বিস্মৃত ইবাদত ‘ইগাযাহ’ ও কিছু সতর্কতা

Share this article
বিস্মৃত নেক আমল ইগাযাহ

ইসলামে ধরাবাঁধা ইবাদতের বাহিরে এমন কিছু ইবাদত আছে যেগুলোর আনলিমিটেড অপশন আছে। আর এইসব ইবাদত খুবই চিত্তকর ও আনন্দের হয়ে থাকে। অথচ এমন একটি ইবাদত আমাদের সময়ে এসে একেবারেই হারিয়ে যেতে বসেছে। ইগাযাহ হলো- কাফের ও মুশরিকদের রাগিয়ে দেয়া, ইসলামের কোনো একটি ‘শিয়ার’ বা চিহ্ন/বিধানকে প্রকাশ্যে তুলে ধরে তাদের অন্তরে আগুন ধরিয়ে দেয়া, অন্তর্জ্বালা বাড়িয়ে দেয়া। এই কাজটিকে আল্লাহ কোরআনে একটি নেক কাজ বলে অভিহিত করেছেন। সূরা তাওবার ১২০ নং আয়াতে আল্লাহ বলছেন-

মাদীনাবাসী ও তার চতুষ্পার্শ্বস্থ বেদুঈনদের জন্য উচিত নয় আল্লাহর রসূলের (সঙ্গ বাদ দিয়ে) পেছনে থেকে যাওয়া আর নিজেদের জীবনকে তাঁর জীবনের চেয়ে প্রিয় জ্ঞান করা। কেননা এমন কক্ষনো হবে না যে, তারা আল্লাহর পথে তৃষ্ণা, দৈহিক ক্লেশ ও ক্ষুধা ভোগ করবে, আর কাফিরদের ক্রোধ উদ্রেককারী কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করবে আর শত্রুদের নিকট থেকে কিছু লাভ করবে আর তার বিনিময়ে তাদের জন্য কোন নেক ‘আমাল লেখা হবে না (অবশ্যই লেখা হবে)। নিশ্চয় আল্লাহ সৎকর্মশীলদের প্রতিফল বিনষ্ট করেন না (সূরা তাওবাঃ১২০)

মুহাম্মদ (সঃ) এর অনুসারিদের একটি বিশেষ গুণ হিসেবেও আলোচিত হয়েছে যে তাঁরা সর্বাবস্থায় কাফেরদের উপর কাঠিন্য প্রদর্শন করে। সূরা ফাতহের সেই প্রসিদ্ধ আয়াতে জানানো হচ্ছে-

মুহাম্মাদ আল্লাহর রসুল। আর যে সব লোক তাঁর সঙ্গে আছে তারা কাফিরদের প্রতি অত্যন্ত কঠোর, নিজেদের পরস্পরের প্রতি দয়াশীল।তাদেরকে তুমি দেখবে রুকূ‘ ও সাজদায় অবনত অবস্থায়, তারা আল্লাহর অনুগ্রহ ও সন্তুষ্টি অনুসন্ধানে নিয়োজিত। তাদের চিহ্ন হল, তাদের মুখমন্ডলে সেজদা্র প্রভাব পরিস্ফুট হয়ে আছে। তাদের এমন দৃষ্টান্তের কথা তাওরাতে আছে, তাদের দৃষ্টান্ত ইঞ্জিলেও আছে। (তারা) যেন একটা চারাগাছ তার কচিপাতা বের করে, তারপর তা শক্ত হয়, অতঃপর তা কান্ডের উপর মজবুত হয়ে দাঁড়িয়ে যায়- যা চাষীকে আনন্দ দেয়। (এভাবে আল্লাহ মু’মিনদেরকে দুর্বল অবস্থা থেকে দৃঢ় ভিত্তির উপর দাঁড় ক’রে দেন) যাতে কাফিরদের অন্তর গোস্বায় জ্বলে যায়। তাদের মধ্য থেকে যারা ঈমান আনে আর সৎকর্ম করে, আল্লাহ তাদের জন্য ক্ষমা ও মহা পুরস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। (সূরা ফাতহঃ ২৯)

ইসলামের প্রাথমিক সময়েই মক্কায় এই আমল শুরু হয়। সাহাবীরা প্রকাশ্যে সালাত আদায় করতেন, তিলাওয়াত করতেন। এমনকি উমাইয়া ইবনে খলফের অমানুষিক নির্যাতনের শিকার হওয়াকালীন বিলাল (রা) এই কাজ করতে ভুলেননি। প্রচন্ড মার খেতে খেতে যখন তিনি “আহাদ আহাদ” বলতেন তখন মুশরিকরা আরো বেশি রেগে যেত, তখন বিলাল (রা) বলতেনঃ তোমাদের এই সামগ্রিক জোটের বিরুদ্ধে এর থেকে শক্তিশালী কথা যদি আমার জানা থাকতো, আমি তাই বলতাম।

এরপর তাঁদের একে একে সফলভাবে হিজরত করাও কাফেরদের মনে আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছিলো। এই হিজরতের কারণেও এমন এক ঘাঁটি গড়ে উঠে যেখান থেকে জুত মতোই কাফেরদের গায়ে আগুন ধরানোর কাজ আরো বেশি করে সম্পাদন করা যায়। আল্লাহ বলছেন-

আর যে আল্লাহর রাস্তায় হিজরত করবে, সে যমীনে এমন বহু ঘাঁটি ও সচ্ছলতা পাবে (যেখান থেকে কাফেরদের লাঞ্ছিত করা যায়) সূরা নিসাঃ১০০

ইবনুল কয়্যিম বলেনঃ এই আয়াতে যে ঘাঁটির কথা বলা হচ্ছে তাঁর শব্দ চয়ন থেকে বুঝা যায় এটি কাফেরদের লাঞ্ছিত করার কাজে ব্যবহিত হবে এমন। একইভাবে সালাতে শয়তানের ওয়াসওয়াসার কারণে যদি সালাতে ভুল হয়ে গেলে সুহু সিজদার নিয়ম প্রবর্তন করা হয়েছে। হাদিসে বলে হয়েছে এই সুহু সিজদার কারণে শয়তান চরমভাবে লাঞ্ছিত হয়।

এরপর কত কিছু হয়ে গেলো। কিন্তু আল্লাহর রাসূলের পরিকল্পনায় কি ছিলো তা কে জানতো! বদরের যুদ্ধে মুশরিকদের নেতা আবু জাহেলের সুপরিচিত একটি উট বাজেয়াপ্ত হয়। সেই উটটি রাসূলুল্লাহ (স) রেখে দিয়েছিলেন। হুদায়বিয়ার দিন যখন মুসলিমদেরকে উমরাহ পালন করতে দেয়া হলো না।

তিনি আবু জাহেলের সেই উটটি প্রকাশ্যে জবাই করে দিলেন। উটটির নাকে রূপার নোলক ছিলো, আবু জেহেল ও কুরাইশের কাছে খুবই সম্মানিত একটি উট ছিলো এটি। মুশরিকদের সামনেই তাঁদের প্রিয় নেতার প্রিয় উটটি জবাই হতে দেখে তাদের অন্তরপ্রাণ ভস্মীভূত হয়ে গিয়েছিলো। ইবনে আব্বাস (রা) বলেনঃ রাসূলুল্লাহ (স) মুশরিকদেরকে রাগান্বিত করতে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।

পরবর্তী বছর যখন তিনি উমরা করেন, তাওয়াফের সময় শক্তি প্রদর্শন করেছেন। হালকা দৌড়ের মাধ্যমে তাওয়াফ শুরু করেন, ডান কাঁধ উন্মোচিত করে বাহু প্রদর্শনের রীতি প্রচলন করেন। যা দেখে মুশরিকদের মাথা হেট করে রাখা ছাড়া কোনো উপায় ছিলো না। ইবনে আব্বাস (রা) বলেন- মুশরিকদেরকে শক্তি প্রদর্শনের উদ্দেশ্যে রাসূলুল্লাহ (সা) তাওয়াফে উর্ধগতিতে সাঈ করেছেন। তিনি বলেছেন- এই দল যেন তোমাদের মধ্যে কোন দুর্বলতা অনুভব করতে না পারে।

সাহাবী আবু দুজানার (রা) যুদ্ধক্ষেত্রে প্রবেশের পদ্ধতিও ছিলো আরো রোমাঞ্চকর। তিনি এমনভাবে হেঁটে কাফেরদের সামনে দাঁড়াতেন, দেখে কাফেরদের পিত্তি জ্বলে যেত। রাসূলুল্লাহ (স) বলেন- আল্লাহ অহংকার ও গর্ব পছন্দ করেন না, কেবলমাত্র তিনি যে অহংকারটি পছন্দ করেন তা হলো যুদ্ধের সম্মুখসারিতে দাঁড়িয়ে কাফেরদের সামনে অহংকার প্রদর্শন করা। এছাড়া কবি সাহাবী হাসসান বিন সাবিতের (রা) একেকটি জ্বালাময়ী কবিতার পঙক্তি মুশরিকদের জন্য ছিলো আগুনের গোলার সমান। রাসূলুল্লাহ (স) তাঁকে নির্দেশ দিয়েছিলেন- তুমি কুরাইশকে তির্যক কাব্য দিয়ে আঘাত কর যা বর্শার আঘাতের চেয়েও জোরালো হবে।

দুনিয়ার বাস্তবতাকে মেনে নিতে হলে এই প্রতিদ্বন্দ্বিতা মেনে নিতেই হবে। কাফের-মুশরিকরা যে ইসলাম ও মুসলিমকে কটাক্ষ বা রাগানোর চেষ্টা করেনা তা তো না। ওরাও করে, করেছে, করবে। হুদাইবিয়ার সন্ধিকালীন সময়ে এক কাফের কথা বলার ছলে বারবার রাসূলুল্লাহ’র (স) দাড়িতে হাত দেয়ার চেষ্টা করছিলো। সাহাবী মুগীরা (রা) তরবারির বাট দিয়ে তার সেই হাতে আঘাত করে করে সতর্ক করছিলেন। ঐ মুশরিক সাহাবীদেরকে চোখ টিপ্পনী দিচ্ছিলো। মক্কায় তারা মুসলিমদের সালাতে ব্যাঘাত করতো তাঁদেরকে রাগিয়ে দেয়ার জন্য। নানানরকম কটূক্তি করতো। এরপর মুসলিমরাও পালটা পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। ইবনে মাসউদ (রা) তাঁদের কানের কাছে গিয়ে সূরা রহমান তিলাওয়াত করতেন।

এভাবে আসলে পাল্টাপাল্টি রাগানোর প্রক্রিয়াটি চিরায়িত বিপ্লবের শাশ্বত স্নায়ুযুদ্ধ। আমাদের বিরোধী পক্ষ এটি না ভুললেও আমরা ভুলে গেছি। আমরা এখন সহনশীলতা, উদারতা, মানবিকতা, সহাবস্থান ইত্যাদি মন ভোলানো নাম দিয়ে নিজেদেরকে বেঁধে ফেলেছি নিরীহ দেহবৃত্তে। নিজেদের সাহসকে খাঁচায় বন্দি করেছি। সবকিছু যেমন পরিচর্যায় বেড়ে উঠে, সাহসেরও পরিচর্যা দরকার। অনুশীলনের মাধ্যমে যেমন দক্ষতা আসে, চর্চা না থাকলে যেমন মেধা ক্ষয়ে যায়, একইভাবে সাহসও প্রশিক্ষণের অভাবে পরিণত হয় কাপুরুষতায়।

মুসলিম অধ্যুষিত এলাকায় এর চর্চা রাখা জরুরি। তাই রাসূলুল্লাহ (স) বলেছেন- যখন পথে তোমাদের সামনে কোনো কাফের মুশরিক পড়বে, তার সামনে পথকে এমনভাবে সংকীর্ণ করে তোল যেন স্বাভাবিকভাবে হেঁটে পথ অতিক্রম করতে না পারে। ওমা? এ কেমন কথা?! এটা নবীজি (স) কেন বলেছেন তার উত্তর আছে সূরা আলে ইমরানের ১১৯ নং আয়াতেঃ

সাবধান হও – তোমরাই তাদেরকে ভালবাস, অথচ তারা তোমাদেরকে ভালবাসেনা; এবং তোমরা সমস্ত গ্রন্থই বিশ্বাস কর; আর তারা যখন তোমাদের সাথে মিলিত হয় তখন বলেঃ আমরা বিশ্বাস স্থাপন করেছি এবং যখন তোমাদের হতে পৃথক হয়ে যায় তখন তোমাদের প্রতি আক্রোশে আঙ্গুলের অগ্রভাগসমূহ কামড়ে ধরে। তুমি বলঃ তোমরা নিজেদের আক্রোশে মরে যাও! নিশ্চয়ই আল্লাহ অন্তরের কথা জ্ঞাত আছেন।

কিন্তু… এখানে একটি বিষয় মাথায় রাখা অতীব জরুরি। সর্বত্র কিংবা সর্বাবস্থায় কি এই কাজ করা সমীচীন হবে? হিজরতের পর যখন মদিনায় ইসলামী রাষ্ট্র গড়ে উঠলো, তখনও কিন্তু মক্কায় অল্প কিছু মুসলিম পরিবার রয়ে গিয়েছিলো। যারা বিভিন্ন কারণে হিজরত করতে পারেনি। কিন্তু মদীনা থেকে কখনও এমন কোন পদক্ষেপ নেয়া হয়নি যার কারণে মক্কার এসব মুসলিম পরিবার নির্যাতনের শিকার হয়।

বরং মদীনা রাষ্ট্র এসব মক্কী পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করত। মূলত এ কারণেই আবু সুফিয়ানের সেই অস্ত্র চালানে বাঁধা দিতে গিয়ে বদরের যুদ্ধ সংঘটিত হয়। ‘তারিখে মক্কা’ গ্রন্থে ড. হাশেম ইয়াহয়া লিখেন, রাসূলুল্লাহ (স) সেসকল মক্কী মুসলিমদের নিত্য খোঁজ রাখতেন, সাহায্য সহযোগীতা পাঠাতেন, তাঁদেরকে উজ্জীবিত রাখতেন, কাফেরদের বিরুদ্ধে তাঁদেরকে বিভিন্ন কলাকৌশলে ব্যবহার করেতেন।

অল্প কয় বছরের মধ্যেই ঐ মুসলিমরা যথেষ্ট শক্তিশালী ও সক্রিয় হয়ে উঠে। হুদাইবিয়ার সন্ধিকালীন সময়ে আমরা দেখি, কাফেরদের রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে অনেকেই মদীনায় হিজরত করে ফেলে। সুতরাং আমরা দেখি যে কাফেরদেরকে রাগানোর বিষয়েও কিছু শর্ত আছে।

১) সন্ধিকালীন সময়ে বা সন্ধিকৃত কাফের মুশরিকদেরকে ইগাযাহ করা যাবেনা যা সন্ধি ভঙ্গের দিকে নিয়ে যায়।

২) এমনভাবে ইগাযাহ করা যাবেনা যার ফলে কাফেরের দেশে বসবাসরত সংখ্যালঘু মুসলিমরা বিপদের সম্মুখীন হতে পারে।

৩) তাদের দেবদেবীকে অপমান বা গালি দিয়ে রাগানো যাবেনা।

তাই এখন যে “আল্লাহু আকবার” ধ্বনি আমরা দেখলাম, এটি কাফেরদের মনে যেমন আগুন জ্বালাচ্ছে। একইভাবে বিষয়টিকে দ্বীনের একমাত্র বিপ্লব বানিয়ে ভাইরাল করার কারণে, বিশেষত ঐ নারীর বিস্তারিত তথ্য ফলাও করে প্রচার করার কারনে আমরা যে অজ্ঞাতসারেই তাঁর পরিবারকে বিপদের মুখে ঠেলে দিচ্ছে তা কিন্তু হুশ রাখা দরকার। ইসলামের ইগাযাহ আমলের মধ্যেও সৌন্দর্য্য থাকবে, নিয়মতান্ত্রিকতা থাকবে, সৌজন্যতা থাকবে, নিজেদের অন্য ভাই-বোনরা যাতে বিপদে না পড়ে সে সচেতনতা থাকবে। আল্লাহ আমাদেরকে বুঝার তাওফীক দান করুন। আমীন।

লেখা- সাঈদুল মোস্তফা

আরো পড়ুনঃ বিশ্বাসের সংঘাত

Share this article

Leave a Reply

AllEscort