রাসূলের সাথে আখিরাতে -3

Share this article
রাসূলের সাথে আখিরাতে আমাদের জীবন কেমন হবে?

মুহাম্মদ (সঃ) এর কান্নাবিজড়িত সুপারিশে আল্লাহ বিচারিক প্রক্রিয়া শুরুর অনুমোদন দিয়েছেন। হাশরের হাঁসফাঁস পরিস্থিতি থেকে গোটা মানবজাতির সাময়িক মুক্তি মিলেছে। অনুমোদনের পরমুহুর্তেই হাশরের চিত্র বদলে যেতে শুরু করলো। মানব সম্প্রদায়ের প্রতিটি সদস্যের বিচারকার্যের মঞ্চ দৃশ্যমান হচ্ছে। কিন্তু রাসুলুল্লাহ (সঃ) এখনো আরশতলে সিজদায় পড়ে আছেন। তাঁর কন্ঠে শুধু একটাই প্রার্থনা- উম্মাতি ইয়া রব্ব! উম্মাতি ইয়া রব্ব! (ইয়া রব্ব, আমার উম্মত! ইয়া রব্ব, আমার উম্মত!)

প্রিয় হাবীবের অশ্রুসিক্ত ফরিয়াদের জবাবে অদৃশ্য থেকে ঘোষণা শোনা গেল – “চলো, তোমার উম্মতের মধ্যে যাদের অন্তরে কমপক্ষে যবের দানা পরিমাণ ঈমান আছে তাদেরকে আলাদা করে নাও, তোমার সুপারিশে তাদেরকে আমি বিনা হিসেবে জান্নাত প্রদান করলাম, তুমি তাদেরকে জান্নাতের সর্বডানের দরজা দিয়ে প্রবেশ করাবে, যে দরজাটি শুধু তাঁদের জন্যেই বরাদ্দ” যে দরজার দুই কবাটের দুরত্বই শুধু মক্কা থেকে বসরার দুরত্বের সমান।

হাশরের ময়দানে যতদূর চোখ যায় দিগন্তজুড়ে জ্বলজ্বল করছে আখেরী নবীর উম্মতগণ। দূর থেকে দেখেও বেশ বুঝা যায় এরাই মুহাম্মদের উম্মত; তাঁদের অজুর অঙ্গগুলো শুভ্র আভা ছড়াচ্ছে। একটা কালো বর্ণের মহিষের পিঠে এর সাদা লোমগুলো সংখ্যায় কম হলেও যেভাবে উজ্জ্বল হয়ে দেখা যায়, উম্মতে মুহাম্মদীও সেভাবে আলোকিত হয়ে আছে।

মুহাম্মদ (সঃ) এর অবস্থান লক্ষ্য করে তাঁর উম্মতের সদস্যরা ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছে। যে ভাই-বোনরা তাঁকে দুনিয়াতে দেখতে পায়নি তাঁদের যেন আর তর সইছে না। প্রিয় নবীর সাক্ষাৎ পেতে সবাই মরিয়া।

নবীজি (সঃ) তখনও সিজদায় পড়ে আছেন। দুনিয়াতে তিনি কখনোই কিছু চেয়ে নেননি। সব আবদার গচ্ছিত রেখে দিয়েছিলেন আজকের এই দিনে চাইবেন বলে। আল্লাহর অনুপম প্রশংসা তাঁর মুখে এখনো উচ্চারিত হয়েই চলেছে, আর মিনতি করছেন- “উম্মাতী… উম্মাতী”। আজ যেন নিজের উম্মতকে ছাড়া তিনি কোথাও যাবেন না!

আবারো গায়েবী প্রতিশ্রুতি ভেসে এলো- “তোমার উম্মতের মধ্যে যার অন্তরে সরিষা পরিমাণ ঈমান পাওয়া যাবে তাকেই আমি জাহান্নাম থেকে মুক্তি দান করবো”।

সাগরের সফেদ ফেনারাশি যেভাবে ভাসতে ভাসতে তীরে ভিড়ে, রাসুলুল্লাহর শুভ্র চেহারার উম্মতরাও সেভাবে তাঁর কাছে জমায়েত হচ্ছে। কিন্তু তিনি এখনো সিজদায় লুটিয়ে আছেন। আজ আল্লাহর রহমতের সর্বোচ্চ ছোঁয়া পেতে চান তিনি। যে উম্মত আজীবন তাঁর নাফরমানি করে গেলো তাদের জন্যেও তিনি আজ ক্ষমাপ্রার্থনা করে অঝোরে কাঁদছেন- “উম্মাতি… উম্মাতী”।

তৃতীয়বারের মত আল্লাহর ওয়াদা শোনা গেলো- “সরিষাদানার থেকেও অনেক অনেক কম ঈমানও যে বুকে ধারণ করবে অর্থাৎ নূন্যতম “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ” কালিমা যার বুকে আছে আমি তাকে পরিশেষে জান্নাত দিয়ে দিবো”।

রাসুল (সঃ) এবার সন্তুষ্টচিত্তে উঠে দাঁড়ালেন আল্লাহর মহিমা প্রকাশ করতে করতে। হাশরের নানান প্রান্ত থেকে ছুটে আসা তাঁর উম্মতকে তিনি দেখেই চিনতে পারছেন। তাঁদের হাত-পা-মুখ শুভ্র হয়ে অজুর চিহ্ন বহন করছে। কিন্তু হাশরের অবর্ণনীয় দুঃসহ পরিস্থিতি মোকাবেলায় অন্যান্য জাতির মতো তারাও আকন্ঠ তৃষ্ণার্ত। পিপাসায় বুকের ছাতি ফেটে যাচ্ছে!

হাশরের ময়দানের যেপাশে জান্নাতের অবস্থান সেখানে একটা নদী আছে; আল-কাওসার। পৃথিবীর কোন শব্দই এর প্রকৃত বৈশিষ্ট্য প্রকাশ করতে সক্ষম নয়। কুলকুল বয়ে যাওয়া সেই নদীর পানি দুধের চেয়েও শুভ্র, মধুর চেয়েও মিষ্টি আর মেশকের চেয়েও সুগন্ধিতে ভরা! এ নদী থেকে সরাসরি দুটি ঝর্ণাধারা নেমে এসে সৃষ্টি করেছে হাউজে কাওসার নামের সরোবর। একটি ঝর্ণার মুখ স্বর্ণে মোড়া অন্যটি রৌপ্যের। ঠিক যেখানটায় হাউজে কাওসার সেখানেই রাসুলুল্লাহ তাঁর উম্মতের জন্য অপেক্ষা করছেন।

চতুষ্কোণ সরোবরটির আয়তন এক মাসের দূরত্বের সমান। আকাশের নক্ষত্র সমপরিমাণ পানপাত্র সেখানে পদ্মের মত ভাসছে। প্রথমে মুহাজির ও আনসারের দরিদ্র উম্মতরা রাসূলুল্লাহ’র হাতে এই সরোবর থেকে পান করলেন, একবার যে এর পানি পান করবে অনন্তকাল আর পিপাসিত হবেনা।

একে একে সবাই এসে এসে রাসূলের পবিত্র হাতে সেই পানি করছে। অন্যদিকে বাকী নবী-রসূলগণও সীমিত আকারের হাওজ পেয়েছেন। যে যার নেককার উম্মতকে পান করাতে ব্যস্ত। হাওজে কাওসারের কাছে যারাই উপনীত হচ্ছে প্রত্যকেকেই রাসূলুল্লাহ (সঃ) চিনছেন, তিনিও তাঁদের কাছে যেন কত দিনের চেনা আপনজন!

হঠাৎ কিছু লোক হাওজের কাছে আসতেই রাসূল (সঃ) তাদেরকে পান করাতে উদ্যত হলেন। কিন্তু আচমকাই তাদের মাঝে পর্দা নেমে আসলো। রাসূলুল্লাহ বললেন- এরা তো আমার উম্মত! আসতে দাও… দায়িত্বরত ফেরেশতা বললো- এরা আপনার পরে আপনার দ্বীনকে বিকৃত করেছিলো। রাসূলুল্লাহ (সঃ) আফসোস নিয়ে বললেন- যারা আমার দ্বীনকে বদলে ফেলেছো দূর হও এখান থেকে!

সময় স্থির, কিন্তু ঘটনা প্রবাহমান। অন্যদিকে তখন নতুন পর্বের প্রস্তুতি চলছে। হাশরের পরিবেশ বদলে যাচ্ছে মুহুর্মুহ। বসানো হচ্ছে মিজানের পরিমাপক। চলছে প্রহরী ফেরেশতাদের আনাগোনা। আলাদা আলাদা আঙ্গিনায় বসছে ভিন্ন ভিন্ন বিচারালয়। একটু পর কেউ আর কাউকে চিনতে পারবেনা, চিনতে চাইবে না। প্রত্যেকে ইয়া নাফসি… ইয়া নাফসি… বলেই পালাবে আপন পিতা থেকে, মাতা থেকে, ভাই থেকে, জীবনসঙ্গী থেকে…

(পড়ুন পর্ব-৪)

লেখকের ফেসবুক আইডি

Share this article

One comment

Leave a Reply

AllEscort