মহানবির মহান জীবন ১৪

Share this article

মহানবির মহান জীবন । গল্পসিরাত । অন্যরকম সিরাত

হিমেল হাওয়ায় যায়দের চুল কাঁপছে। টিলার গায়ে ঢলে পড়া সূর্যের তেরছা আলো কখনও বাড়ছে কখনও কমছে। যায়দের মন একছুটে চলে গেল ইয়েমেনে। মায়ের হাত ধরে সে মামার বাড়ি গেল। তার মামাদের সাথে চাচাদের দীর্ঘদিনের বিবাদ। মায়ের অগোচরে আপন মামারাই তাকে মক্কাগামী এক কাফেলার কাছে বিক্রি করে দিল। কি থেকে কি হয়ে গেল! কিন্তু খাদিজার দায়িত্বে আসার পর থেকে সে মায়ের অভাব আর টের পায়নি। মায়সারাও তাকে অনেক যত্ন করে। যায়দের মন বলছে আজই মায়সারা শাম থেকে বাণিজ্য কাফেলা নিয়ে ফিরবে। বড় একটা নিঃশ্বাস নিয়ে মক্কার প্রবেশপথের দিকে তাকাতেই যায়দের ইচ্ছে হলো নিজের ভাবনার জন্য নিজেই নিজের পিঠ চাপড়ে দিতে। মায়সারাদের উটের আওয়াজ শোনা গেল। হেলেদুলে উটগুলো ফেনিল তরঙ্গের মত এগিয়ে আসছে। কিছু বুঝে উঠার আগেই যায়দ আবিষ্কার করলো সে মায়সারাদের দিকে ছুটছে।

.

মক্কার প্রতিটি জটলায় প্রতিদিনকার আলাপ এখন মুহাম্মদের শাম সফর। এমন সফল বাণিজ্যিক সফর ইতোপূর্বে আর কারো নসীবে জুটেনি। কয়েকগুণ মুনাফা নিয়ে ফিরেছেন তিনি। মক্কার মানুষ জাত ব্যবসায়ী, তাই আড্ডা দেয়ার জন্য এমন বিষয় পেলে অন্য কোন কথাই আর জমেনা। মক্কাবাসী এই আলাপে মশগুল হলে কি হবে, খাদীজার ঘরে তখন অন্য আলাপ! শাম সফরের পুঙ্খানুপুঙ্খ বয়ান দিচ্ছে মায়সারা। কিন্তু ঘুরে ফিরে তার আলাপ নিবদ্ধ হচ্ছে কেবল মুহাম্মদের নানান বিষয়ে। কখনও সফরের সেই ছায়া, কখনও পাদ্রীর রহস্যময় উক্তি, কখনও ব্যবসায়ীদের সাথে মুহাম্মদের অমায়িক ব্যবহার ও ব্যবসার নিখুঁত মাপজোক নিয়ে। যখনই এসব আলাপ আসে মায়সারার চোখ উত্তেজনায় ঠিকরে বেরিয়ে আসতে চাইছে। যায়দও নিবিড় শ্রোতা। খাদীজা মনে মনে সিদ্ধান্ত নিলেন মুহাম্মদকে যে পরিমাণ মুনাফার ভাগ দেয়ার কথা ছিল এর চেয়েও বাড়িয়ে দিবেন। এমন ভাগ্যবান ও পবিত্র চরিত্রের পুরুষ মক্কা তো বটেই, আরবেও বিরল। মানুষটিকে কখনও দেখেননি খাদীজা। তাঁর সম্পর্কে নানান কথা শুনেই এক পবিত্রতম সমীহজাগা আকর্ষণ সৃষ্টি হয়। এ এক অপার্থিব অনুরণন!

.

আজ আবু তালিবের ঘর বেশ সরগরম। উনুনের আগুন নিভিয়ে আবু তালিবের স্ত্রী বাচ্চাদের জন্য রুটি নিয়ে আসলেন। শাম থেকে মুহাম্মদের আনা মজাদার হালুয়াও আছে। এদিকে মায়সারা ও মুহাম্মদ যার যার পণ্য তাঁকে বুঝিয়ে দিতে ব্যস্ত হয়ে গেছেন সকাল থেকেই। শাম থেকে ফরমায়েশ মত পণ্য কিনে এনেছেন তাঁরা, এনেছেন বাড়তি পণ্যও। যা স্থানীয় বাজারে বিক্রি করে আরো মুনাফা পাওয়া যাবে। উটগুলোকে গোসল করিয়ে রোদে ছেড়ে দেয়া হল। পণ্যের বহরের আশেপাশে ছোট ছোট বাচ্চারা ঘুরঘুর করছে। একটা কিছু ছিটকে পড়লে হুড়মুড় করে সবাই ঝাঁপিয়ে পড়ছে। মৃদু হেসে বেশ কিছু শামী মিষ্টি বাচ্চাদের মাঝে বন্টন করতে লেগে গেলেন মুহাম্মদ। সবশেষে কাজে টুকটাক সাহায্য করতে আসা যায়দকে অনেকগুলো মিষ্টি দিয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন। দুপুরের খেজুরবিথীগুলো নিজের ছায়ার উপর দাঁড়িয়ে আছে। ছোঁচাল পাতাগুলো রোদের ভার সইতে না পেরে নেতিয়ে পড়েছে।

.

কিছুদিনের মধ্যেই খাদীজা বুঝতে পারলেন এতদিন তিনি বিয়ের বিভিন্ন প্রস্তাব কোন অদৃশ্য ইশারায় ফিরিয়ে দিয়েছেন। প্রিয় বান্ধবীর সাথে আলাপকালে বিষয়টি তাঁর অন্তরে আরো প্রতিভাত হল। নাফিসাকে এক পর্যায়ে বলেই ফেললেন তিনি মুহাম্মদকে জীবনসঙ্গী হিসেবে আশা করেন। নাফীসা বলল, ব্যাপারটি আমার হাতে ছেড়ে দাও। আমিই উনার সাথে এ বিষয়ে কথা বলে তাঁর কি ইচ্ছা জেনে নিতে পারবো। খাদীজা সম্মতি দিলেন। মুহাম্মদ এমনিতেই লাজুক মানুষ। এর উপরে একজন সম্ভ্রান্ত নারীর বিয়ের প্রস্তাব আসল আরেকজন নারী মারফত। লজ্জায় লাল হয়ে গেলেন তিনি। অস্ফুটভাবে বললেন, আমার আপত্তি নেই, কিন্তু আমাকে আমার চাচার সাথে কথা বলেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে। যেমন কথা তেমন কাজ। প্রিয় চাচা আবু তালিবের কাছে তিনি বিষয়টি তুলে ধরলেন। বিজ্ঞ আবু তালিব বুঝতে পারলেন এমন একটি ঘটনা ঘটারই ছিল। মুহাম্মদের মত যোগ্য সুপাত্রের জন্য খাদীজার মতোই সুপাত্রী মানানসই। এ যেন খোদারই রহস্যময় ইশারা। স্রষ্টার গেঁথে দেয়া জোড়বন্ধন। তিনি বংশের মুরুব্বিদের নিয়ে খাদীজার চাচার সাথে কথা পাকা করতে বসলেন। বৈঠকেই বিয়ের দিনক্ষণ ঠিক হয়ে গেল।

.

শাম থেকে ফেরার দু মাসের মাথায় খাদীজা দুলহান হয়ে আসলেন মুহাম্মদের জীবনে। বিয়ের মোহরানা ধার্য্য হল বিশটি মূল্যবান উটনী। বিয়ে পড়ালেন আবু তালিব। চারদিকে আনন্দের হিল্লোল পড়ে গেল। মক্কাবাসীর বহুল প্রতীক্ষিত বিয়ের অনুষ্ঠান ছিল এটি। মুহাম্মদের তখন ২৫ বছর বয়স। খাদীজার বয়স ত্রিশের কাছাকাছি। মরুর বুকে নির্মিত হল নতুন এক উপাখ্যান। ভালোবাসার শুভ্র বুননে সাজল দুটি পবিত্র জীবন। পঙ্কিল মানবস্রোতের মাঝে উৎসারিত হতে যাচ্ছে এক পবিত্র বংশধারা। ইতিহাস দেখতে চলেছে একটি সত্যিকারের সুখী পরিবারের বুনিয়াদ। সেদিন হয়তো মরুর আকাশ বর্ণিল রঙ মেখেছিল নীল ক্যানভাসে। রাতের নক্ষত্রগুলো লেখেছিল ভালোবাসার পঙক্তিমালা।

  • সাঈদুল মোস্তফা

মহানবির মহান জীবন সিরিজের আগের পর্বগুলোঃ

প্রথম পর্ব- https://wp.me/pd9hWS-q3

দ্বিতীয় পর্ব- https://wp.me/pd9hWS-q5

তৃতীয় পর্ব- https://wp.me/pd9hWS-nI

চতুর্থ পর্ব- https://wp.me/pd9hWS-o2

পঞ্চম পর্ব- https://wp.me/pd9hWS-o7

ষষ্ঠ পর্ব- https://wp.me/pd9hWS-of

সপ্তম পর্ব- https://wp.me/pd9hWS-oZ

অষ্টম পর্ব- https://wp.me/pd9hWS-pM

নবম পর্ব- https://wp.me/pd9hWS-pX

দশম পর্ব- https://wp.me/pd9hWS-qb

একাদশ পর্ব- https://wp.me/pd9hWS-qd

দ্বাদশ পর্ব- https://wp.me/pd9hWS-q0

ত্রয়োদশ পর্ব- https://wp.me/pd9hWS-qg

Share this article

Leave a Reply