উসমানি সাম্রাজ্যের অজানা অধ্যায়

Share this article
উসমানিরা দিগ্বিজয়ী, সফলকাম।  তাঁরা ফী সাবিলিল্লাহ’র পথিক। যুদ্ধলব্ধ সম্পদ তাঁরা বিলিয়ে দিয়েছে সত্য ও নুসরতের পথে।  দ্বীনের অববাহিকায় ব্যয় করেছে অঢেল রত্ন ও অমূল্য রাজকোষ।  দুনিয়ার কুহেলিকা তাদের ধোঁকায় ফেলতে পারেনি।  শিরিকের ধ্বজাধারীদের উপর তাঁরা চরম প্রতিশোধ গ্রহণ করেছে

উরুক্বশ বেগ

উসমানী সুলতানদের নাম শুনলেই সাধারণত আমাদের সামনে উন্মুক্ত তরবারী হাতে রক্তক্ষয়ী রণক্ষেত্রে ঝাপিয়ে পড়া একদল সেনাপতির অসম লড়াইয়ের দৃশ্য ভেসে উঠে । চোখে ভাসে রাজনীতির ময়দানে বিশ্বনেতাদের সামনে অগ্নিগর্ভ বক্তব্য দেয়া জাদরেল উসমানী নেতৃবর্গ। জেনে হোক বা জেনেই, আমরা মনে করি ইতিহাসের পাতায় ঠাই পাওয়ার মতো তাদের জীবনে মানবিক কোনো দিক নেই।

আমরা ধরেই নিয়েছি তাদের যেনো কোনো কান্নার গল্প ছিলো না, ছিলোনা হাসির স্মৃতি, কিংবা ছিলোনা আনন্দ-বেদনার কোনো অনুভূতি।  তাদের কোমল হৃদয়ের গল্পগুলো অপ্রকাশিত থেকে যাওয়ায়, আমরা নতুন করে ইতিহাসের পরতে দৃষ্টি মেলে ধরতে চাই, যে দৃষ্টিতে উঠে আসবে তাদের না জানা গল্পগুলো। যে গল্পরা বদলে দেবে আমাদের মগজে গেড়ে বসা তাদের সেই কঠিন চেহারাগুলো, তাদের কর্কশ ইতিহাসগুলো।

ইতিহাসের খটমটে বইগুলো উসমানী সুলতানদেরকে স্রেফ কিছু অস্ত্রধারী যোদ্ধা হিসেবে তুলে ধরেছে, রাজপ্রাসাদের বাহিরে যাদের হৃদয়ছোঁয়া কোনো উপাখ্যান নেই। এইসব ইতিহাসপাঠ তাদের ভিতরে থাকা দয়া ও মনুষত্বের দিগন্তকে মেলে ধরতে পারেনি ফলে আমাদের অন্তরগুলো তাদের ভালোবাসায় আন্দোলিত হতে বাঁধা পায়। অথচ এমনটা হওয়ার তো কথা ছিলোনা!

সাম্রাজ্যের অধিকারি হলেও দিনশেষে তারাও ছিলেন আপনার আমার মতোই সাধারণ মানুষ। তাদেরও  মাথা ব্যাথা হতো, নখ লম্বা হলে কাটতে হতো। তাঁরাও দাঁতের ব্যাথায় কাঁতর হতেন, বিরক্তিবোধ করতেন, আবার ভালোবাসায় সিক্তও হতেন। সুলতান প্রথম আব্দুল হামীদ তাঁর স্ত্রী রুহশাহকে নিয়ে যে প্রেমকাব্যটি রচনা করেছিলেন তা এখনও অমর হয়ে আছে। কাব্যের পঙতিতে পঙতিতে ফুটে উঠেছে তিনি নিজের সুপ্ত প্রণয় মেলে ধরতে কতটা দক্ষ ছিলেন।

যুদ্ধ ও বিজয়ের রোমাঞ্চ তাদের মন প্রশান্ত করতে যথেষ্ট ছিলোনা, সুলতানদের অনেকেই অবসাদ কাটাতে সুর-মোর্ছনা, কাব্য, পশু-শিকার, অশ্বারোহন, মল্লযুদ্ধের মত বিনোদনে অবগাহন করতেন। কখনো সময় কাটাতেন কাঠশিল্প কিংবা কারুশিল্প নিয়ে, এমনকি অনেক সময় দেখা যেতো মেয়েলী কাজ সূচিকর্ম কিংবা হস্তশিল্প নিয়েও ব্যস্ত হতে।  কিন্তু তাদের এই শৈল্পিক অবসরযাপন স্বেচ্ছায় হোক বা ভুলে ইতিহাসের পাতায় কেউ লিখে রাখেনি।

উসমানী সুলতানদের এই সাধাসিধে জীবনের অদেখা গল্পগলোর অদ্যোপান্ত নিয়ে আলাদা গ্রন্থ রচনা প্রায় অসম্ভব ব্যাপার। রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব কিংবা সমরবিদ হিসেবে তাদের ঘটনায় ইতিহাস টইটম্বুর। কিন্তু বিশেষ করে সাধারণ মানুষ হিসেবে তাদের জীবনের অজ্ঞাত কাহিনী তুলে ধরার কাজটি হয়ে উঠেনি, ইতিহাসের গম্ভীর আলাপের ফাঁকে তাদের ব্যক্তিগত জীবন সম্পর্কে  দু’ চার লাইন হয়তো উল্লেখ হয়ে থাকে।

আপনাদের হাতে কদাচিৎ কিছু এমন আলোচনা এসে থাকবে যা সুলতানদের কাব্য রচনার দিকটা তুলে ধরে, কিংবা হস্তলিপি ও সুর যোজনার বিবরণ আছে, এগুলো তাদের বাড়তি সময়ের শখের বস্তু নিয়ে আলাপ। কিন্তু আলোচনাগুলো সবসময় নির্দিষ্ট গন্ডির বাহিরে যায়না। যেমন ধরুন, “হস্তলিপিবিশারদ সুলতান” বা “সুরকার সুলতান” এরকম শিরোনামে বেশ কিছু প্রবন্ধ পাওয়া যায়।

কিন্তু এই বিষয়ভিত্তিক প্রবন্ধগুলো অগোছালো, দীর্ঘ আলোচনার ফাঁকে খন্ড খন্ড ঘটনা তুলে ধরে মাত্র। কিন্তু যখনই আমরা তাদের শৈল্পিকতার নান্দনিক গল্পগুলোর আরো গভীরে প্রবেশ করতে যাই, তখনই উন্মেষ ঘটে আশ্চর্য্য সৌন্দর্য্যের। ঘটনার মোড়ে মোড়ে অপেক্ষা করে স্তম্ভিত করে দেয়ার মতো উপাখ্যান। সুলতানদের শৌখিন শিল্পকর্মের মধ্যে সবসময় সুলতান দ্বিতীয় আব্দুল হামীদের অলংকারিক কাঠশিল্পের কথা আলোচিত হয়, কিন্তু এই শিল্পগুণ যে তিনি তাঁর পিতা আব্দুল মাজীদ থেকে অর্জন করেছেন এই মূল্যবান তথ্যটা তুলে ধরার মতো লেখাজোঁকার দেখা পাওয়া দুষ্কর।

তাই এই গ্রন্থটি রচনার পেছনে আমার উদ্দেশ্য ছিলো, শত সহস্র বইপুস্তকের ভীড় থেকে, ইতিহাসের বিশ্বকোষ থেকে দুর্লভ ও রত্নতুল্য ঘটনাগুলো ছেঁকে বের করে আনা। সময়ের প্রলেপে ঢেকে যাওয়া উসমানী ইতিহাসের মনোমুগ্ধকর গল্পগুলোর ডালা খুলে দেয়া। এই অন্তপুরবাসী লাজুক  ইতিহাসের পরতে পরতে পাঠকের হৃদস্পন্দন বাড়তেই থাকবে।

প্রামান্য তথ্য উপাত্ত্বের উপর ভিত্তি করে লিখিত এই গ্রন্থটি নিঃসন্দেহে আরো বিশদ ও বৃহৎ কলেবরে রচনা করা সম্ভব। মূল কাঠামোর উপর উসমানী সুলতানদের নানান শিল্পকীর্তির নমুনা, কাব্য ও সুরের উপমা, তাদের আমোদ বিনোদন ও হাস্যরসের উদাহরণ দিয়ে গ্রন্থটিকে আরো চওড়া করার সুযোগ ছিলো। কিন্তু এমনটা আমার উদ্দেশ্য নয়। আমার লক্ষ্য ছিলো যথাসম্ভব সংক্ষেপে বিশুদ্ধ তথ্যগুলো তুলে ধরা।

আর সেই তথ্যভান্ডারের উৎস জানিয়ে দেয়া যেখান থেকে আমি রত্নগুলো তুলে এনেছি। যাতে করে আগামীর গবেষকদের কাছে এর ঠিকানাটা জানা হয়ে যায়। এর চেয়ে বড় কথা হলো, আমি চেয়েছি উসমানী সুলতানদের পারিবারিক  সংস্কৃতির কেল্লায় আমিই প্রথম প্রবেশ করে উত্তরসূরীদের পথ দেখাবো। অনাগত প্রজন্মের সামনে উসমানী সাম্রাজ্যের অজানা পাঠের ডালা মেলে ধরবো, ফলে তারাও অন্যদের কাছে এই সুখপাঠ্য ইতিহাসের প্রেমে মজবে। আমার উদ্দেশ্য সবসময় একটাই- ইতিহাসকে সুখপাঠ্য করা এবং ইতিহাসকে ঘিরে পাঠকের মনে চিন্তার খোরাক তৈরি করা।

 এই নতুন ইতিহাস আপনাদের কানে ফিসফিসিয়ে বলবে, এতোদিনের জেনে আসা উসমানী সম্রাটদের মারকুটে চরিত্রের আড়ালে রয়েছে সুষুপ্ত কিছু আবেগী ইতিহাস যা প্রচলিত গ্রন্থগুলোতে অনুপস্থিত। বইয়ের পাতায় পাতায় আপনার চোখে ভেসে উঠবে কখনো সুলতান ফাতেহ বাগানে হেঁটে হেঁটে গোলাপ তুলছেন আর গুনগুনিয়ে গান গাইছেন, কখনো দেখতে পাবেন প্রতাপশালী সুলতান সেলিম স্বর্ণ গলিয়ে নান্দনিক অলঙ্কার বানাচ্ছেন। মনে হবে আপনি সুলতান ২য় সেলিমের পাশে বসে দেখছেন নিজে হজে যেতে না পারার আক্ষেপ ঘুচাতে তিনি হাজীদের জন্য পাথেয় গুছিয়ে দিচ্ছেন।

তিন তিনটি মহাদেশ দোর্দন্ড প্রতাপে শাসন করা উসমানী সুলতানদের ব্যক্তিজীবনের অজানা ইতিহাসের পসরা মেলে ধরবে এই গ্রন্থ।

পাঠকদের উদ্দেশ্যে আরেকটু জানিয়ে রাখি, এই গ্রন্থে উসমানী সুলতানদের শয়নকক্ষের গল্পগুলো হয়তো খুব একটা নেই, তবে সামনে আরেকটি বই আসছে যা উসমানী নারীকূল ও দাম্পত্যের নানান দিক নিয়েই শুধু আলোকপাত করবে। যারা সেইসব দাম্পত্যের গল্প জানতে আগ্রহী তাদেরকে আরেকটু আরেকটু অপেক্ষা করতে হয় যে!

পরিশেষে, অদ্যকার গ্রন্থের মৌলিক বিষয়বস্তু নিয়ে কিছু আলোকপাত করা যাক।

উসমানী রাজপরিবারের প্রতিটি সদস্য উত্তরাধিকার সূত্রেই রকমারি হস্তশিল্প ও নানারকম কারিগরি শিল্পকর্ম চর্চায় অভ্যস্ত ছিলো। শৈশব থেকেই উসমানী শাসকরা তাদের পরিবারের সন্তানদেরকে ঘরোয়া পরিবেশেই ভ্রাতৃত্ব রক্ষাকারী যোগ্যতা (যেমন, বিভিন্ন পেশায় সিদ্ধহস্তদের মধ্যে আভ্যন্তরীণ সম্পর্ক) ও তারুণ্যের নানান দিক প্রশিক্ষণ দিতেন।  রাজপরিবারের মননে  ইসলামী ও তুর্কি সংস্কৃতি এমনভাবে যুগ যুগ ধরে জিইয়ে ছিলো যে, প্রত্যেক যুবককে জীবনঘনিষ্ঠ পেশা কিংবা শিল্প শিখে নিতে হতো যাতে করে কখনো ভাগ্য সুপ্রসন্ন না হলেও তারা জীবিকা চালিয়ে নিয়ে যেতে পারে। ফলে, এই সময়গুলো ছিলো উসমানী খেলাফতকালের সোনালী যুগ স্বরূপ। যার ফলাফল বাস্তব ও ব্যবহারিক ময়দানে দেখা গিয়েছে। চমকপ্রদ তথ্য হলো, তাদের এই পারিবারিক ঐতিহ্য প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম লালন করে গেছে।

ইসমাঈল দানীশমুন্দ যথার্থই বলেছেন, সুলতানরা বিভিন্ন শিল্পবিদ্যা চর্চার মাধ্যমে নিজেদের যোগ্যতা প্রমাণ করতেন। তিনি বলেন-“সুলতানদের সেইসব কারিগরি দক্ষতা তাদের জীবিকা নিশ্চিত করতো; পণ্যগুলো কখনো ভীনদেশে বিক্রি হতো, কখনো অন্য রাজত্বের রাজপ্রাসাদে যেতো, আবার কখনো বাজারের ক্রেতারাই এর জন্য ভীড় জমাতো”। এই গ্রন্থে আপনারা এমনই কিছু চমকপ্রদ অনুসন্ধানের সন্ধান পাবেন।

এটাই বাস্তবতা যে, ভবিষ্যতের সুলতানদের শিল্পদক্ষতা ও কারিগরি সক্ষমতা রাজপ্রাসাদেই গড়েউঠেছিলো, যে শিক্ষানিকেতনকে “আমীরদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান” বলে অভিহিত করা হয়ে থাকে। [1] আর এটাও সত্য যে, একটি শ্রেণী বৈষম্যহীন সমাজের একমাত্র অভিজাত রাজকীয় পরিবার শিল্প ও কারিগরি শিক্ষা প্রসারে অগ্রদূতের ভূমিকা পালন করবে। এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব নিয়ে বলার অপেক্ষা রাখেনা।

উসমানি সাম্রাজ্যের অজানা অধ্যায়

বক্ষ্যমাণ গ্রন্থে আমি উসমানী সুলতানদের শৌখিন দক্ষতা তুলে এনেছি। শিল্পনৈপুণ্যের দিকে তাদের ঝোঁক, তাদের পেশা, শিল্পকর্ম, তাদের অনুরাগ, শিষ্টাচার, ব্যক্তিত্ব ও তাদের চর্চিত নীতি-নৈতিকতার নানান প্রেক্ষাপট উঠে এসেছে। খুবই পরিপাটি ও গোছানো কলেবরে ফুটে উঠেছে সেইসব গল্পগাঁথা। [2]

অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই আপনাদের সামনে এক বর্ণিল প্রদর্শনীর পর্দা উন্মোচন হতে যাচ্ছে, পাঠক আপনি এমন সব ব্যক্তিত্বের পরিচয় লাভ করতে যাচ্ছেন যাদেরকে মনে হবে খুব নিকট কোনো আপনজন, যাদেরকে গ্রহণ করে নিতে আপনি উন্মুখ হবেন। এক নীরব ইতিহাস ভ্রমণে নিয়ে যাচ্ছি আপনাদেরকে যার প্রতি মোড়ে মোড়ে অপেক্ষা করছে ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বদের ব্যক্তিগত অনবদ্য গল্প। ইতিহাস তো লিখিতই হয় এমন সব ব্যক্তিদের পরিচয় তুলে ধরতে!


[1] এই শিক্ষাকেন্দ্র সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে পড়ুন- যিয়া ইরকিন্স ম্যাগাজিনের ২৪ তম জানুয়ারী সংখ্যায় প্রকাশিত তোপকাপি রাজপ্রাসাদে আমিরদের শিক্ষাকেন্দ্র ইতিহাস কথা বলে। পৃষ্ঠাঃ ২০৫৮-২০৫৯

[2] প্রচলিত আছে, কিছু উসমানী সুলতানদের নাম অজানা রয়ে গেছে যারা চর্মশিল্প ও ছুরির খাঁজ শিল্পে পারদর্শী ছিলো, সম্ভবত এর বিশেষ কোনো পদ্ধতি ছিলো তাদের কাছে যা কোথাও লিপিবদ্ধ করা হয়নি, যা আমরা কখনোই জানতে পারবো না।

– সাঈদুল মোস্তফা

অনুবাদকের ফেসবুক আইডি

আরো ইতিহাস পড়ুন এখানে

Share this article