মহানবির মহান জীবন 3

Share this article
মহানবির মহান জীবন || গল্পসিরাত || অন্যরকম সিরাত ||

গোধূলি আলো খেজুর পাতায় চড়ে ডোরাকাটা ছায়া ফেলেছে তাঁবুর গায়ে। মরুভূমির সূর্যাস্ত লালচে ঝুঁটি ছড়িয়ে দিচ্ছে বালির আস্তরণে। তাঁবুর সামনে উটনীর বাঁধন ঠিকঠাক আছে কিনা দেখছেন হারেস। মুহাম্মদকে নিয়ে মাত্রই তাঁবুতে প্রবেশ করেছেন হালীমা, কিছুক্ষণ তাকে সাথে রাখার জন্য এনেছেন। দুগ্ধপান করানোর চেষ্টা করতে গিয়ে হালীমা নিজের মধ্যে পরিপুষ্টতা টের পেলেন। মুহাম্মদ পেট ভরে পান করার পর ঘুমে তলিয়ে গেলো। হালীমা এবার তার নিজের পুত্র আব্দুল্লাহকে পান করালেন।

এদিকে উটনীর বাঁধন পরীক্ষা করতে গিয়ে হারেস খেয়াল করলেন এর ওলান টইটম্বুর হয়ে আছে। তিনি হন্তদন্ত হয়ে ভিতরে এসে হালীমাকে জানালেন তাদের হাড় জিরজিরে উটনী রিযিকে ভরপুর হয়ে আছে। হালীমা হেসে জানালেন এদিকের খবরও একইরকম। চোখে চোখে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়ে গেল হালীমা ও হারেসের। এই শিশু বরকতের পরশপাথর। তাদের পরিবারে এই নতুন সদস্য বসন্তের সব কল্যাণ যেন উজাড় করে নিয়ে এসেছে।

কুপির কাঁপাকাঁপা আলোয় দুজনের আদুরে দৃষ্টি নিবদ্ধ হলো মুহাম্মদের মায়াবী চেহারায়। একটুপর হারেস পেয়ালা হাতে চলে গেলেন উটনীর দুধ দোহাতে। চলতি বছরে এই বুঝি প্রথমবারের মতো তার মুখের হাসি কলিজা পর্যন্ত পৌঁছলো। হালীমাও ছোট্ট মুহাম্মদকে আমীনার ঘরে দিয়ে আসতে গেলেন। যেতে যেতে হারেসকে বললেন, তাঁবুতে আব্দুল্লাহ আছে, খেয়াল রেখো।

পরদিন ভোর হতেই হালীমা ছুটে গেলেন আমীনার ঘরে, মুহাম্মদকে আনতে। এদিকে সফরের প্রস্তুতি নিতে তোড়জোড় চালাচ্ছেন হারিস, আজই ফিরতে হবে বনু সা’দ পল্লীতে; আপন নীড়ে। আমীনা সুন্দরভাবে পরিপাটি করে মুহাম্মদকে গুছিয়ে দিলেন। হালীমার কোলে কলিজার টুকরাকে তুলে দেয়ার সময় টপটপ করে অশ্রুমালা ঝরছিলো তাঁর চোখ দিয়ে। হালীমা অভয় দিয়ে বললেন, আমি ওকে মাঝেমধ্যে বেড়াতে নিয়ে আসবো। ওকে দেখভাল করতে ওর একটা বোনও আছে, আর খেলার জন্যে আছে আব্দুল্লাহ আর আনিসা। ওরা সবাই একসাথে বড় হবে আমার আপন সন্তানের মতই।

তাঁবু গোটানো শেষ হতেই হারিস দেখলেন হালীমা এগিয়ে আসছেন, বুকের সাথে জাপটে ধরে আছেন পিচ্চি মুহাম্মদকে। অদূরেই আমীনা ছলছল চোখে বিদায় জানাচ্ছেন একটা নুয়ে পড়া খেজুর গাছের আড়াল থেকে। ভোরের হিমেল বাতাসে তপ্ত ফলা চালাচ্ছে মরুর সূর্য। কর্কশ আওয়াজ তুলে উটগুলো আরোহী পিঠে নিয়ে উঠে দাঁড়ালো। দুলকি চালে একে একে বেরিয়ে যাচ্ছে মক্কার ধূলোমলিন পথ ধরে। দূরে কোথাও একটা চিল ডেকে উঠলো, সেই তীক্ষ্ণ স্বর আমীনার খানখান হওয়া হৃদয়কে যেন আরো বেশি আহত করে গেলো।

গতকালের শীর্ণ বাহন প্রস্থানকালে ছুটছে অশ্ববেগে 
অবাক হালীমার কোলে শিশু মুহাম্মদ আছে জেগে
চারপাশে আজ মরু নেই, চলছে যেন কোন পুষ্পবাগে
কাল যাদের পিছু পড়েছিলো আজ হালীমা তাদের আগে।।
এ কোন পরশপাথর ছুঁয়ে দিল হালীমার জীবন 
নিমিষেই বদলে গেল সকল যাপিত উপকরণ।
ভাবছে হালীমা কোলের এ শিশু নয় কোন সাধারণ
নিপুণ কৌশলে খোদা তারে দিলেন সৌভাগ্যের বরণ।।
বিস্মিত সখীরা বলে- এ তো আগের বাহন, তাইনা? 
হালীমা জানান- হ্যা, এটাই আমার সীমিত মালিকানা।
তবে এ কি করে এত তেজস্বী হলো তা তো বুঝছি না,
জীবনে প্রথম দেখলো তারা এমন অলৌকিক ঘটনা।।

ছোট ছোট পাথুরে বোল্ডার ঘন হয়ে টিলার আদল দিয়েছে যেখানে, বাচ্চারা সেখানটায় লুকোচুরি খেলছে। টিলার কিছু অংশ হাতের আঙ্গুলের মত ফাঁকাফাঁকা। সেখান দিয়ে তাকালেই বনু সা’দ পল্লীর প্রবেশমুখ দেখা যায়। বাকীদের মত শায়মাও লুকিয়েছে টিলার আড়ালে। দশ গোনার পর ছেলেটা কোনদিকে যাচ্ছে তা দেখার জন্য যেইনা উঁকি দিলো শায়মা, পল্লীর প্রবেশপথে তাদের প্রিয় উটনীকে দেখে চিৎকার দিয়ে উঠলো। খেলা পণ্ড। হৈ হুল্লোড় করে বাচ্চারা সব দৌড়ে চললো পথের দিকে। মা এসেছে, বাবা এসেছে। সাথে করে নিশ্চয়ই এসেছে নতুন অতিথি!

মুহাম্মদের দিকে বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে আছে শায়মা আর আনিসা। যেন নিঃশ্বাস নিতেও ভুলে গেছে। মনে হচ্ছে অনেকদিনের চেনা আপন কেউ, কিন্তু ভারি অদ্ভুত মায়াবী চেহারা। ছুঁয়ে দেখতে মনটা আকুলিবিকুলি করছে। মায়ের পাশে পাশে দৌড়ে চললো তারা ঘর পর্যন্ত। ঘরে ঢুকে হালীমা বিছানায় মুহাম্মদকে শুইয়ে দিলেন। আব্দুল্লাহ ঘুমিয়ে পড়েছে। তাকে পাশে শুইয়ে দিলেন। পিছনে তাকিয়ে দেখেন শায়মা, গত একদিন তারা কিভাবে কাটালো সেই ফিরিস্তি দেয়া শুরু করলো দুরন্ত মেয়েটা। কিন্তু শায়মার চোখ বারবার গিয়ে পড়ছে নতুন ভাইয়ের চোখ দুটোয়, সেখানে খেলা করছে রাজ্যের স্নেহ!

মধ্য দুপুরে কেউ তেমন ঘর ছেড়ে বের হয়না। গনগনে রোদে দূরে তাকালেই মনে হয় রূপালি জলের স্রোত খেলা করছে। মরীচিকা দেখে অভ্যস্ত আরবদের ধারণা এসব জ্বীন-ভূতের কারসাজি। লোভ দেখিয়ে পথিককে দিকহারা করার কুহেলিকা। শায়মা কোলে নিয়ে আছে মুহাম্মদকে। আরব্য লোকগাঁথার সুর ভাঁজছে আর দুলে দুলে ভাইকে ঘুম পাড়াচ্ছে। পিচ্চিটা খুব দ্রুতই বড় হয়ে যাচ্ছে অবিশ্বাস্যভাবে। অন্য আর দশটা বাচ্চার মত না, মুহাম্মদের বাড়ন্ত গড়ন চোখে পড়ার মত।

শায়লা মা-বাবাকে আলাপ করতে শুনেছে মুহাম্মদকে আনার পর থেকে আমাদের উটনী তরতাজা হয়ে গিয়েছে, সকাল-সন্ধ্যা দুধে ভরে থাকে। ছাগলের পালেও লেগেছে বরকতের ছোঁয়া। শায়মা আজ সকালেও শুনেছে পাশের বাড়ির চাচা তার রাখালকে খুব করে বকে বকে বলছেঃ হারেসেদের ছাগলগুলো যেখানে চরাতে পাঠায় আমাদেরগুলো সেখানে নিয়ে যেতে পারিস না! তাদেরগুলো হৃষ্টপুষ্ট হয়ে আসে আর আমাদেরগুলো কেন যেমন যায় তেমন ফিরে? কথাটা মনে পড়তেই হেসে কুটিকুটি হয় শায়মা। মুহাম্মদকে আনার পর থেকে তাদের কপাল খুলে গেছে, এখন অত্র পল্লীতে শায়মারা সবচেয়ে অবস্থাভাবাপন্ন পরিবার।

শায়মা ও আনিসার দিনের বেশিরভাগ সময় এখন কাটে মুহাম্মদ আর আব্দুল্লাহকে নিয়ে। শায়মার মুখে ছোট ছোট ছড়া শুনে বড় হচ্ছে এরা। হালকা হালকা বুলি ফুটছে দুজনের। কোল থেকেই রাখতে মনে চায়না। এত আদর কিভাবে জায়গা করে নিলো এই বাচ্চাটার মধ্যে আল্লাহ ভালো জানেন! এভাবেই দিন কেটে যাচ্ছে মায়া মমতা আর স্নেহের বর্ণিল আবহে।

সাঈদুল মোস্তফা

রাসূলের সাথে আখেরাতের জীবন নিয়ে পড়ুন এখানে

Share this article

Leave a Reply

Your email address will not be published.