মহানবির মহান জীবন ২

Share this article
মহানবির মহান জীবন গল্পসিরাত অন্যরকম সিরাত

জড়সড় হয়ে ঘুমিয়ে থাকা মুহাম্মদের দিকে মায়াভরা চোখে তাকিয়ে আছেন আমিনা। বাচ্চাটার কাছে গেলেই মিষ্টি একটা অচিন সুরভি পাওয়া যায়।[1] খেজুর পাতায় ছাওয়া ঘরের ছাউনী গলে চাঁদের কিরণ নামছে। সে আলোয় দেখা গেল ছোট্ট মুহাম্মদ ঘুম থেকে জেগে উঠে চোখ পিটপিট করছে। তার টানাটানা চোখজুড়ে এক জগত মায়া।[2] আমিনা দেখেন আর অভিভূত হন। মুহাম্মদের ডিম্বাকৃতির মুখের ফ্রেমে ঘনকালো পাপড়ি ঘেরা বড় বড় মায়াভরা চোখ।[3] উজ্জ্বল বাদামী রঙের ত্বকে রক্তিম আভা।[4] চওড়া কাঁধের কাঠামোতে তার মাঝারি গড়ন তাকে সুঠাম দেহাবয়ব দিয়েছে।[5] সেই চওড়া কাঁধের মাঝখানে পিঠ বরাবর ঘুঘুর ডিম সদৃশ একটা বড় মাংসল তিল; সেখানে অতিরিক্ত কিছু লোমের গোছা, যার রঙ স্বাভাবিক রঙের চেয়ে একটু আলাদা।[6] আমিনা তাঁর সন্তানের প্রশস্ত কপালের[7] উপর চুলে হাত বুলিয়ে দেন। চুলগুলো কোঁকড়ানো না, আবার একদম সোজাও না।[8] চমৎকার প্রকৃতির। মখমলের মত তুলতুলে পুরুষ্ট হাত[9] দুটো নেড়ে নেড়ে খেলছে। সেই হাতে চাঁদের রশ্মি পড়ে তৈরি করেছে এক অপার্থিব আলপনা।

লোকালয়ের অদূরে যেখানে হস্তী বাহিনী অবস্থান নিয়েছিলো, নাস্তানাবুদ হয়েছিলো- জায়গাটায় এখনও ভূতুড়ে ছমছমে পরিবেশ। এখানে ওখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে আগ্রাসী বাহিনীর ধবংসস্তুপ, অপসৃয়মান কঙ্কাল। যে হাতিগুলো আনা হয়েছিলো এদের মলগুলোও এখনো মাটিতে মিশে যায়নি পুরোপুরি। কুবাস ছেলেটা সারাদিন মক্কার আনাচে কানাচে ঘুরে, মাঝে মধ্যে মায়ের কোলে চড়ে এদিকেও চলে আসে।[10] আর মন ছুটলেই সে চলে যায় মুহাম্মদকে দেখতে। বাচ্চাটাকে যে এত্ত মায়া লাগে তার, এসেই মুহাম্মদের সাথে খেলায় মেতে উঠে। আবার কখনও ঘুরে বেড়ায় ‘আবতাহ’ বাজারে।[11] ঘুরাঘুরির ফাঁকে মুহাম্মদের কথা মনে পড়লেই আবার ছুটে আসে দেখতে। মাঝে মধ্যে কুবাসের সাথে অন্য ছেলেরাও দলবেঁধে ঘুরে আর মুহাম্মদকে দেখতে আসে।

মক্কায় সাড়া পড়ে গিয়েছে, আব্দুল মুত্তলিবের নাতি হয়েছে। প্রতিদিন কেউ না কেউ আসছে দেখতে। যেই আসে-দেখে মোহাবিষ্ট হয়, ছোট্ট মুহাম্মদের সৌন্দর্য আর গড়নের প্রশংসা না করে পারেনা। নামটাই যার প্রশংসিত, তাঁর সুনাম না করে কি পারা যায়!? মক্কার আরো ঘরেও বাচ্চা হয়েছে। কিন্তু কী এক অমোঘ আকর্ষনে সবাই মুহাম্মদকে দেখতে আসার অজুহাত খোঁজে। তার বাবা আব্দুল্লাহও সুন্দর রূপের অধিকারী ছিলো। সে মক্কার রমণীদের ছিলো স্বপ্নের পুরুষ।[12]

লোকটা জমজম থেকে পানি সংগ্রহ করছিলো, সবেমাত্র সূর্যটা দাপট দেখাতে শুরু করেছে। পানি নেয়ার ফাঁকে দূর দিগন্তে নজর পড়তেই দেখা গেলো আট-দশটি উটের কাফেলা এদিকেই আসছে। এরকম কোনো আগন্তুক দলের আগমন ঘটলে মক্কায় ঘোষণা দেয়ার দায়িত্ব তার।[13] ভালো করে কিছুক্ষণ নিরীক্ষণ করে নিল লোকটি। এরপর এক দৌড়ে কা’বা চত্বরে গিয়ে ঘোষণা দিলো- মক্কার অতি নিকটেই একটা মাঝারি আকারের কাফেলা দেখা দিয়েছে। সম্ভবত তাদের বিরতি কিংবা গন্তব্য আমাদের লোকালয়। ঘোষণা শুনে লোকজন এবার উঁকিঝুঁকি দিয়ে দেখার চেষ্টা করতে লাগলো ঘটনা কি? মৌসুমের এই সময়ে তেমন কেউ তো আসার কথা না। তবে এ বছর বেশ খারাপ সময় যাচ্ছে হিজায অঞ্চলে। প্রায় দুর্ভিক্ষ বলা চলে। এ কারণেই হয়তো কোনো সাহায্যপ্রার্থী কাফেলা আসছে।

কাফেলা মক্কায় উপনীত হতেই লোকজন তাদেরকে এগিয়ে নিয়ে এলো, পানি এগিয়ে দিলো, খেজুর এগিয়ে দিলো। এটাই মক্কার আতিথেয়তার আদি রীতি। এবার কাফেলার সকলকে চেনা গেলো। এরা প্রতি মৌসুমেই আসেন। মক্কার নবজাতকদের দায়িত্ব নিয়ে নিজেদের গ্রামীণ মফঃস্বলে নিয়ে যাওয়ার জন্য। সেখানেই মক্কার সম্ভ্রান্ত পরিবারের সন্তানরা বেড়ে উঠে স্বাস্থ্যকর পরিবেশে। লালিত হয় বিশুদ্ধ ভাষার আঙিনায়। গড়ে উঠে পরিবেশের সাথে খাপ খাওয়ার স্বভাব। বিকশিত হয় মেধা ও মনন। প্রকৃতির সান্নিধ্যে তাদের মধ্যে জন্ম নেয় মানবিকতা ও নৈতিকতার সরল বৈশিষ্ট্য।

খোঁজখবর নিয়ে আগত মহিলারা ঘরে ঘরে গিয়ে কথাবার্তা বলছে। নবজাতকের লালনপালন ও দুগ্ধপোষ্যের দায়িত্ব বুঝে নিয়ে নতুন অতিথিকে সাথে করে ফিরে যাচ্ছে অস্থায়ী তাঁবুতে। এখানে তারা আজ রাত অবস্থান করবে। বাচ্চা নির্বাচনের ক্ষেত্রে ওদের মাথায় কিছু হিসেব নিকেশ কাজ করে, যেমন শুধু লালন পালনের বিনিময় না, সেইসাথে উপরি কিছু বকশিশও তারা আশা করে। এজন্য তাদের মূল লক্ষ্য থাকে সন্তানের পিতা; বাচ্চার বাবারাই সবসময় খুশি হয়ে হাত ভরে বকশিশ দেয়। মোটামুটি যে ক’জন বাচ্চা নবজাতক ছিলো প্রায় সবারই হিল্লে হয়ে গেছে। আমিনার ঘরেও বেশ ক’জন এসেছিলো। কথাবার্তা বলে হাল-হাকিকত জেনে ফিরে গেছে। মাথার উপরের সূর্য পশ্চিমে হেলে পড়েছে। খেজুরের কলিতে ভ্রমর উড়ছে, মাটিতে ঝরে পড়া অপরিপক্ক খেজুরগুলো খুঁটে খুঁটে খাচ্ছে উড়ন্ত পাখি। কলকাকলিতে ভরে আছে খেজুরতলা।

পিচ্চি ছেলেটা দৌড়াতে দৌড়াতে এসে বলল- দুইজন আরোহী সহ আরেকটা বাহন দেখা গেছে খুব ধীরে ধীরে এদিকে আসছে। মনে হচ্ছে তারা বেশ ক্লান্ত। সবাই এবার ভালো করে খেয়াল করে দেখলো কথা সত্য। হালকা ধূলোর ঢেউ তুলে একটা বাহন মক্কার প্রবেশপথে এসে পড়েছে। ক্ষণিক বাদে দেখা গেলো এক মহিলা তাঁর স্বামীর সাথে নেমে এলেন। সাথে একটা কোলের শিশুও আছে। তাঁকে অনেকেই চিনতে পারলো। এ তো বনু সা’দ গোত্রের হালীমা সা’দিয়াহ! তিনি জানালেন লালন পালনের জন্য নবজাতকের দায়িত্ব নিতে এসেছেন। জিজ্ঞেস করলেন, এমন কোন নবজাতক শিশু বাকী আছে কি? কয়েকজনের সাথে কথা বলে জানা গেলো আব্দুল মুত্তলিবের নাতি হয়েছে কিছুদিন হলো। তাকে এখনো কেউ নেয়নি। হালীমা স্বামীকে নিয়ে সেদিকে রওয়ানা হলেন। দূরে একদল কিশোর খেজুর গাছ লক্ষ্য করে পাথর ছোড়াছুঁড়ি খেলছে।

যে মহিলারা বাচ্চা নিতে এসেছিলো সবাই যে যার মত বাচ্চা নিয়ে তাঁবুতে চলে গেছে। আজ রাতটা তারা দেখবে সাথে আনা বাচ্চাগুলো কেমন খাপ খায় নতুন মায়ের সাথে। আমিনার কোলে শিশু মুহাম্মদ হাত-পা ছুঁড়ছে, তিনি মাটিতে বসে ভাবছেন, ভালোই হলো। মুহাম্মদকে তিনি চোখের আড়াল করতে চান না। কোন মা-ই বা চাইবে এমন! কিন্তু সন্তানের স্বাস্থ্যকর ভবিষ্যতের জন্য না দিয়েও উপায় নেই। চিন্তার বিষয় হলেও মনে মনে খুশি তিনি। তাঁর একমাত্র বুকের ধন তাঁর কোলেই বড় হোক… আমিনার ভাবনায় ছেঁদ পড়লো একজন নারীর সম্বোধনে। দরজায় তাকিয়ে দেখেন একজন মহিলা। ভেতরে আসার অনুমতি দিলে হালীমা এসে আমিনার পাশে বসলেন। টুকটাক কুশল বিনিময় চলছিলো কিন্তু হালীমার চোখ সেঁটে আছে মুহাম্মদের আপার্থিব সুন্দর চেহারায়। চোখ ফেরানো যায়না। অদ্ভুত একটা আকর্ষণ আছে শিশুটার মধ্যে। তিনি বাচ্চার বাবা কোথায় জানতে চাইলেন, বললেন- আমি পৌঁছতে দেরী করে ফেলেছি। এসেছিলাম কোনো নবজাতক পাই কিনা দেখতে। আমি বনু সা’দ গোত্রের হালীমা। মক্কার অধিকাংশ লোকই আমার গোত্রকে ভালো করে চিনে।

মুহাম্মদ এতিম এ কথা জানার পর হালীমা দ্বিধায় পড়ে গেলেন। এমনিতেই বড্ড মন্দা চলছে এ বছর। তার উপর হালীমার পরিবারের পরিস্থিতি সংকটময়। তিনি আশা করছিলেন স্বাভাবিক বিনিময়ের পরেও কিছু উপরি উপহার পাবেন। কিন্তু বাচ্চার যদি বাবাই না থাকে তাহলে সে আশার গুঁড়ে বালি ছাড়া আর কিছু নেই। কিন্তু বাচ্চা ছাড়া লোকালয়ে ফিরলে হাসির পাত্র হতে হবে। এছাড়া বাড়তি সুবিধা না পেলেও কোনরকম চলে যাওয়ার মত উপার্জন তো অন্তত হবে। স্বামীর সাথে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত হলো মুহাম্মদকে তাঁরা সাথে করে নিয়ে যাবেন।[14] আমিনাকে তাঁদের সিদ্ধান্তের কথা জানাতেই মায়ের চেহারায় নেমে আসলো কালো মেঘ। অগত্যা মনের কষ্ট চাপা দিয়ে তিনিও রাজী হলেন মুহাম্মদকে হালীমার হাতে তুলে দিতে। সবকিছু যখন গুছিয়ে দিচ্ছিলেন তখন তাঁর অশ্রুফোঁটা টপটপ করে পড়ছিলো মুহাম্মদের কাঁথা-চাদরে। দীর্ঘশ্বাস চেপে রেখে তিনি অনেক্ষণ ধরে চুমু খেলেন প্রিয় সন্তানকে। বারবার শুঁকছিলেন আর জড়িয়ে ধরছিলেন প্রিয় পুত্রকে। সন্তানের ছোট ছোট হৃদস্পন্দন মিশে যাচ্ছিলো মায়ের বুকভাঙ্গা স্পন্দনে।


[1] মুসলিমঃ ২৩৩১। উক্ত হাদিসে রাসূলুল্লাহর (স) ঘামকে সুগন্ধি সাহাবীরা হিসেবে সংরহ করতেন বলে বর্ণনা আছে।

[2] শামায়েলে তিরমিযি, হাদিস নং ৭/৮, মুসলিমঃ ৯৭/২৩৩৯, হাদিসে রাসূলুল্লাহর (স) চোখ টানাটানা বলা হয়েছে।

[3] শামায়েল, হাদিস নং ৭/৮, মুসলিমঃ ৯৭/২৩৩৯, আহমদঃ ৫/৮৮-৯৮-১০৩, ইবনে হিব্বানঃ ৬২৮৮।

[4] শামায়েলে মুহাম্মদীয়া, তিরমিযি, হাদিস-২/২, আবু দাউদঃ ৪৮৬৩।

[5] শামায়েলে মুহাম্মদীয়া, তিরমিযি, হাদিস-১, বুখারীঃ ৩৫৪৭-৪৭, মুসলিমঃ ২৩৪৭।

[6] আহমদঃ ৫/৭৭, ৩৪১। শামায়েল তিরমিযিঃ ১৯/২১। মুসলিমঃ ১১২/২৩৪৬, নাসাঈ’র তাফসীর অংশঃ ৫১৬। এসব হাদীসের সম্মিলিত বয়ান।

[7] শামায়েলে তিরমিযিঃ হাদিস নং ৬/৭।

[8] তিরমিযিঃ ৩৬২৩।

[9] তিরমিযিঃ ৩৬৩৭, আহমদঃ ১/৯৬।

[10] তিরমিযিঃ ৫/৫৮৯, হাকেমঃ ২/৬০৩। উল্লেখ আছে কুবাস ইবনে আশইয়াম যিনি রাসূলুল্লাহ (স) থেকে কয়েক বছরের বড় হবেন, তিনি এসব জায়গায় ঘুরাফেরা করতেন। তিনি স্পষ্ট করেই বলতে পেরেছিলেন রাসুলুল্লাহ (স) কোন সনে জন্মগ্রহণ করেন। এ থেকে বুঝা যায় উনার সাথে রাসুলুল্লাহর আশৈশব সম্পর্ক ছিলো।

[11] মক্কার অভ্যন্তরে মসজিদুল হারামের পাশেই এই বাজার অবস্থিত ছিল, যেখানে সিরিয়া ও অন্যান্য অঞ্চলের পণ্য বিক্রি করা হতো। আল-আকদুস সামিন ফি তারিখিল বালাদিল আমিন। আল-ফাসি, মুহাম্মদ আহমদ, খন্ড-৪, পৃষ্ঠা-১৪২।

[12] দালাইলুন নুবুওয়্যাহ, বায়হাকীঃ ১/১০৭।

[13] আল-হায়াতুল ইজতামিয়া ফি মাক্কা, পৃষ্ঠা-১৪৭।

[14] আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, কিতাবু সিরাতি রাসূলিল্লাহ, পৃষ্ঠাঃ ৪০৮-৪১১ এর অবলম্বনে।

Share this article

Leave a Reply

Your email address will not be published.