রাসূলের সাথে আখিরাতে -5

Share this article
রাসূলের সাথে আখিরাতে কেমন হবে আমাদের জীবন…

কাফেরদল তরঙ্গের মত ছুটছে জাহান্নাম পাণে, জীবনভর যে যার উপাসনা করেছে আজ সেসবের প্রতীকী চালকের পিছু পিছু চলছে নির্বোধের মত। কিছুই করার নেই, পৃথিবীতে প্রতি নিঃশ্বাসে নিঃশ্বাসে তারা এই অদৃষ্ট রচনা করেছে। ক্রুশের পূজারীরা ক্রুশের পিছু নিয়েছে, মূর্তির উপাসকরা মূর্তির, আগুনের অর্চনাকারী আগুনের পিছনে… এক সময় শেষ কাফেরটাও মিলিয়ে গেল জাহান্নামের অতল গহ্বরে। দূর থেকে ভেসে আসছে তাদের গগনবিদারী আর্তনাদ। সবকিছুই ঘটলো বিশ্বাসীদের বিস্ফোরিত চোখের সামনে।

হঠাৎ জাহান্নামের পাদদেশ থেকে ভেসে আসলো এক উচ্চকিত কন্ঠঃ আল্লাহ তোমাদেরকে যে ওয়াদা দিয়েছিলেন সে ওয়াদাই ছিল চিরসত্য, আমি যে ওয়াদাগুলো দিতাম সে ওয়াদা আমি নিজেই ভঙ্গ করতাম। আসলে তোমাদের উপর আমার কোনো প্রভাবই ছিলো না; আমি কেবল তোমদেরকে কুমন্ত্রণা দিতাম আর তোমরা সুড়সুড় করে তাতে সাড়া দিতে। আজ আমাকে ভর্ৎসনা না করে নিজেদেরকেই নিন্দা করো। না আমি আজ নিজে তোমাদেরকে রক্ষা করতে পারবো, আর না তোমরা আমাকে! অতীতে তোমরা আমাকে ঘিরে আল্লাহর সাথে যেসব শিরিক করতে আমি সেসব থেকে নিজেকে মুক্ত ঘোষনা করলাম। জালেমদের জন্য অপেক্ষা করছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি!

ইবলিসের এই বক্তব্যের পর তাকেও জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হলো। জাহান্নামের ক্ষুধা এখনও মেটেনি। টগবগ করতে করতে সে চেয়েই চলেছেঃ আরো আছে কি?! আরো আছে কি?! নিক্ষিপ্ত জঞ্জালগুলো হাতড়ে পাচড়ে উঠে আসার চেষ্টা করছে, পরক্ষণেই ফেরেশতাদের প্রচন্ড হাতুড়ির বাড়িতে ছিটকে পড়ছে অতল গভীরে। মুহুর্তেই ঝলসে যাওয়া দেহ নিয়ে জাহান্নামের প্রহরীকে উদ্দেশ্য করে বলছেঃ তোমার রব্বকে আকুতি জানাই তিনি আমাদের যেন শেষ করে দেন। আর পারছি না। জাহান্নামের প্রহরী জানাবেঃ এ থেকে নিস্তার নেই, এখানেই তোমাদের চিরস্থায়ী ঠিকানা। পরিত্রাণের আর কোনো সুযোগ নেই। জাহান্নামের জীবনটাও আক্ষরিক অর্থে কোনো জীবনই না। তোমাদের মরণও নেই।

অবশিষ্ট বিশ্বাসীদের মধ্যে এখনও লুকিয়ে আছে গুপ্ত অপরাধী। এবার তাদেরকে আলাদা করার পালা। সবাইকে এক জায়গায় সমবেত করার পর জিজ্ঞেস করা হলোঃ তোমাদের কি হবে বলো? জটলা থেকে উত্তর আসলোঃ আমরা তো আলাদা, আমরা যখন শুনেছি যে যার ইবাদত করতো তার পিছু নেয়ার নির্দেশনা, তখন আমরা আমাদের রব্বকে খুঁজেছি। কিন্তু এখনও তাঁর দেখা পাইনি, তাই অপেক্ষায় আছি। তখনই আসমান ফুঁড়ে একটি চেহারা দৃশ্যমান হলো, আজীবন জেনে আসা আল্লাহর সৌন্দর্য্যের সাথে এ চেহারার কোনো মিল নেই। আওয়াজ আসলোঃ আমি তোমাদের রব্ব। মু’মিনরা বলবেঃ আল্লাহর পানাহ চাই, আমাদের রব্ব না আসা অবধি আমরা একচুলও নড়বো না, তিনি প্রকাশ হলে আমরা তাঁকে ঠিকই চিনতে পারবো।

বস্তুত এটাও ছিলো তাঁদের জন্য ভিন্নধর্মী এক পরীক্ষা। এরপর আল্লাহ তাঁর অপরূপ দৃশ্য নিয়ে প্রকাশ হবেন। আর বলবেনঃ দেখো, আমি তোমাদের রব্ব! নবীগণ বলবেনঃ হ্যাঁ, আপনিই আমাদের রব্ব। আল্লাহ বলবেনঃ আচ্ছা, তোমাদের রব্বকে চেনার মত কোনো চিহ্ন কি তোমাদের জানা আছে। তাঁরা বলবেনঃ হ্যাঁ, আছে। তখন আল্লাহ তা প্রকাশ করবেন। সাথে সাথে সকলে তাঁর সিজদায় নত হয়ে যাবে।

সব প্রকৃত মু’মিনগণ সেজদাবনত, কিন্তু মুনাফিকরা শত চেষ্টা করেও মাথা নত করতে পারছে না। শরীর যেন কাঠ হয়ে গেছে। সবুজ ধানক্ষেতে যেমন শুকনো আগাছা আলাদা চোখে পড়ে, মুনাফিকদেরকেও ইতিউতি দেখা যাচ্ছে সোজা দাঁড়িয়ে আছে। এরা দুনিয়াতে লোক দেখানো সিজদা দিতো, বাহবা পাওয়ার লোভে ইবাদত করতো। আজ তারই ফল পাচ্ছে।

ধীরে ধীরে ঘনিয়ে আসছে আঁধার, নিকষ কালো রাতের অন্ধকারে ছেয়ে যাচ্ছে হাশরের জগত। হাত বাড়ালেও নিজের হাত দেখতে পাওয়া যায়না। চারদিকে শুধু গাঢ় নিঃশ্বাসের শব্দ। কিন্তু ষষ্ঠ ইন্দ্রয় উপলব্ধি করতে পারছে- জাহান্নামের উপর নেমে আসছে পুলসিরাত। পরম আকাঙ্ক্ষায় তৃষ্ণার্ত হয়ে উঠছে প্রতিটি নফস। এই কী তবে মানযিলে মাকসুদের আগ মুহুর্তে শেষ পরীক্ষা! এ পুলসিরাত পার হলেই কী সেই অনাবিল সুখের জান্নাত?! যার প্রতিশ্রুতি আল্লাহ দিয়েছেন।

পর্ব ৫ পড়ুন এই লিঙ্কে

ভয়াবহ রণক্ষেত্রের দৃশ্য ধারণ করেছে আখিরাতের মাঠ। সারিবদ্ধ ফেরেশতাদের টহল আর ভীতিকর নিস্তব্ধতা আরো জেঁকে বসেছে। ইতোমধ্যেই বিনা হিসেবে জান্নাতের সুসংবাদ পেয়েছে উম্মতে মুহাম্মদির অগুনিত মানুষ। তাঁদের মধ্যে যারা শহীদ, সত্যিকারের উলামা-হুফফাজ তাঁরা পুলসিরাতের কিনারে মুহাম্মদ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে অপেক্ষা করছেন। তাঁদের আত্মীয় পরিজন পরিচিতদের মধ্যে যারা দুর্ভাগ্য বরণ করবে তাদের জন্য সুপারিশ করতে। আল্লাহর অনুগ্রহে তাদেরকে হিসাব-নিকাশের মুখোমুখিই হতে হয়নি। আরো যারা যারা আল্লাহর উপর ঈমান এনেছিলো, তাঁর উপর তাওয়াক্কুল করেছিলো, কোনো গণক-জাদুকরের কাছে যায়নি তারাও এই ভাগ্যবানদের অন্তর্ভূক্ত হবে…

সাঈদুল মোস্তফা

Share this article

Leave a Reply

Your email address will not be published.