মহানবির মহান জীবন ৮

Share this article
মহানবির মহান জীবন #গল্পসিরাত #অন্যরকম_সিরাত

জরাজীর্ণ কুটিরের দরজাটা দিনের বেলা কখনও লাগানো হয়না। শুকনো পাতার তোষকের উপর বসে পথের দিকে আনমনে চেয়ে আছে বাহীরা পাদ্রী। গত কয়েক মাস সে ঘোরের মধ্যে দিনাতিপাত করছে। তাওরাত ও ইনজিলের যে অধ্যায়গুলোর ছিটেফাটা অক্ষুণ্ণ আছে এর সবচেয়ে জটিল অংশটা তাঁকে দুশ্চিন্তায় ফেলে দিয়েছে। আরব থেকে আগত প্রতিটি কাফেলার উপর তাঁর দৃষ্টি আঠার মত লেগে থাকে। দরজার ফাঁক দিয়ে উন্মুক্ত চরাচরের দিগন্তবিস্তৃত সীমানা নজরে পড়ে। কয়েক মাইল দূরত্ব থেকেই কাফেলাগুলোর অবয়ব দেখার দৃষ্টিশক্তি তাঁর এখনও বলবত আছে। দরজা দিয়ে টুপ করে ঢুকে পড়া দিনের আলোয় সে ইনজিলের হরফগুলোর উপর আঙ্গুল বুলাচ্ছে। ভাবছে, তিনি দেখতে কেমন? আসলেই কি সময় ঘনিয়ে এসেছে? যতবার অত্যাসন্ন নবীর কথা ভাবে, শিরদাঁড়ায় শিহরণের ঢেউ বয়ে যায়।

.

মরুজগত বড্ড রহস্যময়। ক্ষণে ক্ষণেই চারপাশের চিত্র বদলে যায়। এই পাথুরে জমিন তো এই ঢলঢলে বালুচর। ঢিলে বালুর পাটাতনে উটের গতি মন্থর হয়ে আসে। হাতছানি দিয়ে তাকালে অদূরেই দেখা মিলে মরূদ্যানের। সেখানেই একটু জিরাচ্ছে আবু তালিবের কাফেলা। এখানে উটগুলোকে বাধার দরকার পড়েনা। জলাধার পেয়ে তারা তৃষ্ণা মেটাতে ব্যাকুল। একটা বাবলা গাছের ছায়ায় বসে খেজুরের ঝোলা খুললেন আবু তালিব। মুহাম্মদের হাতে দুটি খেজুর তুলে দিয়ে বললেন, প্রায় পৌঁছে গেছি বাবা। সামনেই সরাইখানা পাবো, সেখানে পেট ভরে খাবে। আড়চোখে মুহাম্মদের দিকে তাকিয়ে ভাবছেন, এই কচি বয়সেও ছেলেটার মধ্যে কত দম! পাঁচ-ছয়দিনের টানা সফরেও মোটেই কাহিল হয়নি। তাতানো সূর্যের ধারালো রশ্মি পুড়িয়ে দিচ্ছে গায়ের চামড়া। আলখেল্লাটা আরো আঁটসাঁট করে জড়িয়ে নিলেন তিনি। মুহাম্মদের চুল থেকে ধুলি ঝাড়তে ঝাড়তে বললেন, চল সবাই আবার রওয়ানা দিই।

.

ফকফকা রোদের কোল থেকে এক টুকরো কালো মেঘ বের হয়ে আসতে দেখে হকচকিয়ে গেল বাহীরা। দূর দিগন্তে কেবল এই এক টুকরো গোলাকার মেঘ, শম্বুক গতিতে এগিয়ে আসছে। অথচ বাতাস বইছে উল্টো দিকে। বুড়ো চোখের অভিজ্ঞ দৃষ্টি দিয়ে চারপাশের পরিবর্তন টের পেতে শুরু করল সে। ছুটে বের হতে গিয়ে কুপিতে পা লেগে গেল, কাত হয়ে তেল গড়াতে শুরু করেছে, কিন্তু সেদিকে ভ্রূক্ষেপ করার বালাই নেই বাহীরার। ভালো করে তাকিয়ে দেখল দৃষ্টির সীমানায় ধুলো উড়িয়ে এগিয়ে আসছে একটি কাফেলা। এ যে আরব্য কাফেলা তাতে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই। আরবী উটের উচ্চতা আলাদা করেই চোখে পড়ে। পথের ধারের ছোট্ট ঢিবির গায়ে হেলান দিয়ে এদিক-ওদিক সন্তর্পনে নজর রাখতে শুরু করল পাদ্রী। সেবককে ডেকে বলল বড়সড় খাবারের আয়োজন করতে। মেঘ যতই এগিয়ে আসছে আশেপাশের গাছগুলোও কেমন যেন বাঙময় হয়ে উঠছে। কাফেলার চৌহদ্দি থেকে মেঘের ছায়া সরছেই না।

.

সরাইখানার উঠোনে উট থামতেই হন্তদন্ত হয়ে এক বৃদ্ধ সন্যাসী ছুটে এলো আবু তালিবের কাফেলার দিকে। আবু তালিব নিজেই এগিয়ে গিয়ে বৃদ্ধকে ধরলেন। কুশল বিনিময় করতে করতে সরাইখানার দিকে চললেন। সন্যাসী কাঁপাকাঁপা স্বরে বলল, আমি বাহীরা, আপনি আজ আমার এখানে মেহমান হোন। অতিথিদের আপ্যায়ন বড়ই পুণ্যের কাজ। আমাকে এই সুযোগটা দিন। আবু তালিব অবাক হলেও সম্মতি জানিয়ে মাটির চৌবাচ্চার দিকে এগিয়ে গেলেন। সাধারণত পাদ্রীরা নিজেরাও কারো খাবার খায় না, অন্যকেও আপ্যায়ন করেনা। হাতমুখ ধোয়ার সময় সফরসঙ্গীদের একজনকে বললেন কাফেলা প্রহরার দায়িত্বে থাকতে। সেখানে মুহাম্মদ আছে। ওকে দেখে রাখতে। পরিচ্ছন্ন হয়ে বাকি সফরসঙ্গীদের নিয়ে তিনি বাহীরার কুটিরের দিকে পথ ধরলেন। এতক্ষণে পাদ্রীর কুটিরটি ভালোভাবে খেয়াল করলেন তিনি। বনেদি ধাঁচের প্রাচীন কুটিরটি সময়ের ছাপ বহন করছে। ভিতরে প্রবেশ করতেই চোখে পড়লো সাজিয়ে রাখা খাবারের দস্তরখান। ক্ষুধার্ত আব্দুল মুত্তলিব খাবারের পাশেই বসে পড়লেন। বাহীরার চকিত চাহনি উপস্থিত সবার উপর ঘুরে এসে নিবদ্ধ হল আবু তালিবের দিকে। বলল, আপনাদের কাফেলার আরো কেউ বাকি আছে সম্ভবত। আমি আশা করি আপনাদের সকলেই আমাকে মেহমানদারির সৌভাগ্য লাভ করতে সহায়তা করবেন। আবু তালিবের ইশারায় একজন উঠে চলে গেলেন মুহাম্মদকে আনতে।

.

গা ছমছমে কুটিরে প্রবেশ করার আগে মুহাম্মদ বুঝতে পারল এটি সাধারণ কারো বাসস্থান না। ভিতরে ঢুকতেই চাচাকে দেখতে পেল। সহাস্যে বাহীরা তাঁকে বরণ করে নিয়ে নিজের পাশে বসালো। আবু তালিবের কাছে জানতে চাইলো, ও আপনার কি হয়? আবু তালিব জানালেন, আমার বেটা। মাথা ঝাঁকিয়ে বাহীরা বলল, এ সম্ভব নয়। এবার আবু তালিব বললেন, ও আমার ভাইয়ের সন্তান। বাহীরা বলল, ওর বাবার কি হয়েছে? আবু তালিবের উত্তর, ও গর্ভে থাকতেই আমার ভাইয়ের মৃত্যু হয়েছে। মুহাম্মদের মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে বাহীরা তাঁর পিঠে উঁকি দিতেই শক্ত হয়ে গেল। ঠিক সেই অনুভূতি! কিতাবে ভবিষ্যত নবীর চিহ্নগুলো পড়ার সময় তাঁর যেমনটা হতো! নিশ্চিত এই ছেলেই সেইজন! ইনিই প্রতীক্ষিত নবী! গোটা ব্যাপারটা সবার অলক্ষ্যেই ঘটলো। সবকিছু চেপে রেখে বাহীরা আবু তালিবকে জানাল, যত দ্রুত সম্ভব বাচ্চাটিকে নিয়ে ফিরে যাওয়ার চেষ্টা করুন। তাঁর ভবিষ্যত খুবই সুমহান। এমন কারো দেখা পেলে ইহুদিরা সুযোগ নিতে চাইবে। আপনাদের যাত্রা নিষ্কণ্টক ও নিরাপদ হোক।

.

মনে একরাশ প্রশ্ন নিয়ে আবু তালিব কাফেলা ছুটালেন বসরার দিকে। বুকে চেপে ধরেছেন প্রিয় ভাতিজাকে। যেন বন্ধন আলগা করলেই কেউ তাঁকে ছিনিয়ে নিয়ে যাবে। ঘোরলাগা দুশ্চিন্তায় বাকি পথটুকু তিনি পার করলেন। বসরায় নামমাত্র মূল্যে সব পণ্য বিক্রি করে কালবিলম্ব না করেই ফিরতি পথ ধরলেন তিনি। আগুনঝরা রোদ কিংবা সফরের ক্লান্তি উপেক্ষা করেই তীরের বেগে চলতে লাগলেন। কোন ধরণের যাত্রাবিরতি ছাড়াই। ধুলোর আস্তরণে ঢেকে যাচ্ছে পথের দুইধার। দমকা হাওয়ায় উড়ছে মুহাম্মদের রেশমি চুল। তাঁর কানে ফিসফিস করে আবু তালিব বললেন, মক্কায় ফিরছি বেটা। তোমার সেই জমজম পাড়ে। বন্ধুরা সবাই তোমার অপেক্ষায়। তুমি অনেক বড় হও বাবা। তোমার চাচা তোমাকে ভীষণ ভালোবাসেন। শুধুই কি বসরা, তুমি একদিন আরো বহুদূরে যাবে। বহুদূর… যেখানে তোমার পৃথিবী ছাড়িয়ে যাবে সবার বিশ্বকে।

পর্ব ৭ পড়ুন

সাঈদুল মোস্তফা

Share this article

Leave a Reply

AllEscort