মহানবির মহান জীবন ১২

Share this article
মহানবির মহান জীবন গল্পসিরাত অন্যরকম সিরাত

কিছু বুঝে উঠার আগেই ইয়েমেনী বালকটি উকাযের দাসবাজারে চারশ দেরহামে বিক্রি হয়ে গেল। বালকটি সহ আরো কিছু দাস সমেত হাকেম ইবনে হিযাম মক্কায় ফিরে আসল। সংবাদ পেয়ে হাকেমের ফুপী খাদীজা ভাতিজার বাড়িতে গেলেন। তাঁকে দেখে হাকেম বলল, ফুপী, এদের মধ্য থেকে যাকে ইচ্ছা আপনি আপনার জন্যে নিয়ে যান। খাদীজা আট বছর বয়সী ছেলেটিকে দেখে মিষ্টি করে হাসলেন। মায়াবী চেহারা। এগিয়ে এসে মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন, তোমার নাম কি? ‘আমি যায়দ’ বলেই মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকল ছেলেটি। খাদীজা এবার যায়দকে হাতে ধরে বাড়িতে ফিরে আসলেন। যখন তিনি যায়দকে গোসল করিয়ে পরিপাটি করে সাজিয়ে দিচ্ছিলেন। ঠিক তখনই খাদীজার আরেক দায়িত্বশীল মায়সারা খুশির খবর নিয়ে প্রবেশ করল।

.

তিন তিনবার বিয়ের পর খাদীজার কোন স্বামীই বেশিদিন বাঁচেনি। প্রত্যেকেই ছিল ধনাঢ্য ব্যবসায়ী। ফলে বিপুল পরিমাণ সম্পত্তির মালিক হয়ে যান খাদীজা। বিচক্ষণ এই নারী সেই সম্পদকে কাজে লাগাচ্ছেন। মক্কার বিশিষ্ট ব্যবসায়ীদের সাথে অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে সম্পদ বৃদ্ধি করছেন। তিনি মক্কার গরীব দুঃখীদের জন্য অকাতরে খরচ করে থাকেন। এদিকে উদীয়মান তুখোড় ব্যবসায়ী হিসেবে মুহাম্মদের নাম খাদীজার কানে গেলে তিনি তাঁর সম্পর্কে খোঁজ নিতে পাঠিয়েছিলেন মায়সারাকে। মায়সারা জানালো মুহাম্মদ সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি, তাঁর বিশ্বস্ততা, সত্যবাদিতা ও আমানতদারিতার কথা সর্বজনবিদিত। এ পর্যন্ত যত ব্যবসায় হাত দিয়েছেন প্রত্যাশার চেয়ে বেশি মুনাফা নিয়েই ফিরেছেন। সব শুনে খাদীজা মুচকি হাসলেন। যায়দের দিকে ইশারা করে বললেন, ছেলেটাকে ওর থাকার ঘর দেখিয়ে দাও। সে ইয়েমেনের বনেদি বংশের ছেলে, ওর যত্ন নিও। আর কাল-পরশু মুহাম্মদের কাছে আমার পক্ষ থেকে ব্যবসার প্রস্তাব নিয়ে যেও। আমার মন বলছে তিনি আমাদের জন্য বারাকাহ’র চেয়েও বেশি কিছু নিয়ে আসবেন।

.

অনুমতি নিয়ে চাচার ঘরে প্রবেশ করলেন মুহাম্মদ (সঃ)। চাচার হাতে চুমু খেয়ে পাশে বসলেন। কুশল বিনিময় শেষে চাচার দিকে অপলক চেয়ে রইলেন মুহাম্মদ। এ মানুষটাই তাঁকে শৈশব থেকে আগলে রেখেছেন। আবু তালিব বুঝতে পারল ভাতিজা কিছু বলতে চায়। তিনি বললেন, তুমি কি হিজাযের বাহিরে বাণিজ্য সফর নিয়ে কিছু ভাবছ? চাচার দূরদর্শিতা সবসময় তাঁকে চমকিত করে। মুহাম্মদ বললেন, হ্যাঁ! আমার কাছে একটি প্রস্তাব এসেছে সিরিয়ায় বাণিজ্য কাফেলা নিয়ে যাওয়ার। তাই আপনার পরামর্শ নিতে এসেছি। আবু তালিব অবাক হলেন না। মুহাম্মদের মধ্যে যোগ্যতার যে বিচ্ছুরণ তিনি দেখেন, যেকেউ তাঁকে ব্যবসার ভাগীদার করতে চাইবে। মৃদু শব্দে জানতে চাইলেন, কার প্রস্তাব? চাচার দিকে ভালোভাবে ফিরে বসে মুহাম্মদ বললেন, খুওয়াইলিদের কন্যা খাদীজা। তাঁর ভৃত্য মায়সারা এসেছিল প্রস্তাব নিয়ে। আমি বলেছি আপনার সাথে পরামর্শ করে জানাবো। এবারে বেশ অবাক হলেন আবু তালিব। বললেন, খাদীজা তো খুব উচ্চ বংশীয় নারী। সফল ব্যবসায়ী, বিচক্ষণ আর গরীব দুঃখীদের আশ্রয়। তাঁর মত মানুষের সাথে ব্যবসার প্রস্তাব পাওয়া খুবই ভাগ্যের ব্যাপার। তুমি রাজী হয়ে যাও। আশা করি এই যাত্রা তোমার জন্যে কল্যাণ বয়ে আনবে।

.

সাথীদের জন্য অপেক্ষা করছেন মুহাম্মদ। মেষগুলো খোঁয়াড়ে রেখে এসে সন্ধ্যার পূবালী হাওয়ায় বসে আছেন খেজুরবিথীর নিচে। সাথীরা পারিশ্রমিক আনতে গিয়েছে এই মাসের। তিনি কখনও নারীদের সাথে কথা বলেন না। তাঁর ভীষণ লাজুক হওয়ার বিষয়টি মক্কার সকলেই জানে। তাই তাঁর পারিশ্রমিকটাও সাথীরা নিয়ে আসে। ডুবে যাওয়া সূর্যের আভার উপর ঝুলতে থাকা অন্ধকারে নতুন মাসের চাঁদ চিকচিক করছে। নক্ষত্রের রাতে আসমান খুব বাকপটু হয়ে যায়। মিটিমিটি তারাগুলো একে অপরের সাথে খোশগল্পে মেতে থাকে রাতভর। আগামীকালই মায়সারার খোঁজ করতে হবে। সিরিয়া সফরের জন্য এই সময়টাই উপযুক্ত। সেই শাম! শৈশবে দেখা সেইসব দৃশ্য চোখের সামনে ভেসে উঠল তাঁর। একটু পর সাথীদের এগিয়ে আসার শব্দে ভাবনায় ছেঁদ পড়ল। সূর্যের রেখে যাওয়া তপ্ত বালি ভেদ করে সবাই বাড়ির পথ ধরল।

.

শামের উদ্দশ্যে যাত্রাকালে আবু তালিবের কাছে বিদায় নিতে এসেছে মুহাম্মদ (স)। নিজ অভিজ্ঞতার ঝুলি থেকে চাচা অনেককিছুই জানালেন। আবু তালিবের মনের ঈশান কোণে আশঙ্কার বাষ্প জমে আছে। বারবার কানে বাজছে মুহাম্মদের শৈশবে শাম সফরে পাদ্রী বাহীরার সেই সতর্কবাণী- এই ছেলেকে ইহুদীরা পেলে ক্ষতি করতে পারে। এখন ইহুদিদের অভয়ারণ্য সেই শামেই একাকী সফরে যাচ্ছে মুহাম্মদ। প্রাণপ্রিয় ভাতিজার কপালে চুমু এঁকে দিয়ে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিলেন তিনি। বিদায় সম্ভাষণে আলিঙ্গন করে এগিয়ে দিতে আসলেন মক্কার প্রবেশ পথে। সেখানে পণ্যের কাফেলা নিয়ে অপেক্ষা করছে খাদীজার প্রতিনিধি মায়সারা। চাচার দেয়া প্রিয় উটে চড়ে বসলেন মুহাম্মদ। সামনেই হাতছানি দিয়ে ডাকছে ধূসর মরুপ্রান্তর। যৌবনের উচ্ছ্বল সময়ের প্রথম বিদেশযাত্রা। হৃদয়ে নানান ভাবনা আর রোমাঞ্চকর অনুভূতি। বাতাসে তিরতির করে কাঁপছে নবীন শ্মশ্রু। কাঁধের চাদরটা জুতমতন জড়িয়ে নিলেন। উট হাঁকানোর আরব্য নিয়মে আওয়াজ তুললেন তিনি। সে আওয়াজ শিষ কেটে প্রতিধ্বনিত হলো দুই পাশের পাহাড়ে। শামের পথে ছুটে চলল এক মোবারক কাফেলা।

‘আখেরাতের নবী’ সিরাতের সব পর্বের লিংক একসাথে

পর্ব ১ – https://wp.me/pd9hWS-j8

পর্ব ২ – https://wp.me/pd9hWS-jb

পর্ব ৩ – https://wp.me/pd9hWS-mx

পর্ব ৪ – https://wp.me/pd9hWS-mJ

পর্ব ৫ – https://wp.me/pd9hWS-nB

পর্ব ৬ – https://wp.me/pd9hWS-nZ

পর্ব ৭ – https://wp.me/pd9hWS-pw

পর্ব ৮ – https://wp.me/pd9hWS-py

পর্ব ৯ – https://wp.me/pd9hWS-pA

পর্ব ১০ – https://wp.me/pd9hWS-pC

Share this article

Leave a Reply

Your email address will not be published.