মহানবির মহান জীবন ১০

Share this article
মহানবির মহান জীবন গল্পসিরাত অন্যরকম সিরাত

পাতলা ঘাসের আবরণে বসে আছে ছেলেগুলো, চারপাশে ফড়িঙ উড়ছে। ভোরের লালচে আলোয় ফড়িঙগুলোকে মনে হচ্ছে যেন আগুন নাচছে। ভেড়ার পালের গোদাটাকে টানতে টানতে সেদিকে এগুলো মুহাম্মদ (সঃ)। কাছাকাছি একটা পাথরের সাথে বেঁধে নিল। পালে একটা নেতাগোছের ভেড়া থাকে, এটাকে বাঁধলেই চলে। বাকিরা তার আশেপাশেই চরে, দলছুট হয়না। স্মিত হেসে ছেলেদের পাশে বসল সে। এরা সবাই মেষপালক। মুহাম্মদকে দেখে সবাই উৎফুল্ল হয়ে উঠল। একটু আগে কি ঘটেছে তা বলতে শুরু করল একজন। আরেকজন পুঁটলি খুলে শুকনো খেজুর এগিয়ে দিল সবার উদ্দেশ্যে। কাছে কোথাও গাছপোকা ডাকছে। দুই একটা ফড়িঙ সাহস করে খেজুরে বসার চেষ্টা করছে…

.

ফিজার যুদ্ধের পর হিজায জুড়ে মন্দা ও অভাব নেমে এসেছে। যুদ্ধের চিরাচরিত ফলাফল। আরবরা অবশ্য এমন কঠিন জীবনে অভ্যস্ত। আবু তালিবের ঘরভর্তি সন্তান-সন্ততি। কিন্তু তিনি সবাইকেই শৈশব থেকে কর্মঠ হওয়ার দীক্ষা দিয়ে বড় করছেন। বালকদের সবাই বিভিন্ন মেষমালিকদের ভেড়ার পাল চরানোর কাজে চলে যায় সকাল হলেই। সন্ধ্যায় ফিরে। বিনিময়ে মাস শেষে পরিবারের ভরণ-পোষণের ব্যবস্থা হয়ে যায়। আবু তালিবও টুকটাক ব্যবসার চেষ্টা করে যাচ্ছেন। মন্দার প্রাদুর্ভাব ইয়েমেনেও পড়েছে, ইয়েমেনমুখী বাণিজ্য নিয়ে যাওয়া আত্মাহুতির নামান্তর হবে এখন। শামের দিকে যাওয়ার মত রসদ নেই। তাই এভাবেই দিনাতিপাত করে সুদিন ফিরে আসার অপেক্ষা করা ছাড়া আর কিছু করার নেই।

.

সন্ধ্যায় ভেড়ার পাল উপত্যকায় ঢেউ তুলে ফিরতি পথ ধরেছে, যেন সাদা-ধূসর মেঘদল ভেসে চলেছে। পড়ন্ত সূর্যের সোনালী রশ্মিতে চিকচিক করছে এদের সফেদ পশম।[1] ছন্নছাড়া ভেড়ার মধ্যে এই সৌন্দর্য্য নেই, দলবদ্ধ ভেড়ার কাছে নেকড়েও ঘেঁষতে ভয় পায়। ভেড়ার পাল হাঁকাতে হাঁকাতে এসব ভাবে মুহাম্মদ। তবে বেয়াড়া কিসিমের কয়েকটা ভেড়া যে নেই তা না। এদেরকে বিশেষ কৌশলে বাগে আনতে হয়। একেকটা পালকে সুশৃঙ্খলভাবে হাঁকিয়ে আস্তানায় ফিরিয়ে আনতে প্রচুর ধৈর্য্যের প্রমাণ দিতে হয়। সকালে চারণভূমিতে নিয়ে যেতে অবশ্য এতো বেগ পেতে হয়না। কোমল তৃণের লোভে গোটা পাল গদগদ হয়ে ছুটতে থাকে। এসব অবলা ভেড়া নেকরের প্রিয় খাবার। তাই সজাগ দৃষ্টি রাখতে হয়। মুহুর্তের জন্যেও বেখেয়াল হওয়া চলেনা। প্রকৃতিতে এই জন্তুরা সৌন্দর্য্যের অংশ, এই অনুপম সৃষ্টির কারিগর না জানি আরো কত সৌন্দর্য্য ছড়িয়ে রেখেছেন জগতজুড়ে!

.

অসুস্থ হয়ে পড়েছে একটা ভেড়া, সেটাকে ঘিরে তারস্বরে চিৎকার জুড়ে দিয়েছে আরো কয়েকটা। দুপুরের খাবারের পুঁটলি হাতে নিয়ে সেদিকে হাঁটা ধরলো মুহাম্মদ। তাঁর আগমন টের পেয়ে বাকি কয়েকটা পায়ের কাছে মুখ ঘষতে লাগলো। অস্থির ভেড়াকে কিভাবে শান্ত করতে হয় সে দক্ষতা মুহাম্মদ ইতিমধ্যেই অর্জন করে ফেলেছে। অসুস্থ ভেড়াটি মাটিতে শুয়ে হাঁপাচ্ছে, হাপরের মত পেট উঠানামা করছে। নিজের পানির মশক থেকে এক আজলা পানি নিয়ে ভেড়াটির মাথা ভিজিয়ে দিল সে। আরেক আজলা পানি ভেড়ার মুখে ঢেলে দিল। বাকি ভেড়াগুলোর মধ্যে আতঙ্ক তৈরি না হওয়ার জন্যে সেগুলোকে হাঁকিয়ে একটু দূরে ছেড়ে আসলো। আবার ফিরে এসে অসুস্থ ভেড়াটাকে আরেকটু ঘন ছায়ায় নিয়ে আসল। এতক্ষণে একটা ছেলে দৌড়াতে দৌড়াতে এসেছে। সে দূর থেকে দেখে বুঝেছে কোন সমস্যা হয়েছে। অসুস্থ ভেড়াটিকে দেখে সে মন্তব্য করলো- অতিরিক্ত রোদে তাপাক্রান্ত হয়েছে, ঘাবড়াবার কিছু নেই। তবুও মুহাম্মদের মন মানছেনা, বড্ড মায়া জন্মে গেছে এদের জন্য! দূরের নীল দিগন্তে সূর্য পাটে বসতে চলেছে।

.

এভাবে দিন চলছে, মাস গড়াচ্ছে, যাচ্ছে বছর। একদিন সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে চাচাতো ভাইদের সাথে খেতে বসে মুহাম্মদ জানতে পারল চাচা আবার শামের বাণিজ্যে যাওয়ার চিন্তাভাবনা করছেন। মক্কায়ও অর্থনৈতিক অবস্থা সুপ্রসন্ন হতে শুরু করেছে। ফিজারের বিভীষিকা কাটিয়ে উঠছে জনবসতি। গবাদি পশুগুলোর ওলান এখন দুধভর্তি থাকে। দূরবর্তী অঞ্চল থেকে কদাচিৎ ব্যসায়ীরা আসতে শুরু করেছে বাণিজ্যের বহর নিয়ে। সেদিন দিনভর ঝিরিঝিরি বৃষ্টি হয়েছে। নিশ্চয় আসমানের মালিক এবার এই জনপদের উপর দয়ার দৃষ্টি দিয়েছেন। মেষপালকদের সাথে পরিচয় আরো গাঢ় হয়েছে, কিছু বিশ্বস্ত বন্ধুও যোগাড় হয়েছে। বিছানায় শুয়ে রাতের আকাশের দিকে তাকিয়ে ফেলেল আসা দিনগুলো ভাবছে মুহাম্মদ। আব্দুল মুত্তলিবের মৃত্যু, শাম সফর, ফিজার যুদ্ধ… যেখানে আকাশ শেষ হয়েছে সেখানে কে থাকেন? এতসবকিছু কার সিদ্ধান্তের ফল? ভাবতে ভাবতে চোখ মুদে আসে তাঁর। স্বপ্নে আসে আরো সুন্দর ভাবনা, শুভ্রতায় ভর করে। কথিত সভ্য সমাজ থেকে অনেক অনেক দূরে মক্কার গর্ভে গড়ে উঠছে এমন এক প্রজন্ম যার কাঁধেই গোটা বিশ্বের ভবিষ্যৎ। আস্তে আস্তে পৃথিবী প্রস্তুত হচ্ছে সেই সোনালী প্রজন্মকে অভ্যর্থনা জানাতে।


[1] সূরা নাহাল- ৬

Share this article

Leave a Reply

Your email address will not be published.