মনস্তাত্বিক চিকিৎসা ঘরে বাইরে

Share this article
মনস্তাত্বিক চিকিৎসা ঘরে বাইরে- শিশুরা আসবাবপত্র অগোছালো করে, এলোমেলো করে দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্যে।

পরিবারের নজর কাড়তে তারা নানান কসরত করে, তারা চায় সবাই তাদের দিকে মনযোগ দিক, তাদের সাথে কথা বলুক, হোক তা রাগী স্বরে। অবহেলার চাকায় পিষ্ট হলে আমিত্ব অর্তনাদ করে উঠে।

অধিকাংশ পরিবারে এই চিত্রটি আজ মৌলিক প্রয়োজনের মতো প্রকট হয়ে উঠেছে, কিন্তু দেখার কিংবা শোনার কেউ নেই।

নতুন ঘরে উঠেছেন এমন পরিবারের বাবা একদিন ঘরে ফিরে দেখেন তার দুরন্ত শিশুটি নতুন ফার্নিচার নষ্ট করেছে, ভেঙ্গে ফেলেছে কাঁচের টব। রাগে হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে তিনি সন্তানকে শাস্তি স্বরূপ বেঁধে রাখেন! এ দেখে মা চুপিচুপি চোখের পানি ফেললেও কিছু বলতে পারেন না!

অসহায় শিশুটির কান্না থামতে অনেকটা সময় লাগে, বেশ কয়েক ঘন্টা পর তার বাঁধন খুলতে গিয়ে মা দেখেন দড়ির জায়গায় কালশিটে পড়ে গেছে!

পরে ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেলে পরীক্ষা করে জানা যায় রক্তে বিষক্রিয়া হয়েছে, হাত কেটে ফেলা ছাড়া উপায় নেই!

কয়েকদিন পর হাসপাতাল থেকে তারা সকলে এক বুক চাপা কষ্ট নিয়ে ফিরে আসে। শিশুটি বাবাকে বলেঃ

  • বাবা, আমার হাতটা ফিরিয়ে দাও প্লিজ, আমি আর কখনো ফার্নিচার নষ্ট করবো না!

কারাগার মানবস্বত্বার পরিচয় ঘুচিয়ে তাকে কেবল একটি সংখ্যায় পরিণত করে। জেলখানা মানুষের ব্যক্তিগত অধিকার ও মানবাধিকার কেড়ে নেয়, শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের স্টীম রোলার দিয়ে লাঞ্ছনা ও মর্যাদাহানি করে। সেখানে প্রায়ই তাকে শুনতে হয় সে একটা কীট কিংবা পশু অথবা মূল্যহীন জন্তু। আকারে ইঙ্গিতে তাকে বুঝিয়ে দেয়া হয় তার প্রতি কারো কোনো ভ্রূক্ষেপ নেই, তার অস্তিত্ব নিয়ে কারো কোনো মাথাব্যাথাও নেই।

কয়েদীদের জবানিতে শোনা গেছে, স্ত্রী খুব শীঘ্রই তালাক চাইতে শুরু করে। সন্তানরা বন্ধুদের সামনে এমন পিতার সাথে রক্তের বন্ধন থাকায় পরিচয় দিতে লজ্জাবোধ করে। কেউ জিজ্ঞেস করলে নামের প্রথম অংশ কিংবা পারিবারিক নামটা বলেই পার পেতে চায়!

রানী হোক বা ফকির হোক, প্রত্যকে কারাবন্দির জবানিতে এই যন্ত্রণার কিছু না কিছু উঠে আসে, বেশ কিছু আরব কারারক্ষী তো মানবাধিকার ও মানবিক মর্যাদা ছিনিয়ে নেয়ার দৌড়ে রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে।

দার্শনিক “ভিক্টর ফ্রাংকেল” নাৎসি বন্দীশিবিরে কাটানো তার বীভৎস অভিজ্ঞতার আলোকে মানুষের স্বত্বাগত মর্যাদা রক্ষার একটি পরিকল্পনা ব্যক্ত করেছিলেন, যা তিনি তার “মনস্তাত্বিক চিকিৎসা” বা মানুষের মানবিকতার খোঁজ নামের দর্শনের মাধ্যমে তুলে ধরেছেন।

সমস্ত কিছু হারানো স্বত্বেও, সকল মানবিক মূল্য হারিয়েও, দাঁতে দাঁত চেপে ক্ষুধা ও যন্ত্রণা সহ্য করেও, প্রতিটি মুহূর্তে মৃত্যুর হাতছানি স্বত্বেও একজন মানুষ কায়মনোবাক্যে বিশ্বাস করে তার বাঁচার অধিকার আছে। তিনি লিখেন, “এটি মৃত্যুর শিবির থেকে অস্তিত্বের পথে ছুটে আসা”। এরপর লিখেন “মানবিকতা পাওয়ার তীব্র পিপাসা”, এরপর “অনুভূতির প্রবল রাজত্ব”।

এগুলো হলো যন্ত্রণাকে মোকাবেলা করার একমাত্র সাহস ও আত্মবিশ্বাসের উপকরণ।

তুমি যদি জিজ্ঞেস করো কিসের জন্য এই জীবন অতিবাহিত করছো? অসংখ্য মানুষ বলবেঃ সন্তানদের জন্য, যাদেরকে লালন পালন করে বড় করে তোলা আমাদের কর্তব্য। বন্ধুদের জন্য, যাদের সাথে আমাদের জীবন জড়িত। ঐ কর্মের জন্য যা শেষ করা আমাদের জন্য অত্যাবশ্যক। ঐ রাজনৈতিক কর্মসূচির জন্য যার বাস্তবায়ন হওয়া দেখতে চাই। এসব কিছুর অর্থ হলো যেকোনো ব্যক্তি বা যেকোনো কাজ আমাদের অস্তিত্বের জন্য মুখিয়ে থাকে, আর ঠিক এখানেই মনস্তাত্বিক চিকিৎসার বাস্তবতা ফুটে উঠে।

জীবন সবসময় লক্ষ্যের সাথে সংযুক্ত থাকবে, শুধুমাত্র বন্দিত্ব কিংবা মানবাধিকার হরণযজ্ঞের মোকাবেলার সাথে এটি নির্ধারিত না।

অন্তত ছোট-খাট লক্ষ্যও যদি না থাকে তাহলে সে জীবন এক দুঃসহ কারাগার।

রাজনৈতিক কর্তৃত্ব কিংবা সামাজিক খবরদারি ব্যক্তিগত পরিসরে ঢুকে নাক গলালে ব্যক্তির স্বপ্ন, উপলব্ধি ও ভালোবাসার অপমৃত্যু ঘটে। সমাজ পরিণত হয় অন্তঃসারশূন্য রুচিহীন কিছু জড়দেহের উৎপাদনকেন্দ্রে।

যতবার দৈহিক প্রতিকূলতার সাথে আত্ম-স্বত্বার সংঘাত বৃদ্ধি পায়, কর্মপরিধির সংকীর্ণতার সাথে নিজ-স্বত্বার সংগ্রাম বাড়তে থাকে, অনুভবের বঞ্চনার সাথে অন্তরাত্মার কলহ বেড়ে চলে, ততবার তোমার বিশ্বাসের সেই লক্ষ্য অর্জনের পথে ভুল-ভ্রান্তি থেকে উত্তরণের সামর্থ্য তৈরি হবে। সেসব পরিস্থিতিতে ভাষ্য হবে এমনঃ

“আমি আমার অস্তিত্বকে প্রমাণ করতে দৃঢ়-প্রত্যয়ী”।

“আমি মূল্যহীন নই”।

অনেক সময় নিষ্পেষিত ‘আমিত্ব’ এর ত্রুটিগুলি অন্যের ঘাড়ে চাপিয়ে দেয়। সে যেন একেবারে গায়েব হয়ে যেতে চায়। যখন সে ইতিবাচক সাড়া না পাবে তখন অবশ্যই নেতিবাচক সাড়া অন্বেষণ করবে।

আর এই পর্যায়ে ‘আমিত্ব’ জিনিসটা কর্তৃত্ববাদী সীমালঙ্ঘনের ক্ষমতা, কর্তৃত্ববাদী সমাজরীতি, পারিবারিক অতি খবরদারি নজরদারের চর্চা ও আপন সহজাত চাহিদা এবং স্বভাবজাত লক্ষ্যের মাঝে পড়ে পিষ্ট হতে থাকে।

ছোট্ট একটি শিশুকে শুধুমাত্র তার মা-বাবকে খুশি করার জন্যে আদর-মায়া দিও না, বরং তাকে প্রকৃত সম্মান-কদর দেখাও তার পরিবারের কারণে। তার ভবিষ্যতের জন্য। এই ছোট্ট আচরণটি অচিরেই শিশুটির সাথে সাথে বড় হবে। শিশুটিও একদিন বড় নেতা হবে, আলেম হবে, আবিষ্কারক হবে, মন্ত্রী হবে, অথবা শিল্পপতি হবে। কন্যা শিশু হলে সেও একদিন এই আচরণের সাথে হাজারো অবিবাহিত পুরুষের স্বপ্নের কেন্দ্রে পরিণত হবে। একটি সংসারের রানী হবে। সংসারজগতের মালকিনী হবে। তুখোড় সন্তানাদি ও নাতি-নাতনীর মা হবে।

মুসলিম বিশ্বের তরুণ ও যুবকরা, অধিকাংশই যারা অনুশোচনায় দগ্ধ হয়, স্বাধীন হবার অদম্য বাসনায় কাতর থাকে, তাদের উচিত মুক্ত হওয়ার আগে প্রথমে পিতা, শিক্ষক, দায়িত্বশীল ও প্রশিক্ষকদের সম্মান অর্জন করা।

যে পরিচ্ছন্নতাকর্মী রাস্তা পরিষ্কার করে, কিংবা যে শ্রমিক গাড়ি সাফ করে সেও মানুষ।

وَلَقَدْ كَرَّمْنَا بَنِي آدَمَ

অর্থঃ আমি আদমসন্তানকে সম্মানিত করেছি। (ইসরাঃ ৭০)

তারা প্রত্যেকেই তোমার একান্ত মনে করা সম্পদ ‘মানবতা’র ভাগিদার। হয়তো তাদের নিষ্পাপ অন্তর, ধৈর্য্য ও ঈমানের দরুন মানবতার প্রশ্নে তারা তোমার চেয়ে বেশি এর হকদার। কত গাড়িচালক ও বাড়ির চাকর আছে রাতে উঠে নামাজে দাঁড়িয়ে যায়, আর ওদিকে মনিব ফজরেও নাক ডেকে ঘুমায়। “আমাকে তোমাদের দুর্বলদের মাধ্যমে অন্বেষণ করো, তোমাদের মধ্যে থাকা দুর্বলদের দ্বারা তোমরা রিযিক ও সাহায্যপ্রাপ্ত হয়ে থাকো”। [১]

 “এ বাঙালি, ও হিন্দি, এ এইটা, ও ঐটা” এমন বৈষম্য সত্যি পরিত্যাজ্য!

[১] আবু দাঊদ, তিরমিযি, আহমদ।

এগুলো অহংকার ও দাম্ভিকতার ভাষা, “এ হলো সত্যকে অস্বীকার করা ও মানুষকে তুচ্ছজ্ঞান করার নামান্তর”।

গ্রাহক, যে কি না এসেছে সরকারি কার্যালয়ে কোনো কাজে। অথবা ক্রেতা, অথবা পর্যটক যিনি বিমানবন্দরে এসেছেন, অথবা লাইনে অপেক্ষমান কোনো গ্রহীতা… প্রত্যেকেই সম্মান পাওয়ার অধিকার রাখেন; যে কারণে এসেছেন তা পেলেও, না পেলেও উভয় অবস্থাতেই তারা সম্মানের পাত্র। সম্মান পেলে তাদের অন্তরে সন্তুষ্টি ও প্রশান্তি বিরাজ করবে, মুখে ফুটন্ত হাসি নিয়ে খুশিমনে তারা বাড়ি ফিরবেন।

নিজেকে সম্মান দাও, এটা নিজ কর্মফলেরই হাতছানি। সহীহ হাদিসে আব্দুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল আস থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেনঃ “কবিরা গুনাহের মধ্যে একটি হলো কেউ তার মা বাবাকে গালি দেয়া”। সাহাবীরা জিজ্ঞেস করলেন- কেউ কি নিজের আপন মা বাবাকে গালি দিতে পারে? তিনি বললেনঃ “হ্যাঁ, কেউ অন্যের বাবাকে গালি দেয়, ফলে তার বাবাও গালি শোনে, কেউ অন্যের মাকে গালি দেয়, ফলে তার কারণে তারই মা গালি শোনে”। [১]

নবুয়তী পরিভাষায়, অন্যের মা বাবাকে গালি দেয়া নিজের মা বাবাকে গালি দেয়ার শামিল। তুমি অন্যের বাবা মাকে গালি দিচ্ছো, পক্ষান্তরে তুমি যেন নিজের মা বাবাকেই গালি দিচ্ছো।

সেও তোমার মতো একই কাজ করছে।

কোরআনে এসেছেঃ

وَلاَ تَسُبُّواْ الَّذِينَ يَدْعُونَ مِن دُونِ اللّهِ فَيَسُبُّواْ اللّهَ عَدْوًا بِغَيْرِ عِلْمٍ

অর্থঃ আল্লাহকে ছেড়ে যাদেরকে তারা ডাকে তাদেরকে তোমরা গালি দিও না। কেননা তারা সীমলংঘন করে অজ্ঞানতাবশতঃ আল্লাহকেও গালি দেবে। (আনআমঃ ১০৮)

[১] সহিহুল বুখারি ও মুসলিম।

সবচেয়ে বড় সম্মান হলো খোদা প্রদত্ত ঈমানের সম্মান। তাওহীদ, নবুয়ত, আল্লাহর বাণী ও শরিয়তের প্রশ্নে কোনো আপস নয়, হোক তা অপবিজ্ঞানের যাতাকলে কিংবা সীমালঙ্ঘনের নিষ্পেষণে।

“নিজেকে সম্মান দাও”।

ঠিক এ কথাটাই যখন অন্য কেউ তোমাকে জ্ঞান দেয়ার জন্য বলবে, তখন এত সত্য সুন্দর বাক্যটি পরিণত হবে একটি প্রচ্ছন্ন হুমকিতে যা শুনে তোমার বুকের অস্থিরতা বেড়ে যাবে।

আপন স্বত্বাকে সম্মান দেয়ার অর্থ হল নিজের মধ্যে থাকা মানুষটাকেই সম্মান করা।

আবু হুরাইরা (রা) থেকে বর্ণিত হয়েছে, নবী করিম (সা) বলেছেনঃ “যদি তোমাদের কেউ আরেক ভাইয়ের সাথে বিবাদে জড়িয়েই পড়ো তাহলে যেন সে চেহারায় আঘাত করা থেকে বেঁচে থাকে, কারণ আল্লাহ্ আদমকে তার চেহারাতেই সৃষ্টি করেছেন”।

নববী ভাষ্যের নির্দেশনা থেকে বুঝা যায় মানুষের মুখমন্ডল হলো সম্মান ও মর্যাদার পটভূমি, ইন্দ্রিয়’র মিলনস্থল; শ্রবণ, দৃষ্টি, ঘ্রাণ ও স্বাদ। মুখাবয়বের নানান চিহ্ন ও ছাপ স্বত্বাগত বৈশিষ্ট প্রকাশ করে, যেমনঃ খুশি, সম্মানিত বোধ, উদারতা। অথবা এর বিপরীতও প্রকাশ করে থাকে। বিভিন্ন মনোভাবও প্রকাশ করে যেমন রাগ, সন্তুষ্টি, উৎফুল্লতা, মনঃকষ্ট। একজন দক্ষ চিত্রকর তার তুলিতে চেহারায় এসব ভাব ফুটিয়ে তুলতে পারেন যা একজন সাহিত্যিক বা কবিও তাদের লেখায় ফুটিয়ে তুলতে অক্ষম…

তাহলে এই হলো মানবতার সম্মান, যে প্রতিষ্ঠানটির তুমিও একজন সদস্য, তোমার অন্য ভাইটিও একইরকম সদস্য, তার সম্মান বিনষ্ট করা দিন শেষে তোমার নিজের সম্মান বিনষ্টেরই সমার্থক।

শরণার্থী, নাগরিক, আগন্তুক সবাই, সকলেই চিরুনির দাঁতের মত সমান।

যারা মানব হত্যায় জড়িত, যারা আপন জাতিকেই হত্যা করে তারা মানবতা খুইয়ে ফেলেছে, নিজেদের সম্মানকেই হারিয়ে ফেলেছে, মানবিকতার সকল মর্যাদা ও ইজ্জত ক্ষুন্ন করেছে। মুশরিকদের পরে তারা আল্লাহর নিকট সবচেয়ে বড় অপরাধী।

মানুষ তার এক ভাইকে হত্যা করবে এখানে সম্মানের কিছু নেই, এ কারণেই খুনীর উপর নিহতের শ্রেষ্ঠত্ব চির ভাস্বর-

إِنِّي أُرِيدُ أَن تَبُوءَ بِإِثْمِي وَإِثْمِكَ

অর্থঃ নিশ্চয় আমি চাই যে, তুমি আমার ও তোমার পাপ নিয়ে ফিরে যাও। (মায়েদাঃ ২৯)

জীবন হলো ত্যাগ ও প্রাধান্য দেয়ার নাম। দেখো আল্লাহ্‌ ‘কিসাস’ নেয়াকে ‘জীবন’ বলে আখ্যায়িত করেছেন। কারণ কিসাস হত্যাযজ্ঞের সংস্কৃতি নির্মূল করে। নিষ্পাপ প্রাণগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করে।

সন্তান প্রস্রব করতে গিয়ে মৃত্যুবরণ করা মা শহীদ; কারণ তিনি “সমাজ” জন্ম দিতে গিয়ে মারা গেছেন, তার দানশীল সন্তানসমৃদ্ধ গর্ভ থেকে আবির্ভূত হয়েছে এক নতুন জীবনের প্রাণ। আর অন্যদিকে শহীদগণ আল্লাহর মেহমানদারিতে চিরঞ্জীব, রিযিকপ্রাপ্ত।

ইতিহাসের পরতে পরতে মর্যাদার নির্মাতাগণ এই বিষয়টিই আত্মস্থ করেছেন।

একজন মর্যাদাসম্পন্ন বিজয়ী শত্রু নিধন নিয়ে উল্লসিত হয় না, বরং নিজের পক্ষের আত্মত্যাগ ও উৎসর্গ নিয়ে গর্বিত হয়, পার করে আসা চ্যালেঞ্জগুলোর জন্য গৌরব অনুভব করে।

এই যে স্বৈরাচার-প্রতাপশালী শত্রুর পায়ের তলে দুমড়ে মুচড়ে থাকা পরাজিত সৈন্য, যার গলার কাছে ঐ স্বৈরাচার অস্ত্র ধরে রেখেছে, যার হাতে পরাজিত সৈন্যের ভাগ্য ঝুলছে। এমতাবস্থায়ও সৈন্যটির মুখ ফুটে বেরিয়ে আসেঃ

“যতক্ষণ তোমার হাতে ক্ষমতা আছে ততক্ষণ চালিয়ে যাও। না তুমি পারবে আমার স্বাধীনতা, সম্মান ও মর্যাদা লুটে নিতে, আর না তোমার সাহস আছে আমাকে সেসব ফিরিয়ে দেয়ার!”

এ উক্তির ভিতর দিয়ে সৈন্যটি ঐ দুশমনকে সম্মান ও মর্যাদার কথা বলে মূলত স্মরণ করিয়ে দিতে চাইছে যে, সম্মান ও মর্যাদা দিয়েই একজন মানুষের পরিচয় নির্ধারিত হয়, কেবল ধ্বংস ও আগ্রাসনের হাতিয়ার বহন করা মনুষ্যত্বের পরিচয় নয়।

নতুন করে সৈন্য গড়ে তুলো যারা উপলব্ধি করবে তাদের অভিযান কেবল ধ্বংস করা নয়, বরং জীবন নির্মাণ ও প্রসার তার মৌলিক মিশন। এটাই শরিয়ত ও উঁচু মূল্যবোধের অঙ্কিত পথনির্দেশিকার বাস্তব রূপায়ন।

ধ্বংস, ভয় ও শঙ্কিত সৈনিক কখনোই একজন রক্ষক হতে পারে না। সভ্যতার প্রবাহ ধারাবাহিক রাখার যোগ্যতা তার মধ্যে নেই। দৃঢ়চেতা প্রাণসচ্ছল সৈনিক সে-ই যে কখনো রুঢ়তা দিয়ে যুদ্ধ করেনা। বরং ভালোবাসা, সম্মান প্রদান ও সুন্দরের পরিচর্যা দিয়ে যুদ্ধ করে।

তোমার মতো আর সকলকে সম্মান করো!

একটি শিশুসুলভ কৌতুক আছে, এক মনিবের একশো চাকর ছিলো, এর মধ্যে একজন হঠাৎ হাঁচি দিয়ে উঠলো। মনিব জিজ্ঞেস করলোঃ কে হাঁচি দিয়েছে? কেউ উত্তর দিলো না। এরপর মনিব একশো চাকরকে দুই ভাগে ভাগ করলো। প্রথম ভাগকে হাঁচিদাতা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলো। যখন কেউই স্বীকার করলো না তখন সে ঐ ভাগের সবাইকে হত্যা করলো। এরপর দ্বিতীয় ভাগকেও আবারো দুই অংশে বিভক্ত করলো। এভাবে হত্যা করতে করতে একজন বাকি রইলো। তাকে মনিব জিজ্ঞেস করলোঃ কে হাঁচি দিয়েছিলো? সে বললোঃ আমি!

মনিব উত্তর দিলোঃ ইয়ারহামুকাল্লাহ! (আল্লাহ্‌ তোমাকে রহম করুন)।

ইংরেজী প্রবাদ “এপ্রিল শাওয়ার, মে ফ্লাওয়ার” (বৃষ্টির মৌসুমের পর আসে ফুলের মৌসুম) কথাটি উপকরণ, কার্যকরণ ও ফলাফলের যে উদাহরণ তুলে ধরে তা মূলত খোদায়ী রীতির প্রতিফলন। যেখানে মর্যাদা, দয়া, আন্তসম্পর্ক ও সদাচরণ একটি মাত্র চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়। আর তা হলো অন্যকে “সম্মান দেয়া”।

নিজের জ্ঞানকে সম্মান দেয়ার পদ্ধতি হলো একে প্রতারণা, ভ্রান্তি ও মিথ্যা প্রচারণা থেকে মুক্ত রাখা। যা অনেকেই “মিথ্যা বলতে থাকো, মিথ্যা বলতে থাকো… এক পর্যায়ে মানুষ তোমাকে সত্য বলে ভেবে নিবে” এই সূত্রের ব্যবহার করে অর্জন করতে চায়।

কর্ম ও আত্মসংযমের সম্মান… ঐ চাকরির পেছনে ছোটা অনুচিত যা তোমাকে প্রশ্ন করবে- “তুমি কাকে কাকে চিনো?”। বরং ঐ চাকরিই তোমার করা উচিত যেখানে প্রশ্ন থাকবে- “তুমি কি কি জানো?”।

একাডেমিক অর্জন, অভিজ্ঞতা, কারিগরি অভিজ্ঞান হলো সম্মান-মর্যাদার প্রকৃত মাপকাঠি।

সময়ের মর্যাদা হলো, এর গুরুত্ব উপলব্ধি করা। সময় হলো জীবন। সুতরাং অর্থবোধক কিছুর জন্যেই যেন এর খরচ নির্ণিত হয়, হোক তা কিছু বিনোদন কিংবা পণ্যের জন্য ব্যয় হচ্ছে, অথবা মানবিক কোনো কাজের পিছনে। আর এর মধ্যে সবচেয়ে চমৎকার হলো “তোমার জিহ্বা আল্লাহর যিকিরে সিক্ত থাকা”, যেকোনো ধরণের উপকারী ও ফলপ্রসূ কাজে তুমি নিজেকে শতভাগ ঢেলে দিবে।

অন্যের সময়কে সম্মান দেয়া, কেউ তোমাকে দশটায় আসার কথা দিলো। তুমি এগারোটা পর্যন্ত তার জন্য অপেক্ষা করলে, যদি সে বারোটার মধ্যেও না আসে, তোমার তো একটা পর্যন্ত দেখা উচিত যাতে উভয়ের সময় কাজে লাগে।

প্রশাসনিক দুর্গতি সাধারণ মানুষের সময় অপচয় করে, অথচ সাধারণ জনগণই তাদেরকে জনসেবার জন্যে এই পদে চাকুরী দিয়েছে।

সামাজিক মর্যাদা প্রদানঃ পারস্পরিক সম্পর্ক, বিভিন্ন উপলক্ষ্যে সমবেত হওয়া, কুশল বিনিময়, শোকে সান্ত্বনা প্রদান, স্বেচ্ছাসেবায় নিয়োজিত হওয়া, “নম্রতার আদান প্রদান, কষ্টদায়ক বিষয়ের নির্মূল”। অন্যের ব্যক্তিগত বিষয়কে সম্মান দেয়া, মানুষের গোপনীয়তা ফাঁস না করা, যেসব পরিস্থিতি প্রকাশ করা হারাম তা থেকে বেঁচে থাকা। ব্যক্তিগত মেসেজ, ইমেইল, চ্যাট ইত্যাদি ফাঁস বা প্রচার না করা। রাসূলের (সা) হুঁশিয়ারি বার্তা অনুযায়ী হ্যাকারদের জন্য অভিশাপ। যারা সরকারি মদদে কিংবা জাতীয় স্বার্থেই হোক এসব হ্যাকিং করে তাদের জন্য চোখ নষ্ট করে দেয়ার নির্দেশনা আছে। তারপরেও তারা বুঝেনা, ফিরে আসেনা। “আমি যদি টের পেতাম যে তুমি উঁকি ঝুঁকি মারছো তাহলে আমি তোমার চোখ গেলে দিতাম, আল্লাহ্ চোখের হেফাযতের জন্যেই অনুমতি চাওয়ার ব্যবস্থা রেখেছেন”।

আরো পড়ুন নবজাতকের পরিচর্যা নিয়ে- https://mostafaofficial.com/%e0%a6%a8%e0%a6%ac%e0%a6%9c%e0%a6%be%e0%a6%a4%e0%a6%95-%e0%a6%aa%e0%a6%b0%e0%a6%bf%e0%a6%9a%e0%a6%b0%e0%a7%8d%e0%a6%af%e0%a6%be%e0%a6%b0-%e0%a6%af%e0%a7%87-%e0%a6%9f%e0%a6%bf%e0%a6%aa%e0%a6%b8/

বইঃ খোলো হৃদয়ের দুয়ার
লেখকঃ ড. সালমান আল-আওদাহ
অনুবাদঃ সাঈদুল মোস্তফা

Share this article

Leave a Reply