মহানবির মহান জীবন ৭

Share this article
মহানবির মহান জীবন #গল্পসিরাত #অন্যরকম_সিরাত

জানালার ফাঁক দিয়ে বাতাসে দুলতে থাকা খেজুর পাতার দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন আবু তালেব। সদ্য পিতাকে হারিয়ে তিনি যতটা না বিহ্বল তারচেয়ে বেশি ব্যথিত ছোট্ট মুহাম্মদের কথা ভেবে। পাশেই মুহাম্মদ গুটিশুটি দিয়ে ঘুমাচ্ছে, একহাতে জড়িয়ে আছে প্রিয় চাচাকে। রাতের আকাশের স্নিগ্ধ আভায় গাছের পাতার ছায়া দেখা যাচ্ছে, ভাবতে ভাবতে দূরের দুশ্চিন্তায় ডুবে গেলেন আবু তালিব। মুহাম্মদকে পাশে না নিয়ে ঘুমান না তিনি। খেতে বসলেও আগে মুহাম্মদকে পাশে বসিয়ে খাইয়ে দেন। তবে মুহাম্মদকে নিয়ে তাঁর বিশেষ কোনো দুশ্চিন্তা নেই, ছেলেটা নিজেই নিজের পথ চিনে নিতে জানে।

সকালে ছেলেপেলের একটা জটলা ছুটে গেলো আবু কুবাইস পাহাড়ের দিকে, মহল্লার কোথাও একটা পাখি কিংবা গিরগিটি মরলেও বাচ্চাদের মধ্যে খবরটা চাউর হতে দেরি হয়না। বড়দের কাছে এসব সাধারণ ঘটনা হলেও বাচ্চাদের জন্য বিরাট ঘটনা। মুহাম্মদ জমজম পাড়ে হাত-মুখ ধুচ্ছিলো, তখনই এক ছেলে আবু কুবাইস পাণে ছুটতে ছুটতে চিৎকার করে জানিয়ে গেলো- জলদি চলো, আবু কুবাইসের ওদিকে নাকি বিরাট এক শকুন মরে পড়ে আছে। মুহাম্মদ ছেলেটার দিকে তাকিয়ে আবার হাত-মুখ ধোয়ায় মন দিল, সে ধীরস্থির। কখনও হাতের কাজ শেষ না করে অন্যদিকে নজর ফেরায় না। দুঃসংবাদ শুনে শান্তভাবে গ্রহণ করার, চিন্তা করার স্বভাব গড়ে উঠেছে তাঁর মধ্যে। সহজেই বিচলিত হয়না।

কা’বার দেয়ালে বেশ কিছুক্ষণ পিঠ ঠেকিয়ে বসে সকালের পরিবেশটা পর্যবেক্ষণ করলো মুহাম্মদ। দূরে আবু কুবাইস থেকে বাচ্চাদের শোরগোলের আওয়াজ আসছে। চাচি ফাতেমা বিনতে আসাদের[1] ডাকে সম্বিত ফিরলো তাঁর, চাচি ডাকছে। কাছে যেতেই চাচি তাঁকে বুকে আগলে নিলেন, হাতে তুলে দিলেন খাবার। পরম আদরে মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন- মরা শকুন দেখতে যাওনি যে? মন খারাপ? মিষ্টি একটা হাসি দিয়ে মুহাম্মদ জানালো সে যাবে যখন শোরগোল থামবে, যখন ছেলেরা শেষ পর্যন্ত আর কি করা দরকার বুঝে উঠতে পারবেনা তখন সে যাবে। গিয়ে পাখিটাকে কবর দেবে। অবাক করা হাসি দিয়ে চাচি বললেন- আব্দুল্লাহ’র বেটা দেখো কত বড় হয়ে গেছে, কত বুঝদার! পাত্রে করে পানি এনে তিনি এবার মুহাম্মদকে নিজ হাতে পান করিয়ে দিলেন। যাও তবে, সাবধানে যেও।

মাঝে মাঝে আব্দুল মুত্তলিবের কবরে গিয়ে সময় কাটায় মুহাম্মদ। কচি মনে ভেসে উঠে মদীনায় মায়ের সাথে করা পিতার কবর জিয়ারতের স্মৃতি। পরে মাকেও কোথায় জানি কবর দিয়ে আসতে হলো। মা-বাবা নেই, তাঁদের কবরও সে দেখার সুযোগ পায়না। যারাই তাঁকে ছেড়ে মাটির দেশে চলে গেছে তাঁরা আর ফিরেনা। তাঁরা কোথায় আছে? আকাশের রব্বের কাছে? এভাবেই দিন-মাস-বছর কেটে যাচ্ছে। মুহাম্মদ পরিপক্ক হয়ে উঠছে অনুপম বৈশিষ্ট্যে।

ঘরোয়া আলাপে একদিন মুহাম্মদ শুনতে পেল চাচা আবু তালিব কিছুদিনের মধ্যেই সিরিয়া সফরে বের হওয়ার মনস্থির করেছেন। দিনের বেলা তাঁকে বাণিজ্যের সওদা গোছগাছ করতে দেখে, সে দূর থেকে দেখে আনমনা হয়ে যায়। সে শুনেছে তাঁর বাবাও এভাবেই বাণিজ্য সফরে গিয়ে আর ফিরেনি। সে নিজেও মায়ের সাথে সফরে গিয়ে একাকি ফিরেছে। শীতের আমেজ কড়া নাড়তে শুরু করেছে প্রকৃতিতে। জমজমের পানির স্তর নীচে নেমে গেছে। বাতাসে শুষ্কতার কামড় প্রকট হয়ে উঠছে, পাহাড়ী ছাগলের পালকে মাঝে মাঝে লোকালয়ের কাছাকাছি আসতে দেখা যায়। তবে বাহারি মরুগুল্ম প্রকৃতিতে শোভাবর্ধন করছে যা মনের আঙ্গিনাতেও রঙের ছিটা দিয়ে যায়।

পণ্য বোঝাই উটের কাফেলা মক্কার প্রবেশপথে অপেক্ষা করছে। আবু তালিব সবার হাতে বোনা জিনিসপত্র বুঝে নিয়েছেন দাম সহ। সিরিয়ায় সেসব বিক্রি করে আবার কার কি লাগবে তাও জেনে নিয়েছেন। আরবদের মুখস্থ শক্তি খুবই নিখুঁত আর প্রখর। শুধু মুখস্ত হিসাবের উপর ভিত্তি করেই এরা হাজার হাজার লেনদেন নির্ভুল করতে পারে। সবার সাথে সাক্ষাৎ শেষে আবু তালিব দাঁড়ালেন মুহাম্মদের সামনে। উবু হয়ে মুহাম্মদের দিকে তাকিয়ে হেসে বললেন- তোমার জন্য কি আনবো বলো বাবা? নিশ্চুপ মুহাম্মদ ছলছল চোখে তাকিয়ে চাচার চেহারায় কি যেন খুঁজতে লাগলো। বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকতে না পেরে মুখ নামিয়ে নিলো সে। সাদা বালির উপর টপটপ করে পড়া অশ্রু ফোঁটা কালো বিন্দু হয়ে উঠছে। আবু তালিব নিজেকেও প্রবোধ দিতে পারশিলেন না মুহাম্মদকে রেখে যেতে। মুহুর্তেই তিনি সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললেন। মুহাম্মদকে আদরে জড়িয়ে কোলে তুলে নিলেন। বললেন, তুমিও যাচ্ছ আমার সাথে। আশাপাশের সবার চোখ যেন অবিশ্বাসে ঠিকরে বেরিয়ে আসবে এক্ষুনি। এইটুকুন ছেলে কি করে এতদূর সফর করবে?!

ছোট্ট ছোট্ট হাত দুটি দিয়ে উটের পিঠ জাপটে ধরে আছে মুহাম্মদ, পিছন থেকে তাঁকে জড়িয়ে বসে আছেন প্রিয় চাচা। সমুদ্রের মত ঢেউ তুলে এগিয়ে চলেছে উটের কাফেলা। চাচি তাঁকে সাজিয়ে দিয়েছে সুন্দর পোশাকে। আঁচড়ে দিয়েছে চুল। বলেছে, চাচার হাত একদমই ফসকে দিতে দেয়া যাবেনা। ধুলোঝড় এলে মুখে চাদর জড়িয়ে নিতে হবে। পেছন থেকে বাচ্চাদের হর্ষধ্বনি শোনা গেলো। তারা দৌড়াতে দৌড়াতে কাফেলার পাশে চলছে। চিৎকার করে গলা ফাটিয়ে বলছে- আবার দেখা হবে মুহাম্মদ! নিরাপদে ফিরে এসো! মুহাম্মদের ছোট্ট নাকে এসে লাগলো মরুর মুক্ত প্রকৃতির বন্য সুগন্ধি।


[1] নিসা মিন আসরিন নবী, আহমদ খালিদ জুমাআহ, দারু ইবনে কাসির, দামেস্ক, ২০০৩, পৃষ্ঠা- ২৩। এই চাচি ফাতিমা বিনতে আসাদ ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। তিনি মদীনায় ইন্তিকাল করেন। উনার দাফনের সময় রাসূলুল্লাহ (স) উপস্থিত ছিলেন। তখন তিনি দোয়া করেছিলেন- আল্লাহ আপনার উপর রহম করুন প্রিয় মা, আমি আমার মাকে হারানোর পর আপনিই আমার মা ছিলেন, আমাকে খাবার দিতে আপনি ক্ষুধার্ত থেকেছেন, আমাকে বাড়তি পোশাক দিতে আপনি নিজের পোশাকের অভাব সয়েছেন, আপনি জীবনের সুখকে বিসর্জন দিয়েছেন যেন আমি জীবনের সুখকে অনুভব করি, এবং এসব কিছুর বিনিময়ে আপনি কেবল আল্লাহর পুরস্কারকে আশা করেছিলেন।

পর্ব- ৬ পড়ুন এখানে

লেখা- সাঈদুল মোস্তফা

Share this article

Leave a Reply

Your email address will not be published.