মহানবির মহান জীবন ৪

Share this article
মহানবির মহান জীবন- 4 #অন্যরকম_সীরাত #গল্প_সীরাত

বছরে একটা সময় মরুঝড় সাইমুমের উৎপাত চলে আরবজুড়ে। বিশেষ করে শীতের হাওয়ায় শুষ্ক বালুকণা যখন এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে উড়ে যায়। এই সময় কেউ ঘর ছেড়ে বের হয়না। সবার একটাই কামনা, বৃষ্টি নেমে আসুক ধরায়। শীতের শেষে বৃষ্টি নামে আনন্দের বার্তা নিয়ে। টুকটাক ফুল ফসলে ভরে উঠে গ্রাম্য এলাকা। বৃষ্টিস্নাত বালুরাশি জমে ঠনঠনে হয়ে উঠে, সেখানে রঙ ছড়ায় বাহারি মরুগুল্ম। মক্কার শহুরে ব্যবসায়ীরা বের হয়ে পড়ে শীতের বাণিজ্য সফরে। ইয়েমেন অভিমুখী এইসব বাণিজ্য কাফেলা কখনও সখনো বনু সা’দের এইদিক দিয়েও অতিক্রম করে। বাচ্চারা তখন ভীড় জমায় কাফেলা দেখতে। কাফেলা এইদিকে যাত্রাবিরতি দিলে সওদা করে কিছু উপার্জনের সুযোগও মিলে যায়।

বনু সা’দ গোত্র হাওয়াযিন বংশের একটি শাখা। এদের ভাষা আরবের সবচেয়ে উৎকৃষ্ট এবং সাহিত্যমন্ডিত। এছাড়া বনু সা’দ পল্লীতে শারীরিক কসরতের বেশ চর্চা আছে। এ কারণেই এই মহল্লার সন্তানরা বেশ শক্তিসামর্থ্যের সাথে বড় হয়। আর দারিদ্রের কষাঘাত তাদেরকে বাস্তবমুখী জীবনযাপনে অভ্যস্ত করে তুলে। ফলে এই অঞ্চলের অধিবাসীরা শৈশব থেকেই স্বাবলম্বী হয়ে বেড়ে উঠে। সততা, মানবিকতা ও নিজের প্রতি দায়বদ্ধতার দীক্ষা এই গোত্রের মানুষদের রন্ধ্রে রন্ধ্রে মিশে আছে।

ছোট্ট মুহাম্মদের উপস্থিতিতে হালীমার ঘরে উপচে পড়া বারাকাহ’র কথা খুব বেশিদিন আর গোপন থাকলো না। বনু সা’দ পল্লীতে বিষয়টি রটে যাওয়ার পর থেকে হালীমার ঘর হয়ে উঠেছে পাড়ার নারীদের মিলনকেন্দ্র। এলাকার সব মায়েরা শিশু মুহাম্মদকে কোলে নিয়ে আদর করতে উদগ্রীব হয়ে থাকে। এই বনু সা’দ পল্লীতে এর আগে মুহাম্মদের চাচা হামযাও লালিত হয়েছে। হামযাকে যে মা প্রতিপালন করেছিলেন তিনি মুহাম্মদকেও একদিন দুধ পান করালেন। বরকতের পরিধি হালীমার ঘর পেরিয়ে গোটা পল্লীতে ছড়াতে লাগলো।

দেখতে দেখতে দুই বছর কেটে গেলো। বনু সা’দের দুরন্ত বাচ্চারা সারাদিন উঠোন মাতিয়ে রাখে। কখনও কুস্তিবাজি, কখনও দৌড়ঝাঁপ, কখনও রণসাঁজের যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা। আঙিনায় খেজুরবিথীর ছায়ায় ওরা খেলাঘর গড়ে তুলেছে। দিনে টিলার চড়াই উৎরাই চষে বেড়ায়। সূর্যের পড়ন্ত ছায়া দেখে ওরা সময় গুনে, মেঘের ধাওয়া দেখে বৃষ্টির আনাগোনা আন্দাজ করে, রাতে তারাদের চিহ্ন দেখে দিক খুঁজে বের করার কায়দা শিখে। বড়রা তাদেরকে এসব শিখিয়ে দেয়। মুরুব্বীদের আসরে বসে শুনে প্রাচীন আরবের গল্পগাঁথা। পূর্ণিমার রাতে কবিতার আসর বসে। সেই আসরে বীরত্বের কাব্যচর্চা হয়, খেজুরের হালুয়া হাতে বাচ্চারা আসরে একবার হুড়মুড় করে ঢুকে পড়ে, একটু গম্ভীর হয়ে শোনার চেষ্টা করে তো আবার উঠে ছুটে বেড়ায়। নক্ষত্রভরা ছাঁদের নীচে রাত গভীর হয় কাব্যের সুরে।

দিনদিন হালীমার মন ভারী হয়ে উঠছে, মৌসুম ফুরিয়ে আসছে। আর ক’দিন পর মুহাম্মদকে ফিরিয়ে দিয়ে আসতে হবে। ছেলেটা সেই যে পিচ্চিকালে এসেছিলো, এখন কেমন ছুটে চলে! মাতিয়ে রাখে চারপাশ। আহ্লাদে দুরন্তপনা আর আদুরে বুলি দিয়ে এই কদিনেই জয় করে নিয়েছে সবার মন। কিন্তু এই বরকত ও আনন্দের দিন বুঝি শেষ হতে চললো। ভাবতেই মনের মধ্যে মোচড় দিয়ে উঠে হালীমা ও তাঁর স্বামীর।

মক্কা অভিমুখে পথ চলতে চলতে হালীমা আর হারেস আলাপ করছে, আমরা চাইলে মুহাম্মদকে আরো কিছুদিন রাখার জন্যে আমীনাকে বলতে পারি, বলল হালীমা। মাথা নেড়ে সায় দিয়ে হারেস বলল, হ্যাঁ, শহুরে পরিবেশে এইটুকুন বাচ্চা এখনও খাপ খাইয়ে নিতে পারবে বলে মনে হয়না। শহরে এখনও রোগ বালাই লেগেই আছে। ছেলেটা আরেকটু বেড়ে উঠুক না গ্রামে! তুমি আমীনাকে একটু বুঝিয়ে বললেই তিনি মানবেন। আগের মত এখন তাঁদের বাহন মক্কায় পৌঁছতে আর দেরী করেনা। সামনের টিলাটা পার হলেই মক্কার প্রবেশপথ। হালীমা দীর্ঘশ্বাস ফেলে কোলের শিশু মুহাম্মদকে জোরে আকড়ে ধরলো, এই ধন তিনি কিছুতেই হারাতে চান না।

‘আপনি হয়তো খেয়াল করেছেন, ঠিক এই বয়সটাই বাচ্চাদের দেহ-মন গড়ে উঠার আসল সময়। দেখুন বাচ্চাটা আমাদের কাছে কত সুন্দর বেড়ে উঠেছে। আরো কিছুদিন যদি গ্রামে লালিত হয় সে কিন্তু বেশ বলিষ্ঠ হয়ে ঊঠবে। তাছাড়া মক্কায় নানান রোগের প্রাদুর্ভাবের কথাও আমরা শুনেছি। একবার যদি কঠিন রোগে পেয়ে বসে তাহলে কিন্তু বিপদ হয়ে যাবে। আপনি বরং আরো কিছুদিনের জন্য তাকে আমাদের কাছে রাখতে দিন’। আমীনাকে বুঝানোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন হালীমা। বেদনার্ত মুখে আমীনা বললেন, ‘আমি খুব একা। বাচ্চাটা কাছে থাকলে আমার সময়টা ভালো কাটবে। জানি আপনারা তার দেখভালে কোনো ত্রুটি করেননি, কিন্তু আমার গোটা প্রাণস্বত্ত্বা তার কাছেই পড়ে থাকে’।

হালীমা শেষবার চেষ্টা চালিয়ে বললেন, ‘সব সিদ্ধান্ত আপনার। আপনি চাইলে মুহাম্মদ এখন থেকে তার মায়ের কাছেই থাকবে। তবে এই আকস্মিক ঘর বদল না জানি ছেলেটার কচি মনে আঘাত দিয়ে বসে, সে তার দুধ ভাইবোনের সাথে আত্মার বন্ধন গড়ে তুলেছে। হঠাৎ তাদের বিচ্ছেদ ঘটলে স্বাস্থ্য ও মনের ক্ষতি হতে পারে। তাই বলছিলাম…’ হালীমার দিকে তাকিয়ে আমীনা বললেন, ‘ঠিক আছে। সে আর কিছুদিন থাকুক আপনাদের কাছে। তবে একটু ঘনঘন বেড়াতে আনবেন, ছেলেটার এই ছোটাছুটি না দেখেই কি বড় হয়ে যাবে আমার চোখের আড়ালে?!’

আনন্দে ভাসতে থাকা হালীমা শিশু মুহাম্মদকে নিয়ে প্রায় উড়তে উড়তে ফিরতি পথ ধরলেন। জগৎ সংসারে বুঝি আজ তাঁর মত সৌভাগ্যবতী কেউ নেই। ঘরে ফিরতেই অবাক চোখে দৌড়ে এলো আনিসা আর শায়মা। কী আনন্দ! মুহাম্মদ ফিরে এসেছে!! চিৎকারে ঘর কাঁপিয়ে তুললো বাচ্চারা। বাচ্চাদের অনাবিল আনন্দ দেখে হালীমা ও হারেসের মনেও আনন্দের হিল্লোল বয়ে গেলো।

মুহাম্মদকে নতুন জামা বানিয়ে দিয়েছেন হালীমা। আব্দুল্লাহ, আনিসাকেও দিয়েছেন। ঝলমলে পোশাকে প্রজাপতির মত ছুটে বেড়াচ্ছে ওরা আঙিনায়। দূরের দিগন্তে সূর্য সবে খেজুর গাছের মাথায় চড়েছে। কয়েকটা বেদুইন চড়ুই বালিতে গোসল সারছে। আনমনে খেলতে খেলতে মুহাম্মদ একটু দূরে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়লো। তবে আব্দুল্লাহ কাছাকাছিই আছে, অন্যদের দেখা যাচ্ছেনা। মা-বাবা গৃহস্থালি কাজে ব্যস্ত, দুপুরের খাবার বানাচ্ছে।

নুড়ি কুঁড়াতে থাকা আব্দুল্লাহ’র হঠাৎ কি মনে হতেই পিছনে ফিরে তাকালো, সাথে সাথে ভয়ের শীতল একটা স্রোত নেমে গেলো তার মেরুদণ্ড বেয়ে। এক নিঃশ্বাসে দৌড়ে এলো বাড়ির পিছনে, মা সেখানে কাজ করছে। হাঁপাতে হাঁপাতে এসে বিস্ফোরিত চোখে তাকিয়ে থাকলো মায়ের দিকে। হালীমা ছেলের চেহারা দেখে ভয় পেলেন। আব্দুল্লাহ’র ফ্যাঁকাসে মুখে কথা আটকে গেছে। আমতা আমতা করে শুধু এটুকুই উচ্চারণ করতে পারলোঃ আমার কুরশী ভাই… আমার কুরশী ভাই…

ধক করে উঠলো হালীমার হৃৎপিণ্ড! বাচ্চাটার উপর এমনেও নানানজনের দৃষ্টি আছে। জিজ্ঞেস করলেন কি হয়েছে বাবা বলো আমায়! আব্দুল্লাহ একটু ধাতস্থ হয়েছে মনে হলো। বললঃ ‘দুইজন সাদা কাপড়ের লোক কোত্থেকে নেমে এসে ওকে মাটিতে শুইয়ে ফেলেছে, এরপর… এরপর… ওর বুক চিরে ফেলেছে!’ পাগলের মতো ছুটে উঠোন পেরোলেন হালীমা। চারদিকে নজর বুলাতেই একটু দূরে দেখতে পেলেন মুহাম্মদ মাটিতে বসে আছে। ভয়ার্ত নীল চেহারায় থমথমে দৃষ্টি। এক দৌড়ে তার কাছে এসে হালীমা অভয় দেয়ার ভঙ্গিতে জড়িয়ে ধরলেন। পিছনে ছুটন্ত পায়ের শব্দ শুনে বুঝলেন হারেস আসছে। ফিসফিস করে হালীমা জানতে চাইলেনঃ কি হয়েছে প্রিয়?

নিজেকে সামলে নিতে শুরু করেছে সাহসী বালক। বললঃ “আমাকে দুইজন লোক এসে মাটিতে শুইয়ে ফেলল। এরপর আমার সিনা চিরে ফেলল”। যেন মেপে মেপে কথা বলছে সে। “আমার কলিজা বের করে সেখান থেকে কিছু একটা আলাদ করে নিলো, আর বললঃ এটা সব মানুষের মধ্যে থাকা শয়তানের প্রভাব, এরপর সেটি তারা ফেলে দিয়ে স্বর্ণের একটা পাত্র থেকে বরফ-পানি নিয়ে আমার বুক আর পেট ধুয়ে নিলো। আর বলল এটা জমজমের পানি। এরপর হৃৎপিণ্ড সিনায় ভরে রেখে আবার জোড়া লাগিয়ে দিয়েছে”।

কাঁপা কাঁপা হাতে হালীমা মুহাম্মদের জামা সরিয়ে সিনার দিকে তাকালেন। সেখানে গলার নীচ থেকে নাভি পর্যন্ত সরু তরতাজা জোড়া লাগানোর চিহ্ন! হারেসের ঘর্মাক্ত চেহারার দিকে তাকিয়েও হালীমা কিছু বললেন না। এই মুহুর্তে বাচ্চাটাকে আতঙ্কিত করে তোলা যাবেনা। মুহাম্মদকে কোলে তুলে নিয়ে হালীমা বাড়ির দিকে চলে গেলেন। হারেস আশেপাশে তাকিয়ে যেন দুইজন সাদা জামার অস্তিত্ব খুঁজতে লাগলেন। জানেন কোনো লাভ নেই। বিষয়টা নিয়ে ভাবতেই দরদর করে কপাল বেয়ে ঘাম পড়তে শুরু করেছে। কারা এই লোক? বাচ্চাটাকে নিয়ে তাঁদের উদ্দেশ্যই বা কি?!

দুপুরে বাচ্চাদেরকে খাইয়ে দিচ্ছেন হালীমা। সূর্যের তাপ গলে গলে নামছে, সেই তাপে পুড়ছে হালীমা ও হারেসের কলিজা। দুজনেই কথা না বললেও জানেন এখন তাঁদের করণীয় কি! তাঁদের দায়িত্বে থাকাকালীন মুহাম্মদের কোনো ক্ষতি হোক এটা তাঁরা কখনোই চাননা। সময় হয়ে গেছে এই বরকতময় পুত্রকে আপন মায়ের কোলে ফিরিয়ে দেয়ার। মেনে নিতে খুব কষ্ট হচ্ছে, আজই এই পরিবারে মুহাম্মদের শেষ রাত্রি! এই পল্লীতে বরকতের সমাপ্তি হতে চলল হয়তো। দীর্ঘশ্বাস ফেলে কান্না আড়াল করতে বাচ্চাদের নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন আবার।

৩য় পর্ব পড়ুন এই লিঙ্কে

লেখকের অন্যান্য লেখা পড়ুন ফেসবুকে

Share this article

Leave a Reply

Your email address will not be published.