মহানবির মহান জীবন ৫

Share this article
মহানবির মহান জীবন #গল্পে সিরাত #অন্যরকম সিরাত

মায়ের মন ছটফট করছে অজানা কারণে। কোনকিছুতেই মন বসছেনা। শেষবার মুহাম্মদকে আবারো হালীমার দায়িত্বে দেয়া কি ঠিক হলো! ছেলেকে নিজের কাছে রাখাই বোধহয় ভালো ছিলো। বাচ্চাটার কিছু হলো না তো! টলমল মনে বারবার ঘরে-বাইরে আসা যাওয়া করছেন আমীনা। মাংস শুকাতে দেয়া থালাটা ছায়া থেকে রোদে সরিয়ে দিয়ে আসলেন একটু আগে। যব পিষতে বসা সুআইবাহকে তাগাদা দিলেন। দুপুর গড়িয়ে যাচ্ছে। উনুনে আগুন জ্বালতে হবে রুটি পোড়ানোর জন্যে। দরজার চৌকাঠ পেরোনোর সময় মনে হলো কারো পদশব্দ শুনতে পেলেন। নজর ফেরাতেই ধড়াস করে উঠলো বুক। হালীমা আসছেন, কোলে মুহাম্মদ। রাজপুত্রের মত স্বপ্নিল চোখে তাকিয়ে আছে মায়ের দিকে। মনে হলো সময় থমকে গেছে, দোরগোড়ায় পৌঁছতে হালীমার যেন একযুগ লেগে গেলো! কাছে আসতেই আমীনার কোলে ঝাঁপিয়ে পড়লো কলিজার টুকরো মুহাম্মদ।

পেতে দেয়া মাদুরে বসলেন হালীমা। আব্দুল্লাহকে ছেড়ে দিলেন খেলার জন্য। সুআইবাহকে খাবারের আয়োজন করতে বলে আমীনাও এসে বসলেন হালীমার পাশে। চোখে জিজ্ঞাসু দৃষ্টি, কৌতূহলী কন্ঠে বললেন, এতো দ্রুত ওকে নিয়ে বেড়াতে আসবেন ভাবিনি। এতক্ষণ প্রমাদ গুনছিলেন হালীমা। এবার বললেন, মুহাম্মদকে এখন থেকে আপনি নিজের কাছেই রাখতে পারবেন। নিজের মায়ের মমতায় সে বেড়ে উঠুক এই কামনা করছি। আমরা আমাদের দায়িত্ব পূর্ণ করেছি। খেলায় মত্ত আব্দুল্লাহ আর মুহাম্মদের দিকে তাকালেন আমীনা, কী গভীর মিতালী দুই ভাইয়ের মধ্যে! বললেন, কদিন আগেই তো আপনারা একপ্রকার জোর করেই ওকে নিয়ে গেলেন আরো কিছুদিনের জন্য। এত তাড়াতাড়ি ফিরিয়ে দিচ্ছেন যে! হালীমা নিশ্চুপ। এবার আমীনা উদ্বিগ্ন হয়ে উঠলেন। বললেন কি হয়েছে তা খুলে না বললে তো বিষয়টি আমাকে চিন্তিত করে তুলছে। উপায়ন্তর না দেখে অগত্যা হালীমা পুরো ঘটনা খুলে বললেন।

ঘটনা শুনে আমীনা মোটেই বিচলিত হলেন না। “আপনি কি ভয় পাচ্ছেন যে ওকে শয়তান কোনো ক্ষতি করবে! আল্লাহর কসম, এমনটা কখনোই হবেনা। আমি তাকে গর্ভে ধারণ করেছি, সে ছিলো একেবারেই হালকা। আর যখন সে পৃথিবীতে এলো, তার জন্ম অন্য আর দশটা বাচ্চার মত ছিলোনা। ওকে কোলে নেয়ার পর আমি একটি আলোর রেখা দেখি যা শাম পর্যন্ত পথ উদ্ভাসিত করে দিয়েছিলো। আমি জানি, আল্লাহর নিরাপত্তা বলয় তাকে ঘিরে রাখে। আমি হলফ করে বলতে পারি, ওর ভবিষ্যত খুবই উজ্জ্বল”। কথা শেষ করে হালীমার দিকে তাকিয়ে হাসলেন তিনি। সন্তান সম্পর্কে মায়ের এমন নিশ্চিন্ত ভাবনা দেখে হালীমার মন থেকে দুশ্চিন্তা উবে গেলো। তিনি আমীনার হাতদুটো নিজের হাতে নিয়ে বললেন, এর জন্য আমার চেয়ে বড় সাক্ষী আর কে আছে বলেন!

মক্কায় যেন প্রাণ ফিরে এসেছে। ফিরে এসেছে বারাকাহ। আব্দুল মুত্তলিবের হাত ধরে মুহাম্মদ প্রজাপতির মত কাবা’র চত্বরে সারাদিন ঘুরে বেড়ায়। কুলকুল বয়ে চলা জমজমের স্রোতে হাত ভিজায়, কাবা’র ইট-সুড়কি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে। বড়দের মজলিসের অদূরে বসে তাদের ভাবগাম্ভীর্য্য দেখে। কখনও আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে। মেঘেদের ডানা ঝাপটানো দেখে, সূর্যালোকের তেড়ছা ফলা মেঘের পরতে কমলা রঙ মেখে দেয়, মনে হয় যেন বাদামী উটের কাফেলা হেলেদুলে চলে যাচ্ছে। আবু কুবাইস পাহাড়ের পিছন থেকে যখন চাঁদের উদয় হয় তখন সে ভেবে আপ্লুত হয় কার ইশারায় এই চাঁদ লুকোচুরি খেলে!? বৃষ্টির সময় কিভাবে এতো সুন্দর ফোঁটা আকাশ থেকে নেমে আসে, কে পাঠায়? কেন সূর্যের এত রঙ, এত ঢঙ! ভাবতে ভাবতে বিভোর হয়ে পড়ে চিন্তামগ্ন মুহাম্মদ।

সবার সাথে লালিত হলেও সবার মত করে বেড়ে উঠছেনা শিশু মুহাম্মদ। অন্য বাচ্চারা সারাদিন ছুটোছুটি করে খেলায় মত্ত থাকলেও তার খেলার ধরণ ভিন্ন। সে বড়দের গম্ভীর বৈঠকের মনযোগী শ্রোতা। ঘটনা ও প্রকৃতির প্রতি চরম কৌতূহলী। আব্দুল মুত্তলিবের জন্য কাবা প্রাঙ্গনে যেখানে আসন পাতা ছিলো তাতে তিনি ছাড়া আর কেউ বসতে পারতো না। কিন্তু এই রাশভারী লোকটাই নাতি মুহাম্মদকে দেখলে তাঁর পাশে চাদর বিছিয়ে বসতে দেন। আর বলেন- আমার এই নাতির জন্য মর্যাদাপূর্ণ ভবিষ্যৎ অপেক্ষা করছে। মুহাম্মদ এত বেশি লাজুক যে, গায়ের কাপড় সরে গেলেও গাল লজ্জায় লাল হয়ে যায়। তার বুকের মাঝরেখায় সেলাই চিহ্নের দিকে আমীনা তাকিয়ে ভাবেন ছেলেটা শৈশব থেকেই খোদাপ্রদত্ত ফায়সালা বহন করছে। কুরাইশের ঘরে ঘরেও রটে গেছে এই ব্যবচ্ছেদ আলামতের কথা। অতি কৌতূহলী মা-খালারা কখনও দেখতে চায় সেই সেলাইচিহ্ন। গায়ের কাপড় সরাতে গায়ে হাত দিলেই মুহাম্মদ কুঁকড়ে যায়। লালাভ চেহারায় মুখ লুকায় মায়ের আঁচলে।

গোত্রের পিচ্চি বাচ্চাদেরকে ওদের বাবার সাথে ঘুরতে দেখে মুহাম্মদের মনে প্রশ্ন জাগে। মায়ের কাছে এসে জিজ্ঞেস করে, আমার বাবা কই? আমীনা ছেলেকে আদরে জড়িয়ে নেন, মাথায় বিলি কাটতে কাটতে বলেন, তোমার আব্বু আকাশের রব্বের কাছে চলে গেছেন। মৃদু কন্ঠে তিনি ঘুম পাড়ানি শ্লোক ধরেন, ঘুমের রাজ্যে হারিয়ে যায় মুহাম্মদ। স্বপ্ন আসে, সেই স্বপ্নে অনেক স্বান্তনা ও অদেখা বিষয় থাকে। জানা হয়ে যায় অনেক অজানা। আমীনা ভাবলেন, ছেলেকে নিয়ে একবার ওর বাবার কবরটা যিয়ারত করে আসা দরকার। তিনি মনস্থির করলেন সামনের সপ্তাহেই মদীনা যাবেন, নিজের পিতৃকূল ও স্বামীর কবর সেখানে। মুহাম্মদকে এখনো নানাবাড়ি ঘুরিয়ে আনা হলো না। ছেলেটার বুদ্ধি হয়েছে বেশ, কর্মতৎপরতা দেখা বুঝার উপায় নেই বয়স মাত্র ছয় বছর।

সকাল থেকেই মৃদুমন্দ সমীরণ তিরতির করে কাপাচ্ছে খেজুরবিথীর কচি পাতাগুলোকে। মরু-ঘুঘুর কলকাকলিতে অস্থির হয়ে আছে পরিবেশ। কাবা ঘিরে নিয়মমাফিক চক্কর দিচ্ছে প্রভাতের স্থানীয় পাখির দল। জমজমের পাড়ে পানির পাত্র হাতে কিশোরের জটলা গল্প জুড়ে দিয়েছে। নেতাগোছের মুরুব্বীরা গোল হয়ে বসেছে কাবা’র আঙিনায়। ছাগলের দুধে ভরা পাত্রে আগুন-পোড়া পাথর ঢালছেন একজন, আরেকজন হাতের লাঠি দিয়ে দূরের পাহাড়ের দিকে দেখিয়ে বাকীদের সাথে কি এক বিষয়ে আলাপ করছেন। উম্মে আয়মানকে গতরাতে সবকিছু গুছিয়ে নিতে বলেছেন আমীনা। সূর্য তেতে উঠার আগেই সফরে বেরিয়ে পড়তে হবে। গন্তব্য ইয়াসরিব। মাতৃকূলের জমিতে শুয়ে আছেন তাঁর প্রাণপ্রিয় পুত্রের পিতা। ছেলেকে বাবার কবর দেখাবেন। সাক্ষাৎ করাবেন মামা-খালাদের সাথে। মনের আঙিনাজুড়ে অচিন শিহরণ বয়ে গেলো আমীনার।

আব্দুল মুত্তলিব পুত্রবধূ ও নাতিকে বিদায় দিলেন। তিনজনের কাফেলা আঁকাবাঁকা পথ ধরে বেরিয়ে গেলো মক্কার চৌহদ্দি থেকে। এক বুক স্বপ্ন নিয়ে আব্দুল্লাহ’র সাথে আমীনার বিয়ে দিয়েছিলেন। ফুটফুটে একটা বাচ্চাও হলো। কিন্তু নিজপুত্রকে দেখার ভাগ্য হলোনা আব্দুল্লাহ’র। একদিন এভাবে তিনি আব্দুল্লাহ’কেও বিদায় দিয়েছিলেন। বুকের ধন আর ফিরে আসেনি। আব্দুল মুত্তলিব কি জানে আমীনাও আর ফিরে আসবেন না? চলে যাবেন আব্দুল্লাহ’র কাছে। মুহাম্মদকে সম্পূর্ণ একা করে দিয়ে! বিদায়ের ঘটনাগুলো দেখতে প্রায় একই রকম হয় কেন?!

লেখাঃ সাঈদুল মোস্তফা

পর্ব ৪

Share this article

Leave a Reply

Your email address will not be published.