কোরআন থেকে ভবিষ্যত যোগাযোগ প্রযুক্তি উদ্ভাবন ধারণা কি সত্যি?

Share this article
কোরআন থেকে ভবিষ্যত যোগাযোগ প্রযুক্তি ও যানবাহন উদ্ভাবন ধারণা কি সত্যি?

সূরা নাহালের ৮ নং আয়াত নিয়ে মুফাসসিরগণের অভিমত

প্রথমে আমরা উক্ত আয়াতের সরল অনুবাদ দেখি-

“তোমাদের আরোহণ ও শোভাবর্ধনের জন্য তিনি ঘোড়া, খচ্চর ও গাধা সৃষ্টি করেছেন। আর তিনি এমন জিনিস সৃষ্টি করেন যা তোমরা জান না”

আয়াতটির প্রথম অংশ স্পষ্ট। দ্বিতীয় অংশ নিয়ে আধুনিক ও পূর্বতন মুফাসসিরদের অভিমত নিম্নে তুলে ধরছিঃ

প্রাচীন মুফাসসিরগণ এই অংশ থেকে সর্বমোট তিন ধরণের অভিমত করেছেন।

১) জান্নাতে মুমিনদের জন্য আল্লাহ অজানা অনেক বাহন, প্রাণী বা নেয়ামত সৃষ্টি করবেন।
২) আল্লাহ মাটির তলদেশে, সাগরের তলদেশে ঘোড়া, খচ্চর ও গাধা সদৃশ এমন অনেক বাহনই সৃষ্টি করেন।
৩) সাধারণ চোখে দেখা যায়না এমন পোকা, প্রাণীর সৃষ্টি, যেমন ফলের ভিতরের পোকা, অদৃশ্য কীট (জীবানু বোঝাতে চেয়েছেন সম্ভবত)

  • ইমাম বগভী আয়াতের এই অংশের তাফসীরে বলেন, অর্থাৎ, আল্লাহ জান্নাতবাসীর জন্য যা সৃষ্টি করবেন, জাহান্নামবাসীর জন্যে যা তৈরি করবেন। যা কখনও কোন চোখ দেখেনি, কান শুনেনি, হৃদয় কল্পনা করেনি। তিনি বলেন কতাদা জানান, গাছের ভিতর থাকা কীট ও ফলের ভিতর থাকা পোকা উদ্দেশ্য।
  • এ বিষয়ে ইমাম ইবনে কাসিরের বিশেষ কোন বক্তব্য পাওয়া যায়না।
  • ইমাম কুরতুবী এই অংশের তাফসিরে কয়েক ধরণের বক্তব্য লিখেন, জমহুরের মতে এগুলো হল পোকামাকড় ও জীব যা মাটির নিচে থাকে এবং সাগরতলে থাকে। যা সম্পর্কে মানবজাতি কখন শুনেনি, দেখেনি। এছাড়া জান্নাতীদের জন্যে যা সৃষ্টি করা হবে বলে আগে বলা হয়েছে এই মতটিও উল্লেখ করেছেন তিনি।
  • ইবনে আব্বাস (রা) এর মতে, এটি হলো আরশের তলদেশ বা ডান পাশ থেকে উৎসারিত ঝর্ণা। আরেকটি বর্ণনায় রাসূল (সা) থেকে বলা হয়েছে যে, এটি হল একতি সফেদ ভূমি যা সূর্যের ত্রিশদিনের সফর সমান ব্যাসের। যেখানে আমন কিছু সৃষ্টিকূল আছে যারা এই পৃথিবীর মানুষদের কথা জানেনা। যারা জানেনা দুনিয়ার মানুষ আল্লাহর অবাধ্যতায় লিপ্ত। সাহাবীরা জিজ্ঞেস করলেন, এরা কি আদমসন্তান? নবীজি বললেন, আদমের সৃষ্টি সম্পর্কেও এরা জানেনা। সাহাবীরা আবার বললেন, তাঁদের ব্যাপারে ইবলিসের কি অবস্থান? নবিজী বললেন, তাঁরা এও জানেনা যে আল্লাহ ইবলিসকে সৃষ্টি করেছেন। এরপর নবীজি এই আয়াতটি তিলাওয়াত করলেন। (সনদ দূর্বল)
  • ইমাম তবারি জান্নাতবাসীর জন্যে সৃষ্টি করা জীবের মতটি উল্লেখ করেছেন।

আধুনিক মুফাসসিরদের থেকে আগের মতগুলোর পাশাপাশি আরো তিন ধরণের মত পাওয়া যায়।

১) নতুন বাহন আবিষ্কারের পিছনে মানবমস্তিষ্কে ইলহাম সৃষ্টি করা
২) অদূর ভবিষ্যতে আবিষ্কার হওয়া যানবাহন
৩) প্রকাশ্য যোগাযোগ মাধ্যমের পাশাপাশি অদৃশ্য যোগাযোগ ব্যবস্থা

  • তাফসীরুল মুয়াসসারের লেখক এই আয়াতের উক্ত অংশের তাফসির শেষে বলেন, তিনি তোমাদের জন্য এমন বাহনের সৃষ্টি করবেন যা তোমরা জানতে না, যাতে তোমাদের ঈমান ও কৃতজ্ঞতা বৃদ্ধি পায়।
  • আল্লামা সা’দী তাঁর তাফসিরে এই অংশে লিখেন, আল্লাহ কোরআনে তৎকালীন সমাজ চিনেনা এমন কিছুরই অবতারণা করেননি। এমন কিছু জানাতে তিনি কিছু উসুল বর্ণনা করেছেন যার মধ্যে আগামীর সবকিছুই অন্ততর্ভূত হয়ে যায়। যেমন জান্নাতের নেয়ামত বর্ণনার ক্ষেত্রে আল্লাহ ঐ সকল ফলমূলের উল্লেখ করেছেন যা মানুষ চিনে। যেমন, খেজুর, আঙ্গুর, ডালিম। আর যা মানুষ চিনেনা এমন কিছু বয়ান করতে বলেছেন- সেখানে সব ধরণের ফলের দুইটি করে প্রকার থাকবে।
  • একইভাবে এই আয়াতে ঘোড়া, জাহাজ ইত্যাদি অস্তিত্বশীল বাহনের কথা বলার পর ব্যাপকভাবে ভবিষ্যতের সব বাহন অন্তর্ভূক্ত করতে শেষ অংশ উল্লেখ করেছেন। যা অপ্রকাশ্য যোগাযোগ ব্যবস্থার ইঙ্গিত দেয়।
  • আল্লামা তনত্বাবী তাঁর তাফসিরে ওয়াসিতে লিখেন, আল্লাহ ভবিষ্যতে উট ঘোড়া ইত্যাদির মতোই যেসব বাহন মানবজাতিকে দিবে তা উল্লেখ করেছেন শেষ অংশে। যেমন বাষ্পীয় ইঞ্জিনের বাহন ও জাহাজ। আয়াতটি কোরআনের মুজিযাকে প্রমাণ করে। প্রমাণ করে এটি আল্লাহর পক্ষ থেকেই এসেছে। যিনি মানব মস্তিষ্ক সৃষ্টি করেছেন এবং এতে বিভিন্ন বস্তু আবিষ্কারের ইশারা প্রেরণ করেন। এমন সব আবিষ্কার যা কোরআন নাযিলকালীন সময়ে কেউ ভাবতেও পারত না।
  • সায়্যিদ কুতুব তাঁর ফি যিলালিল কোরআনে লিখেন, এসকল প্রাণীর বর্ণনা দেয়ার পর আল্লাহ শেষ অংশে এভাবে উসুল বলে দেয়া মানবজাতির সামনে কল্পনা ও ভাবনার জগতকে উন্মুক্ত করে দিয়েছেন। যাতে যোগাযোগ, বাহন ও শোভাবর্ধনের নিত্যনতুন বস্তু আবিষ্কারের প্রতি মানুষ কৌতূহলী হয়। যাতে করে কিছু মানুষ এমন বলতে না পারে যে, আমাদের পূর্বপুরুষ কেবল ঘোড়া, গাধা উট ব্যবহার করেছে বাহন হিসেবে। তাই আমরাও কোরআনে উল্লেখিত এসকল বাহন ছাড়া অন্য কিছুই ব্যবহার করবো না। সেই যুগে মানুষ যা জানতো না তাও এই আয়াতে সংশ্লিষ্ট আছে। একইভাবে এই যুগে যা এখনও আমরা জানিনা, ভবিষ্যতে তা আবিষ্কৃত হবে তাও এই আয়াতে নিহিত আছে।
  • ইবনে আশুর তাঁর তাফসিরে লিখেন, এই অংশ ভবিষ্যত নয়, বরং চলমান বর্তমান ক্রিয়া বুঝায়। অর্থাৎ তিনি প্রতিনিয়ত সৃষ্টি করতে থাকবেন। এর মধ্যে এমন সব প্রাণী অন্তর্ভূক্ত যা এক জনপদে বাহন হিসেবে প্রচলিত কিন্তু অন্য অঞ্চলের মানুষ তা এখনও জানেনা। যেমন হিন্দুস্তান ও আবিসিনিয়াবাসীদের কাছে হাতি একটি বাহন। কিন্তু আরবের কাছে তা বাহন হিসেবে পরিচিত ছিলোনা। অহী নাযিলের সময় পৃথিবীজুড়ে ছড়িয়ে থাকা নানান জনপদের কাছে নানান ধরণের বাহন ছিলো যা ভিন্ন অঞ্চলের মানুষ জানতো না। আর এগুলোই অদূর ভবিষ্যতে যারা জানতো না তারাও জানবে।

এভাবে আধুনিক তাফসির বিশারদদের কাছে ধীরে ধীরে এই মতগুলো প্রসিদ্ধ হতে থাকে। তবে তাঁরা পূর্ববর্তী মুফাসসিরদের সাগরতলের বাহনের (প্রাণী) মতটি থেকেই এই মতের চিন্তা ফিকির করেছেন। যেহেতু সাগরের প্রাণীগুলোকে বর্তমানে বাহন হিসেবে ব্যবহার শুরু হয়েছে। যা বুঝায় যে, যা আজকের দিনের মানুষের কাছে বাহন হিসেবে পরিচিত না তা হয়তো আগামীতে বাহন হয়ে উঠবে।

আধুনিক মুফাসসিরদের এইসব অভিমত কোরআন দিয়ে বিজ্ঞান প্রমাণ কিংবা বিজ্ঞান আবিষ্কারের মাধ্যমে কোরআন প্রমাণের আলোচনা নয়। বরং মানবজাতির উপর আল্লাহর অতীত-ভবিষ্যত নেয়ামতের উদাহরণ পেশ করা উদ্দেশ্য। যেমন বর্তমান সময়ের নানান জাতের ফল ফলাদি যেমন কোরআনে আমভাবে উল্লেখিত “ফল” শব্দের অন্তর্ভুক্ত হবে কারণ এগুলোও আল্লাহর নেয়ামতের অংশ। একইভাবে আমাদের আলোচিত আয়াতের তাফসিরে নব নব আবিষ্কৃত যানবাহন এই কারণে অন্তর্ভুক্ত না যে এগুলোর আবিষ্কার কোরআন থেকেই হয়েছে, বরং এগুলোও মানবজাতির উপর আল্লাহর দয়া ও মেহেরবাহির ফল হিসেবে এই আয়াতের তাফসিরে উল্লেখের দাবি রাখে।

ওয়ামা তাওফিকী ইল্লা বিল্লাহ

আরো পড়ুন- যুদ্ধই সভ্যতার বিনির্মাণ

Share this article

Leave a Reply

Your email address will not be published.