55]

সফর অবস্থায় রাসূল (ছাঃ)-এর ঘুমানোর নিয়ম সম্পর্কে অন্য হাদীছে এসেছে,إِذَا كَانَ فِيْ سَفَرٍ فَعَرَّسَ بِلَيْلٍ اضْطَجَعَ عَلَى يَمِيْنِهِ وَإِذَا عَرَّسَ قُبَيْلَ الصُّبْحِ نَصَبَ ذِرَاعَهُ وَوَضَعَ رَأْسَهُ عَلَى كَفِّهِ- ‘তিনি সফররত অবস্থায় রাতে ঘুম থেকে জাগ্রত হ’লে ডান কাতে শুয়ে থাকতেন। আর ভোরের কাছাকাছি সময়ে জাগ্রত হ’লে তাঁর বাহু দাঁড় করিয়ে হাতের তালুতে ভর করে শুয়ে থাকতেন’।[56]

১১. সকালে দো‘আ পাঠ করা :

আবু হুরায়রাহ (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, তিনি বলেন, যখন নবী করীম (ছাঃ) সফরে থাকতেন ভোর হ’লে বলতেন,سَمِعَ سَامِعٌ بِحَمْدِ اللهِ وَنِعْمَتِهِ وَحُسْنِ بَلاَئِهِ عَلَيْنَا اللَّهُمَّ صَاحِبْنَا فَأَفْضِلْ عَلَيْنَا عَائِذًا بِاللهِ مِنَ النَّارِ، ‘সর্বশ্রোতা শ্রবণ করেছেন, আমরা আল্লাহর প্রশংসা করছি, আমাদের প্রতি তাঁর নে‘মতের স্বীকৃতি প্রদান করছি। হে আমাদের রব! তুমি আমাদের সাথী হও ও আমাদের প্রতি দয়া করো। আমরা আল্লাহর কাছে জাহান্নামের আগুন থেকে আশ্রয় চাই’।[57]

১২. সফরে ব্যবহৃত পশু বা জিনিসের প্রতি সদয় হওয়া :

সফরের কাজে ব্যবহার হওয়া জিনিসের প্রতি সদয় হ’তে হবে। চাই তা পশু হোক বা আধুনিক যানবাহন হোক। পশু হ’লে তাকে সঠিক সময়ে খাদ্য-পানীয় দেওয়া বিশ্রামের ব্যবস্থা করা এবং তার প্রতি যুলুম না করা। আর আধুনিক যানবাহন হ’লে সেটা নষ্ট না করা অপ্রয়োজনীয় কিছু না লেখা ইত্যাদি।

১৩. সওয়ারী হোঁচট খেলে বলবে :

আবুল মালীহ (রহঃ) এক ব্যক্তি থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, আমি একটি সওয়ারীতে নবী করীম (ছাঃ)-এর পিছনে বসা ছিলাম। হঠাৎ তার সওয়ারী হোঁচট খেলে আমি বললাম, শয়তান ধ্বংস হয়েছে। তিনি বললেন, একথা বল না, যে শয়তান ধ্বংস হয়েছে। কেননা তুমি একথা বললে সে অহংকারে ঘরের মত বড় আকৃতির হয়ে যাবে এবং সে বলবে, আমার ক্ষমতা হয়েছে। অতএব বল, বিসমিল্লাহ বা আল্লাহর নামে। যখন তুমি বিসমিল্লাহ বলবে শয়তান হ্রাসপ্রাপ্ত হয়ে মাছির মত হয়ে যাবে’।[58]

১৪. সফরে কুকুর বা ঘণ্টা না রাখা :

আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূল (ছাঃ) বলেন,لاَ تَصْحَبُ الْمَلاَئِكَةُ رُفْقَةً فِيْهَا كَلْبٌ وَلاَ جَرَسٌ، ‘ফেরেশতারা ঐ সফরকারী দলের সঙ্গে অবস্থান করেন না, যাতে কোন কুকুর বা ঘণ্টা থাকে’।[59] অন্য হাদীছে রাসূল (ছাঃ) বলেছেন, ‘ঘণ্টাই হ’ল শয়তানের বাঁশি’।[60]

১৫. সফরে সঙ্গী-সাথীদের যথাসাধ্য সাহায্য করা :

আবূ সাঈদ খুদরী (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদা আমরা কোন সফরে নবী করীম (ছাঃ)-এর সঙ্গে ছিলাম। এমন সময় জনৈক ব্যক্তি সওয়ারীতে আরোহণ করে আগমন করল। অতঃপর সে তার দৃষ্টি ডানে-বামে ফিরানো শুরু করল। তা দেখে রাসূল (ছাঃ) বলেন,مَنْ كَانَ مَعَهُ فَضْلُ ظَهْرٍ فَلْيَعُدْ بِهِ عَلَى مَنْ لاَ ظَهْرَ لَهُ وَمَنْ كَانَ لَهُ فَضْلٌ مِنْ زَادٍ فَلْيَعُدْ بِهِ عَلَى مَنْ لاَ زَادَ لَهُ ‘যার নিকট অতিরিক্ত সওয়ারী আছে, যার নেই তার জন্য যেন নিয়ে আসে, আর যার নিকট নিজের পাথেয়র অতিরিক্ত রয়েছে, যার নেই তার জন্য যেন নিয়ে আসে’।[61]

১৬. সমস্ত পাপকাজ থেকে বিরত থাকা :

সফরে সকল প্রকার দৃশ্যমান ও অদৃশ্য পাপ কাজ থেকে বিরত থাকা যরূরী। বিশেষ করে হজ্জের সফরের ব্যপারে আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন,الْحَجُّ أَشْهُرٌ مَّعْلُوْمَاتٌ فَمَن فَرَضَ فِيْهِنَّ الْحَجَّ فَلاَ رَفَثَ وَلاَ فُسُوْقَ وَلاَ جِدَالَ فِي الْحَجِّ، ‘হজ্জের সময় নির্দিষ্ট মাসসমূহ। অতএব এই মাসসমূহে যে নিজের উপর হজ্জ আরোপ করে নিল, তার হজ্জে অশ্লীল ও পাপ কাজ এবং ঝগড়া-বিবাদ বৈধ নয়’ (বাক্বারাহ ২/১৯৭)।

১৭. কোন গ্রামে প্রবেশের সময় দো‘আ পাঠ করা :

সফর কালে কোন গ্রামে প্রবেশ করলে নিমেণাক্ত দো‘আ পাঠ করে প্রবেশ করবে,

اللَّهُمَّ رَبَّ السَّمَاوَاتِ السَّبْعِ وَمَا أَظْلَلْنَ وَرَبَّ الأَرَضِيْنَ السَّبْعِ وَمَا أَقْلَلْنَ وَرَبَّ الشَّيَاطِيْنِ وَمَا أَضْلَلْنَ وَرَبَّ الرِّيَاحِ وَمَا ذَرَيْنَ أَسْأَلُكَ خَيْرَ هَذِهِ الْقَرْيَةِ وَخَيْرَ أَهْلِهَا وَأَعُوْذُ بِكَ مِنْ شَرِّهَا وَشَرِّ أَهْلِهَا وَشَرِّ مَا فِيْهَا-

‘হে সপ্তাকাশ ও যা কিছু তার নীচে রয়েছে তার রব! হে সপ্ত যমীন ও তার উপরে যা কিছু রয়েছে তার রব, শয়তান ও যাদের তারা পথভ্রষ্ট করেছে তাদের রব এবং হে প্রবাহিত বাতাস ও বাতাসে যা কিছু উড়িয়ে নিয়ে যায় তার বর। নিশ্চয়ই আমরা তোমার নিকট এই গ্রাম ও এর অধিবাসীদের কল্যাণ কামনা করি এবং আমরা তোমার নিকট এই গ্রাম ও গ্রামবাসীদের ও এর মধ্যে যে অনিষ্ট ও অমঙ্গল আছে তা হ’তে আশ্রয় চাই’।[62]

১৮. কারো বাড়িতে/ঘরে প্রবেশের নিয়ম :

সফর অবস্থায় বা অন্য সময় কারো ঘরে বা বাড়ীতে প্রবেশের সময় বাড়ীওয়ালার অনুমতি নিবে এবং সালাম দিয়ে প্রবেশ করবে’।[63] বাড়ীওয়ালা কোন কারণে অনুমতি না দিলে বা ফিরে যেতে বললে ফিরে যাবে’ (নূর ২৪/২৮)।

ওহির প্রকারঃ

১. সত্য স্বপ্নঃ স্বপ্নের মাধ্যমে নাবী কারীম (ﷺ)-এর উপর ওহী অবতীর্ণ হয়।

২. ফিরিশতা দেখা না দিয়ে অর্থাৎ অদৃশ্য অবস্থান থেকেই রাসূল (ﷺ)-এর অন্তরে ওহী প্রবেশ করিয়ে দেন। এ প্রসঙ্গে নাবী কারীম (ﷺ) যেমনটি ইরশাদ করেছেনঃ

(‏إن روح القدس نفث في روعى أنه لن تموت نفس حتى تستكمل رزقها، فاتقوا الله وأجملوا في الطلب، ولا يحملنكم استبطاء الرزق على أن تطلبوه بمعصية الله ، فإن ما عند الله لا ينال إلا بطاعته‏)

অর্থঃ ‘জিবরাঈল (আঃ) ফিরিশতা আমার অন্তরে এ কথা নিক্ষেপ করলেন যে, কোন আত্মা সে পর্যন্ত মৃত্যুবরণ করবে না যে পর্যন্ত তার ভাগ্যে যতটুকু খাদ্যের বরাদ্দ রয়েছে পুরোপুরিভাবে তা পেয়ে না যাবে। অতএব, তোমরা আল্লাহকে সমীহ কর এবং রুজি অন্বেষণের জন্য ভাল পথ অবলম্বন কর। রুজি প্রাপ্তিতে বিলম্ব হওয়ায় তোমরা আল্লাহর অসন্তোষের পথ অন্বেষণে যেন উদ্বুদ্ধ না হও। কারণ, আল্লাহর নিকট যা কিছু রয়েছে তা তাঁর আনুগত্য ছাড়া পাওয়া দুস্কর।

৩. ফেরেশতা মানুষের আকৃতি ধারণপূর্বক নাবী কারীম (ﷺ)-কে সম্বোধন করতেন। তারপর তিনি যা কিছু বলতেন নাবী কারীম (ﷺ) তা মুখস্থ করে নিতেন। এ অবস্থায় সাহাবীগণ (রাঃ)ও ফেরেশতাকে দেখতে পেতেন।

৪. ওহী অবতীর্ণ হওয়ার সময় নাবী কারীম (ﷺ)-এর নিকট ঘন্টার টুন টুন ধ্বনির মতো ধ্বনি শোনা যেত। ওহী নাযিলের এটাই ছিল সব চাইতে কঠিন অবস্থা। টুন টুন ধ্বনির সংকেত প্রকাশ করতে করতে ফিরিশতা ওহী নিয়ে আগমন করতেন এবং নাবী (ﷺ)-এর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতেন। ওহী নাযিলের সময় কঠিন শীতের দিনেও রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর কপাল থেকে ঘাম ঝরতে থাকত। তিনি উষ্ট্রের উপর আরোহণরত অবস্থায় থাকলে উট বসে পড়ত। এক দফা এইভাবে ওহী নাযিল হওয়ার সময় রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর উরু যায়দ বিন সাবেত (ﷺ)-এর উরুর উপর ছিল। তখন তাঁর উরুতে এতই ভারবোধ হয়েছিল যে মনে হয়েছিল যেন উরু চূর্ণ হয়ে যাবে।

৫. নাবী কারীম (ﷺ) ফিরিশতাকে কোন কোন সময় নিজস্ব জন্মগত আকৃতিতে প্রত্যক্ষ করতেন এবং আল্লাহর ইচ্ছায় সেই অবস্থাতেই তিনি তাঁর নিকট ওহী নিয়ে আগমন করতেন। নাবী কারীম (ﷺ)-এর এ রকম অবস্থা দু’বার সংঘটিত হয়েছিল যা আল্লাহ তা‘আলা সূরাহ ‘নাজমে’ উল্লে­খ করেছেন।

৬. পবিত্র মি’রাজ রজনীতে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) যখন আকাশের উপর অবস্থান করছিলেন সেই সময় আল্লাহ তা‘আলা নামায এবং অন্যান্য বিষয় সম্পর্কে সরাসরি হুকুমের মাধ্যমে ওহীর ব্যবস্থা করেছিলেন।

৭. আল্লাহ তা‘আলার সঙ্গে নাবী কারীম (ﷺ)-এর সরাসরি কথোপকথন যেমনটি হয়েছিল, তেমনি মূসা (আঃ)-এর সঙ্গে হয়েছিল। মূসা (আঃ)-এর সঙ্গে যে আল্লাহ তা‘আলার কথোপকথন হয়েছিল কুরআন কারীমে তা অকাট্যভাবে প্রমাণিত হয়েছে। কিন্তু আল্লাহ তা‘আলার সঙ্গে নাবী কারীম (ﷺ)-এর কথোপকথনের ব্যাপারটি হাদীস দ্বারা প্রমাণিত হয়েছে (কুরআন দ্বারা নয়)।

কিছু প্রশ্নঃ

১)প্রশ্নঃ নবী এবং রাসূল(আলাইহিমুস সালাম)দের মধ্যে আসমানি কিতাব নাযিল হওয়া বা না হওয়া ব্যতীত তাঁদের দায়িত্ব -কর্তব্য বা মর্যাদায় কোন পার্থক্য আছে কি?

নবী ও রাসুলের মধ্যে  পার্থক্যের ব্যাপারে উলামায়ে  কেরামদের  মাঝে অনেক  মতবিরোধ  রয়েছে ।

সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য মত হলোঃ

রাসুল তাহাকে বলা হয়, যিনি নতুন শরীয়ত  নিয়ে এসেছেন।

এর দুই ছুরতঃ

০১) ঐ শরীয়ত  একেবারেই নতুন,ইতিপূর্বে এই শরীয়ত কেহই পেশ করেননি।

(০২) ইতিপূর্বে  ঐ শরীয়ত  নিয়ে কেহ এসেছিলো,কিন্তু যেই কওমের কাছে তিনি এসেছেন,তাদের কাছে এটা নতুন।

যেমন হযরত ঈসমাইল আঃ তার বাবা হযরত ইব্রাহিম  আঃ এর শরীয়ত  নিয়েই এসেছিলেন,কিন্তু জুরহাম গোত্রের নিকট ঐ শরীয়ত  নতুন ছিলো,যেনো এই শরীয়ত ঐ কওমের জন্য নতুন ছিলো।

,

★এবং নবী তাহাকে বলা হয় যাহার উপর ওহি আসে,চাই তিনি নতুন শরীয়ত নিয়ে আসুক,বা পুরাতন শরীয়তেরই তিনি মুবাল্লিগ হোক।

যেমন বনী ঈসরায়েলের অধিকাংশ নবীই হযরত মুসা আঃ এর শরীয়তের দাওয়াত দেওয়ার জন্য এসেছিলেন।

,

শাইখুল ইসলাম  আল্লামা শিব্বির আহমেদ উসমানী রহঃ নবি ও রাসুলের মধ্যে  পার্থক্য বর্ণনা করেন যে নবী বলা হয় যাদের কাছে আল্লাহর পক্ষ থেকে ওহি আসে।

,

আম্বিয়ায়ে কেরামদের মধ্যে কিছু নবীর বিশেষত মর্যাদা দেওয়া হয়েছিলো,যেমন তাদেরকে কাফেরদের মোকাবেলায় পৃথক উম্মতের কাছে পাঠানো হয়েছিলো,অথবা নতুন কিতাব এবং স্বয়ংসম্পুর্ন শরীয়ত  দেওয়া হয়েছিলো।

)প্রশ্নঃ

তাক্বদীরের ২ নং স্তরে বলা হয়েছে মায়ের গর্ভে ৪০ দিন পর রুহ ফুঁকে দেয়া হয় এবং ৪ টি জিনিস লিখে দেয়া হয়। আমরা তো জানি প্রত্যেকের ভাগ্য ৫০ হাজার বছর পূর্বেই লেখা হয়েছে। তাহলে কি জন্মের পর থেকেই ভাগ্যের সংযোজন বিয়োজন শুরু হয়ে যায়?

তাকদির বা পূর্বলেখনের স্তর চারটি। তাহলো,

১.   তাকদিরে আম : সব সৃষ্টির জন্য লাওহে মাহফুজে যে ভাগ্য লিপিবদ্ধ রয়েছে তাকে তাকদিরে আম বা সাধারণ ভাগ্য বলা হয়। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আপনি কি জানেন না, নিশ্চয়ই আল্লাহ আসমান ও জমিনে যা কিছু রয়েছে সে বিষয়ে পরিজ্ঞাত, নিশ্চয়ই তা কিতাবে লিপিবদ্ধ রয়েছে, নিশ্চয়ই তা আল্লাহর কাছে খুবই সহজ। ’ (সুরা হজ, আয়াত : ৭০)

২.   তাকদিরে উমুরি বা জীবনব্যাপী ভাগ্যলিপি : এ ধরনের তাকদির লাওহে মাহফুজে লিপিবদ্ধ তাকদির থেকে ভিন্ন। কেননা তাকদিরুল উমুরি পরিবর্তন হয়, এমনকি বিলুপ্তও হয়। আর যা লাওহে মাহফুজে লিপিবদ্ধ রয়েছে তা কখনই পরিবর্তিত হয় না। এ ব্যাপারে আল্লাহ বলেন, ‘আল্লাহ যা চান বিলুপ্ত করেন এবং যা চান অবশিষ্ট রাখেন। তাঁর কাছে রয়েছে মূল কিতাব। ’ (সুরা রাদ, আয়াত : ৩৯)

     ওমর ইবনে খাত্তাব (রা.) বলতেন, ‘হে আল্লাহ! যদি আপনি আমাকে হতভাগ্য লিখে থাকেন তবে তা মুছে দেন এবং আমাকে ভাগ্যবান লিখে দেন। ’ (কিসমুল হাদিস : ৫/১৩)

     মুহাদ্দিসদের মত হলো, এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো ফেরেশতাদের কাছে বিদ্যমান ভাগ্যলিপি।

৩.   তাকদিরে সানুবি বা বার্ষিক ভাগ্যলিপি : তা লাইলাতুল কদরে লিপিবদ্ধ করা হয়। আল্লাহ বলেন, ‘এ রাতে প্রত্যেক প্রজ্ঞাপূর্ণ বিষয় স্থিরকৃত হয়। ’ (সুরা দুখান, আয়াত : ৪)

৪.   দৈনন্দিন ভাগ্যলিপি : প্রতিদিন আল্লাহ তাআলা তাঁর বান্দার জন্য যা দান করে থাকেন তাকেই দৈনন্দিন ভাগ্যলিপি বলা হয়। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তিনি প্রত্যহ গুরুত্বপূর্ণ কাজে রত। ’ (সুরা আর রহমান, আয়াত : ২৯)

)প্রশ্নঃ

বর্তমান যে সারগোসি মাদার নামে জঘন্য কর্ম শুরু হয়েছে তা কি কিয়ামতের আলামত যেমন দাসী তার মনিবকে জন্ম দিবে এই অংশটুকুর আওতায় পড়ে?

এটি একটি চমৎকার প্রশ্ন। হ্যাঁ। এটিও হাদিসে উল্লেখিত দাসীর গর্ভে মালিকের জন্মের অন্তর্ভুক্ত। কারন সারগোসির ক্ষেত্রে যে ঐ নারীর গর্ভ ভাড়া নেয় সে পক্ষান্তরে ঐ নারীরই মালিক, সুতরাং তার সন্তানও পক্ষান্তরে মালিকপক্ষের হিসেবে মালিকই বটে। সুতরাং বাচ্চাটি নিজের দাসীর গর্ভেই জন্ম নেয়। এবং জন্মের পরেও এই বিষয়টি আরো প্রকট হয়ে বুঝা যায়। কারণ এরপর থেকে ঐ সন্তানের সাথে ঐ গর্ভধারিনীর সাথে আর কোনো সম্পর্ক থাকেনা।   আরেকটি হাদিসে আছে কেয়ামতের আলামতের মধ্যে একটি হলো- শেষ জমানায় পরিচয়হীন সন্তান বেড়ে যাবে।

Share this article

Leave a Reply

AllEscort