রাসূলের সাথে আখিরাতে -2

Share this article
রাসূলের সাথে আখিরাতে কেমন হবে আমাদের জীবন

অপেক্ষার চেয়ে মৃত্যু অনেক সহজ। ময়দানে হাশরের বিভীষিকা প্রতি মুহুর্তে সহ্যের মাত্রা ছাড়িয়ে যাচ্ছে। প্রতিটা নফসের এখন একটাই আকুতি- পরিণতি যা হবে হোক, বিচারকাজ শুরু হয়ে যাক। চারপাশের বীভৎস দৃশ্য আর এই চরম আযাব থেকে পরিত্রাণ চায়। কিছু মানুষের বোধোদয় হলো, চল আমরা আমাদের নবী-রাসুলদের কাছে আবেদন জানাই। অন্তত তাঁরা আল্লাহর দরবারে বিচারকাজ শুরু করার মিনতি জানালে তিনি কবুল করলেও করতে পারেন।

আফসোস আর অশ্রুতে একাকার বনী আদমের একটা জটলা আদমের (আ) কাছে কোনোরকম পৌঁছল, আপনার কাছে একটাই চাওয়া- বিচারকাজ শুরু করতে আমাদের পক্ষ থেকে বিশ্বজগতের প্রতিপালকের কাছে আবেদন করুন! আপন দুশ্চিন্তায় ডুবে থাকা আদম (আ) অপারগতা জানিয়ে বললেন- আমি তো নিজেই আজ বিপদগ্রস্থ! কোন মুখে আমি আল্লাহর সামনে দাঁড়াবো?!

ততক্ষণে প্রত্যেকে যে যার নবীকে খুঁজে নিয়েছে। চরম উৎকণ্ঠায় সবার মুখে একটাই মিনতি- বিচার শুরু হোক! আপনি একটু সুপারিশ করুন ! কিন্তু জীবনে মানবস্বভাবঘটিত নানান ঘটনা নবীদের মানসপটে ভেসে বেড়াচ্ছে আর তাদেরকে অনুশোচনা কুড়েকুড়ে খাচ্ছে। কোন দাবি নিয়ে তাঁরা দাঁড়াবেন আল্লাহর দরবারে?! প্রত্যেক নবীই অন্য কোনো নবীকে রেফার করছেন। শেষমেশ চারদিকে চাওর হয়ে গেলো কেবলমাত্র একজন রাসুলই আছেন যিনি এই মহান দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেয়ার মত সাহস ও ব্যক্তিত্ব বহন করেন।

সবকিছু ছাপিয়ে এবার চারদিকে একটা শোরগোল শোনা গেল- মুহাম্মদ? মুহাম্মদ কোথায়? (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)

মানুষের জনস্রোত তরঙ্গায়িত হতে লাগলো মুহাম্মদের (সঃ) খোঁজে। পঞ্চাশ হাজার বছরের কারাবাস অঙ্গার করে দিয়েছে বনী আদমের দেহপ্রাণ। রাসুলুল্লাহ (সঃ) এর খোঁজ যখন পাওয়া গেলো ততক্ষণে সহ্যের চূড়ান্ত সীমা অনেক আগেই পার হয়ে গেছে সবার।

হাশরের ভয়াবহতা প্রতিটি প্রাণকে দুমড়ে মুচড়ে দিয়েছে। সব শুনে রাসুলুল্লাহ বললেন- হ্যা, আমি এটা পারবো। এটা আমারই কাজ। আরশের ছায়াতেই উনার অবস্থান ছিলো। এবার আরশের নিচেই তিনি সিজদায় লুটিয়ে পড়লেন।

সৃষ্টির সূচনালগ্ন থেকে আজ অবধি আল্লাহর যে নামটি কখনও কেউ জানেনি, সে গুপ্তনামের ডালি আজ উন্মুক্ত করা হলো। আল্লাহ তাঁর সবচেয়ে প্রিয় বান্দাটির অন্তরে ইলহাম করে জানিয়ে দিলেন জাদুকরি সেই নাম।

রাসুলুল্লাহ সিজদায় আল্লাহর সেই বিরল নামের যিকিরে মত্ত। তাঁর মুখ ফুটে উৎসারিত হওয়া সেইসব প্রশংসামালা সুবাস ছড়াতে শুরু করেছে। স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললো সৃষ্টিকূল। এই সেই ‘মাকামে মাহমুদ’ যার প্রতিশ্রুতি আল্লাহ তাঁকে দিয়েছিলেন। তাঁর হাত ধরে মঞ্চিত হলো শাফায়াতের প্রারম্ভিকা। হিসাব-নিকাশের মঞ্চ প্রস্তুত। স্থাপন করা হয়েছে ন্যায় বিচারের ‘মিজান’।

অপ্রত্যাশিত এই পরিস্থিতি হঠাৎ থমকে দাঁড়ালো আল্লাহর গমগমে আওয়াজে- মুহাম্মদ, মাথা তোলো। আজ তোমার সকল মনোবাসনা পূর্ণ করা হবে। যা সুপারিশ করবে তাই গ্রহণ করা হবে। তুমি যা বলবে তাই রাখা হবে। রাসুলুল্লাহ (সঃ) বললেন- ইয়া রব্ব, সমগ্র মানবজাতির বিচারকার্য শুরু করার জন্যে আপনার দরবারে ফরিয়াদ জানাচ্ছি। আল্লাহ বলবেন- তবে তাই হোক।

সেই মুহুর্তে ডুবন্ত মানবতার উপর দিয়ে বয়ে যাবে স্বস্তির বাতার…  হাঁফ ছাড়বে দম বন্ধ হয়ে থাকা প্রতিটি প্রাণ। কিন্তু ওরা জানেনা, ক্ষণিক পরেই তাদের উপর নেমে আসতে যাচ্ছে মহাকালের আরো ভয়ংকরতম অধ্যায়টি।

(পড়ুন পর্ব-৩)

মুহাম্মদ (সঃ) এর কান্নাবিজড়িত সুপারিশে আল্লাহ বিচারিক প্রক্রিয়া শুরুর অনুমোদন দিয়েছেন। হাশরের হাঁসফাঁস পরিস্থিতি থেকে গোটা মানবজাতির সাময়িক মুক্তি মিলেছে। অনুমোদনের পরমুহুর্তেই হাশরের চিত্র বদলে যেতে শুরু করলো। মানব সম্প্রদায়ের প্রতিটি সদস্যের বিচারকার্যের মঞ্চ দৃশ্যমান হচ্ছে। কিন্তু রাসুলুল্লাহ (সঃ) এখনো আরশতলে সিজদায় পড়ে আছেন। তাঁর কন্ঠে শুধু একটাই প্রার্থনা- উম্মাতি ইয়া রব্ব! উম্মাতি ইয়া রব্ব! (ইয়া রব্ব, আমার উম্মত! ইয়া রব্ব, আমার উম্মত!)

প্রিয় হাবীবের অশ্রুসিক্ত ফরিয়াদের জবাবে অদৃশ্য থেকে ঘোষণা শোনা গেল – “চলো, তোমার উম্মতের মধ্যে যাদের অন্তরে কমপক্ষে যবের দানা পরিমাণ ঈমান আছে তাদেরকে আলাদা করে নাও, তোমার সুপারিশে তাদেরকে আমি বিনা হিসেবে জান্নাত প্রদান করলাম, তুমি তাদেরকে জান্নাতের সর্বডানের দরজা দিয়ে প্রবেশ করাবে, যে দরজাটি শুধু তাঁদের জন্যেই বরাদ্দ” যে দরজার দুই কবাটের দুরত্বই শুধু মক্কা থেকে বসরার দুরত্বের সমান।

হাশরের ময়দানে যতদূর চোখ যায় দিগন্তজুড়ে জ্বলজ্বল করছে আখেরী নবীর উম্মতগণ। দূর থেকে দেখেও বেশ বুঝা যায় এরাই মুহাম্মদের উম্মত; তাঁদের অজুর অঙ্গগুলো শুভ্র আভা ছড়াচ্ছে। একটা কালো বর্ণের মহিষের পিঠে এর সাদা লোমগুলো সংখ্যায় কম হলেও যেভাবে উজ্জ্বল হয়ে দেখা যায়, উম্মতে মুহাম্মদীও সেভাবে আলোকিত হয়ে আছে… পড়ুন লিঙ্কে।

সাঈদুল মোস্তফা

Share this article