মহানবির মহান জীবন (6)

Share this article
মহানবির মহান জীবন।অন্যরকম সীরাত।গল্পে সীরাত

মানুষের মন বড্ড অদ্ভুত, তারচেয়ে বেশি অদ্ভুত তার জীবন! একটা সফর একইসাথে আনন্দ আবার বেদনার মিশ্রিত বিন্যাস তৈরি করেছে! মদীনায় আমীনার আত্মীয়-স্বজনরা তাদেরকে উষ্ণ অভ্যর্থনায় গ্রহণ করেছে, কিন্তু স্বামীর কবরে ছুটে যেতে আমীনার অন্তর ফুটন্ত পানির মত অস্থির হয়ে আছে। প্রিয় স্বজনদের সাক্ষাৎ ও আদর-যত্নের হিল্লোল অন্তরের জমাটবদ্ধ বিরহের উপর দিয়ে পিছলে যাচ্ছে বারবার। ফিকে করতে গিয়েও ফিকে করতে পারছেনা জমে থাকা বেদনার থোকা থোকা বাষ্পছায়া। যাত্রার ধকল কাটার অপেক্ষা করলেন না আমীনা। মুহাম্মদকে নিয়ে স্থানীয় একজনের সাথে চললেন আব্দুল্লাহ’র কবরের উদ্দেশ্যে।

সূর্য ছুঁইছুঁই করছে দিগন্তরেখা। বসতির অনতিদূরে সুনসান নীরব একফালি মসৃণ জমি। আলাদা পরিচর্যার চিহ্ন বহন করছে সমাধিগুলো। ফ্যাকাসে মরা আলোয় সেখানে শুয়ে আছে একটি কবর। গাইড কবরটির দিকে ইঙ্গিত করে বুঝালেন এটিই এখন আব্দুল্লাহ’র স্থায়ী নিবাস। আমীনার পা নিশ্চল হয়ে আসছে, পৃথিবীর সমস্ত নিস্তব্ধতা ও দীর্ঘশ্বাস গলার কাছে আটকা পড়ে আছে যেন। বিবশ হৃদয় দুমড়েমুচড়ে গেছে পৃথিবীর এই এক খন্ড জমির সামনে এসে! অদ্ভুত এই সন্ধ্যার ভারী পরিবেশ উপলব্ধি করতে পারছে শিশু মুহাম্মদও। এই অচিন উপত্যকা যেন তার গহীন সত্ত্বাকে আগলে রেখেছে ভীষণভাবে। বিষন্নতার ভিতরেও বিচিত্র এক টান তরঙ্গায়িত হচ্ছে মা-পুত্রের অন্তর্জগতে।

ফিকে অন্ধকারে ফিসফিস করে আমীনা শক্ত করে ধরে রাখা পুত্র মুহাম্মদকে উদ্দেশ্য করে বললেন- এইখানে তোমার বাবা ঘুমাচ্ছেন। পরম শান্তিতে। পৃথিবীর ব্যস্ততা থেকে অনেক অনেক দূরে… ঢলে পড়া রাত আমীনার অশ্রুফোঁটা ঢাকতে পারলেও মুছতে পারলোনা কন্ঠে চেপে রাখা আর্তনাদ! এবার তিনি বুকভাঙ্গা কান্নায় ভেঙ্গে পড়লেন, সেই নিভৃত কান্নার দমকে পৃথিবী দুলছে যেন। আসমানের রবকে মনের আক্ষেপ আর আকুতির সমস্ত অনুরণন ব্যক্ত করলেন। আব্দুল্লাহ’র সাথে মুহাম্মদকে পরিচয় করিয়ে দেয়ার ছলে আমীনা পরিস্থিতি সামলে নেয়ার চেষ্টা করলেন। পৃথিবীতে মায়ের জন্য এর থেকে কঠিনতম কাজ বুঝি আর কিছু নেই।

কয়েকদিন মদীনায় অবস্থান করার পর আমীনা অসুস্থ হয়ে উঠলেন। প্রতিদিনই আব্দুল্লাহ’র কবরের কাছে গিয়ে জীবনের তুচ্ছতাকে অনুভব করেন। এবার মনস্থির করলেন মক্কায় ফিরে যাবেন। নির্দিষ্ট দিনে আত্মীয়স্বজনদের শত বাঁধাকে উপেক্ষা করে বাহন ছুটালেন মক্কা অভিমুখে, কোলে শিশুপুত্র মুহাম্মদ। সাথে সেবিকা উম্মে আয়মান। মাইল তিনেক যাওয়ার পর তাঁরা ‘আবওয়া’ নামক গ্রামে[1] যাত্রাবিরতি করতে বাধ্য হন। কারণ আমীনা ভীষণ অসুস্থতা বোধ করছেন। কোনোভাবে তিনি বুঝতে পারলেন তাঁর জীবন সায়াহ্ন ঘনিয়ে এসেছে। উম্মে আয়মানকে মুহাম্মদের দায়িত্ব বুঝিয়ে দিয়ে বললেন- ওকে ওর দাদার হাতে তুলে দিও। শেষবারের মত মুহাম্মদকে বুকে জড়িয়ে আমীনা মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়লেন।[2] মুহাম্মদ হয়তো বুঝতেও পারেনি মায়ের নিস্তেজ বুকে সে দ্বিতীয়বারের মত অসহায় হয়ে পড়লো! স্থানীয়দের সহায়তায় আমীনাকে সেখানেই সমাহিত করার পর উম্মে আয়মান ছয় বছর বয়সী মুহাম্মদকে নিয়ে এগিয়ে চললেন মক্কার পথে। তার চোখে কেবল ভাসছে আমীনার অন্তিম দৃশ্য আর কানে বাজছে শেষ কথাগুলো। ভাবতেই নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসতে চায়।

বাহন থেকে মুহাম্মদকে নিয়ে একা উম্মে আয়মানকে নামতে দেখে অবাক হলেন আব্দুল মুত্তলিব। অশীতিপর বৃদ্ধ পড়িমরি করে ছুটলেন সেদিকে। মুহাম্মদকে কোলে জড়িয়ে নিতে নিতে হাঁপিয়ে উঠা স্বরে জিজ্ঞেস করলেন আমীনা কোথায়?! উম্মে আয়মান দম আটকানো কন্ঠে শুধু এটুকুই উচ্চারণ করতে পারলেন- তিনি আর নেই! আমরা তাঁকে আবওয়াতে সমাহিত করে এসেছি। একের পর এক আঘাতে জর্জরিত আব্দুল মত্তলিব মুহাম্মদকে এমনভাবে বুকের পাঁজরের সাথে মিশিয়ে নিলেন যেন এই ধন তিনি মোটেই আর বিচ্ছিন্ন হতে দিতে চাননা।[3] আশি বছরের শুষ্ক চোখ থেকেও গড়িয়ে পড়লো ক্ষীণ অশ্রুধারা। তাঁর অশ্রুসিক্ত ঠোট বারবার মুহাম্মদের কপালে একে দিচ্ছে তপ্ত বিরহ।

বয়স খুব অল্প হলেও মুহাম্মদ একে একে আপনজন হারানোর বিষয়টি উপলব্ধি করতে পারছে। কখনও আকাশের দিকে তাকিয়ে হারানো মমতাগুলো রোমন্থন করে। আসমানের মিটিমিটি তারার সাথে অভিযোগ বিনিময় করে।[4] পার্থিব সব অভিভাবকত্ব একের পর এক হারানোর ফলে শৈশব থেকেই মুহাম্মদ নির্ভার হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করতে শুরু করলো। সেইসাথে মনুষ্য কারো উপর নির্ভর হওয়ার পরিবর্তে আসমানের রবের উপর নির্ভরশীলতা সৃষ্টির রহস্য এতে নিহিত ছিলো।[5] আব্দুল মত্তলিব তাঁর আদরের পরশ সবটাই মুহাম্মদকে উজাড় করে দিতে শুরু করলেন। তাঁর জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও সর্বোচ্চ মমতার স্থান করে নিল প্রিয় নাতি মুহাম্মদ। তার দাদি হালাও ভীষণ আদর আর মমতা দিয়ে ঘিরে রেখেছেন মুহাম্মদকে।[6] কাবা’র শীতল ছায়ায় যেখানে আব্দুল মুত্তলিবের বিশেষ আসন ছিলো সেখানে তিনি মুহাম্মদকে পাশে নিয়ে বসেন। একইভাবে আব্দুল্লাহকেও এভাবে পাশে নিয়ে বসতেন। ছেলেটা বাপের মতই হয়েছে। আব্দুল মুত্তলিবের পুত্রদের অনেকেই বিষয়টা তির্যকভাবে দেখলে তিনি বললেন- ওর একটা আলাদা অবস্থান আছে। কখনও মক্কার বাহিরে কাজে যেতে হলে আব্দুল মুত্তলিব উম্মে আয়মানকে ডেকে বিশেষভাবে মুহাম্মদের দেখভালের নির্দেশ দেন। আর মুহাম্মদকে ছেড়ে কখনও নিজে খেতে বসেছেন এমনটা হয়নি। নিজ হাতেই নাতিকে খাইয়ে দেন।[7]

আব্দুল মুত্তলিব নাতির মধ্যে কিছু বিস্ময়কর বারাকাহ খেয়াল করলেন। এই পিচ্চিকে যে কাজেই পাঠানো হোক সফল হয়ে ফিরবেই। ব্যাপারটা তাঁর মনের মধ্যে মুহাম্মদের জন্য আরো গভীর আবেগের জায়গা তৈরি করে দিলো। এই তো কদিন আগেই আব্দুল মুত্তলিবের একটা প্রিয় উটনী হারিয়ে গেলো। অনেক খুঁজাখুঁজির পরেও এর হদিস পাওয়া গেলোনা। আব্দুল মুত্তলিবের খেয়াল হলো মুহাম্মদ গেলে বোধহয় ওর বিশেষ বারাকা’র ছোঁয়ায় উটনীটি ফেরত পাওয়া সম্ভব। তিনি মুহাম্মদকে ডেকে বললেন- দাদু, ঐ যে আমার প্রিয় উটনীটা তুমিও যেটায় চড়তে ঐটা হারিয়ে গেছে, তুমি দেখো তো খুঁজে আনতে পার কিনা! বসতির পেছন দিকে মুহাম্মদ দৌড়াতে দৌড়াতে চলে গেলো। এদিকে সন্ধ্যা হয় হয়, এখনও মুহাম্মদ ফিরছেনা দেখে আব্দুল মুত্তলিবের অন্তরাত্মা কেঁপে উঠলো। তিনি পেরেশান হয়ে উঠলেন। উপায়ন্তর না দেখে শেষ আশ্রয় কাবার রবের কাছে মিনতি জানাতে ছুটে গেলেন কাবা চত্বরে। তওয়াফ করতে করতে আবৃত্তি করতে লাগলেন-

ইয়া রব্ব! বাহন সহ আমার মুহাম্মদকে ফিরিয়ে দাও

তাঁকে ফিরিয়ে দাও রব্ব, সে আমার শক্তি হবে…

কিছুক্ষণ পর দেখা গেলো মুহাম্মদ উটনীটিকে হাঁকিয়ে নিয়ে আসছে। ছুটে গিয়ে তাকে বুকে জড়িয়ে ধরে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলেন আব্দুল মুত্তলিব। বললেন- আমি তোমায় হারিয়ে অবলা নারীর মত হয়ে গিয়েছিলাম। আমায় কখনও আর ছেড়ে যেওনা প্রিয়।[8]

এভাবে আরো দুটি বছর কেটে গেলো। ছন্নছাড়া শৈশবে দাদার ছায়াই ছিলো মুহাম্মদের একমাত্র আশ্রয়। কিন্তু যেদিন বিরাশি বছর বয়সী এই মহীরুহ শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন কিছু বুঝে উঠার আগেই মুহাম্মদ আবারো নিঃস্ব হয়ে গেলো।[9] মৃত্যু শয্যায় আব্দুল মুত্তলিব কাঁপা কাঁপা স্বরে আবু তালেবকে মুহাম্মদের দায়িত্ব বুঝিয়ে দিলেন। কম্পিত হাতে মুহাম্মদকে কাছে টেনে তার কপালে চুমু খেলেন। ফিসফিসিয়ে বললেন- বিদায় আমার প্রিয়তম! আমি জানি তুমি একদিন এই বিশ্বকে জয় করবে। আমি তোমার চোখে মানবজাতির মুক্তির ঝলক দেখতে পাই। তোমাকে অনেক ভালোবাসি। আট বছর বয়সী মুহাম্মদের উপর আবার নেমে আসলো বেদনার জলোচ্ছ্বাস।[10]

ফেসবুকে পড়ুন এখানে

পর্ব ৫ পড়ুন এখানে


[1] মু’জামুল বুলদান, ১/৭৯।

[2] সিরাতে ইবনে হিশাম ১/১৫৫

[3] মুসান্নাফ আব্দুর রাজ্জাক, ৫/৩১৮। আব্দুল মত্তলিবের দায়িত্ব নেয়ার বর্ণনা আছে সেখানে।

[4] মুস্তাদরাকে হাকেম, ২/৬০৩-৬০৪। সনদ কিছুটা দুর্বল হলেও উল্লেখিত বর্ননা থেকে প্রমাণ হয় মুহাম্মদ (সঃ) আপঞ্জন হারানোর বেদনা উপলব্ধি করতেন। আর এটা স্বাভাবিক মানব সহজাত উপলব্ধিই বটে।

[5] আল-বি’সাহ ওয়া ইন্তিলাক্বুর রিসালাহ, পৃষ্ঠা- ৪২।

[6] খাতামুন নাবিয়্যিন, মুহাম্মদ আবু যাহরাহ, দারুল ফিকরুল আরাবি, কায়রো। ১/১২০।

[7] প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা- ১২২।

[8] তবরানী, ৫৫২৪। বায়হাকী, ২/২০-২১। তবাকাত, ১/১১১। হাকেম, ২/৬০৩।

[9] তবাকাত, ১/১১৭।

[10] বায়হাকী, ২/২১-২২।

Share this article

Leave a Reply