রাসূলের সাথে আখেরাতে-10

Share this article
আখেরাতের নবী || গল্পসিরাত || অন্যরকম সিরাত ||
রাসূলের সাথে আখেরাতে আমাদের জীবনটা কেমন হবে? আসুন পড়ি শেষ পর্ব

জান্নাতীদের এখনও বিশ্বাস হতে চাইছে না তাঁরা চিরস্থায়ী বেহেশতের অনাবিল সুখের রাজ্যে বিচরণ করছে। বিস্ময়ের ঘোর কাটছেই না। এই জীবনে বিরক্তিকর কিছুই নেই, বাজে জিনিস নেই। আনন্দের অকল্পনীয় সব উপকরণ ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে সর্বত্র। জান্নাতে প্রবেশের মাধ্যমে জান্নাতীরা অনেককিছুর জ্ঞান লাভ করে নিয়েছেন। কার গায়ের কোন পোশাকের কি পরিচয় বহন করে, কোন নদীর কি বিশেষত্ব, কোন স্থান কাদের জন্য সংরক্ষিত… এমন অনেক কিছুই তাঁরা স্বয়ংক্রিয়ভাবে জেনে গেছেন।

জান্নাতে সূর্যের অস্তিত্ব নেই। জান্নাতীদের অর্নামেন্ট থেকেই তো সূর্য থেকেও অধিক আলোর ঠিকরে পড়ে। কিন্তু এখানে সকাল-সন্ধ্যা আছে। রহমানের আরশ থেকে নেমে আসা নূর আলোআঁধারির সমন্বয় করে। এখানে বাতাসের নিঃশ্বাস নেই, সুবহানাল্লাহ ও আলহামদুলিল্লাহ জান্নাতবাসীর শ্বাস-প্রশ্বাস। এখানে সপ্তাহ আছে, শুক্রবারে গণ-সম্মিলন হয়। সে গণ জমায়েতে উত্তরালী সমীরণ বয়ে যায় মেশকের রেণু ছিটিয়ে। জান্নাতবাসীরা এ রেণুর ছোঁয়ায় আরো রূপবান ও রূপবতী হয়ে উঠে। এরপর পরিবারের কাছে ফিরে একে অন্যের দিকে তাকিয়ে বিমোহিত হয়। জান্নাতে চারটি গুপ্ত সমুদ্র আছে। আরশ থেকে উৎসারিত হয়েছে চারটি নদী। একটি সুপেয় পানির, আরেকটি সুস্বাদু দুধের, আরেকটি তৃপ্তিদায়ক শরাবের, অন্যটি খাঁটি মধুর। এগুলো থেকে আবার চারটি ঝর্ণা প্রবাহিত হয়েছে। সালসাবিল থেকে জান্নাতীরা ইতিমধ্যেই পান করেছে। আরেকটি হলো কাওসার, এটির তলদেশও কস্তুরির। আরেকটি তাসনিম, এটি মধু মিশ্রিত। আরেকটি বারিক্ব, এই নদীর পাড়েই শহীদদের রূহ এতদিন বসবাস করেছিলো।

সময়ের আবর্তন মানেই আয়ুর হ্রাস, সময়ের উপর ভর করে যতকিছু সৃষ্টি হয়েছে আল্লাহ সেসব ধ্বংস করেছেন। আসমান, জমিন, পাহাড়-পর্বত সবকিছু। জান্নাতীরা এখন সব ভয় ডরের উর্ধে, দৈহিক সুরক্ষা নিয়ে তাঁদের মনে আর দ্বিধাদ্বন্দ্ব নেই। কিন্তু পৃথিবীতে তাঁরা মৃত্যুর স্বাদ আস্বাদন করেছিলো। তাই আত্মার বিনাশ নিয়ে তাঁদের মধ্যে আশঙ্কা রয়ে গেছে। তাই আল্লাহ নতুন ফরমান দিয়ে তাঁদেরকে শাশ্বত জীবনের নিশ্চয়তা দিতে ইচ্ছে করলেন। জান্নাত ও জাহান্নামের মাঝের পাটাতনে একজন ফেরেশতার ডাক শুনে সবাই সেদিকে তাকালো। ফেরেশতার হাতে একটি সাদা মেষ। সে বললোঃ হে জান্নাতবাসীগণ!
এমন দৃশ্য দেখে জান্নাতীরা ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে উঠলো, না জানি তাদের বর্তমান অবস্থা থেকে তাদেরকে বহিস্কার করা হয়। তখনি ফেরেশতা হাঁক দিয়ে বলবেঃ হে জাহান্নামীরা!
তারা মনে মনে এই ভেবে উৎফুল্ল হলো যে, হয়ত তাদের বর্তমান অবস্থা থেকে তাদেরকে মুক্তি দেয়া হবে।

অতঃপর জাহান্নামবাসীদেরকে বলা হলো, তোমরা কি একে চিন? তারা বললো : হ্যাঁ, এ হলো “মৃত্যু”।

অতঃপর জান্নাতবাসীদেরকে বলা হলো, হে জান্নাতবাসীগণ! তোমরা কি একে চিন? তারা উঁকি দিয়ে তাকাবে এবং বলবে, হ্যাঁ, এ হলো মৃত্যু।

এরপর তাদের সবার সামনে “মৃত্যু”কে জবাই করে দেয়া হলো। এবং ঘোষণা শোনা গেলোঃ হে জান্নাতবাসী, তোমরা চিরস্থায়ী, তোমাদের আর মুত্যু নেই। হে জাহান্নামবাসীরা, তোমরাও চিরস্থায়ী, তোমাদেরও আর মৃত্যু নেই।

মনে যা আসছে বাস্তবে তাই খাচ্ছেন জান্নাতীরা। প্রতিটি ফলফলাদি সত্তর রঙের, দুই রকম স্বাদের। একটি স্বাদ পৃথিবীর মত, আরেকটি স্বাদ জান্নাতের। মৌসুমী ফল বলে কিছু নেই, সারাবছর ধরেই ফলের সমাহার। বরই গাছে কাঁটা নেই, পুরো গাছ জুড়ে শুধু বরই আর বরই। বাহারি রঙের আর স্বাদের কলার কাঁদি ঝুলছে, টসটসে আনার আর থোকা থোকা আঙ্গুর ও খেজুর যেন হাতছানি দিয়ে ডাকছে। নাম না জানা আরো হরেক রকমের ফলের গল্প বলে শেষ করা যাবেনা। আদামিশ্রিত শরবত কিংবা কাপুর মেশানো শরাব হজমীর রেসিপি। এটা খেয়ে ঢেঁকুর তুললেই হলো, ব্যস! মেশকের ঘ্রাণ তুলে সেই ঢেঁকুরের সাথে হজম হয়ে যাচ্ছে সবকিছু নিমিষেই। মেশকী ঘামের সাথে উবে যাচ্ছে দৈহিক নিষ্কাশন।

দফায় দফায় নানান অনুষ্ঠানে মুখরিত হচ্ছে বেহেশতের প্রাঙ্গন। জাঁকজমক এক অনুষ্ঠানে শহিদদেরকে পরানো হলো ‘মহান তাজ’। তাকবীরে তাকবীরে অনুরণিত হচ্ছে জলসা। শহিদদেরকে তাঁদের অনুভূতি জিজ্ঞেস করা হলো। উত্তর এলোঃ আমরা কামনা করি, আমাদেরকে আবারো দুনিয়াতে পাঠানো হোক। আমরা আল্লাহর জন্য জিহাদে অংশ নিয়ে আবারো শহীদ হবো। আবারো পাঠানো হবে, আবারো শহীদ হবো…

এক জায়গায় কিছু জান্নাতীরা বসে আড্ডা দিচ্ছিলো। হঠাৎ দুইজন ফেরেশতা এসে একজনকে বললো আপনাকে একটা অনুষ্ঠানে যেতে হবে। জান্নাতে সবকিছুই আনন্দের। তিনি উঠে ফেরেশতাদের সাথে চলে গেলেন। পিছু পিছু গিয়ে দেখা গেলো লোকটিকে আর স্ত্রীকে নূরের ‘সম্মানিত তাজ’ পরিয়ে দেয়া হচ্ছে। সাথে তাঁদের সন্তান। মা-বাবা অবাক হয়ে জানতে চাইলো- এটা কিসের জন্য?! তাঁদেরকে জানানো হলো, এ হলো আপনার হাফেজে কোরআন সন্তানের সম্মানার্থে প্রদানকৃত তাজ। তাঁদেরকে আরো সম্মানের আলখেল্লা ও অলংকার পরানো হলো। পুরো মঞ্চ জুড়ে হাফেজ ও তাঁদের পিতামাতার সমাবেশ। হাফেজদেরকে বলা হলো- এবার তোমরা যেভাবে দুনিয়াতে কোরআন তিলয়াত করতে সেভাবে পড়তে থাকো আর আয়াতে আয়াতে অর্জন করে নাও আয়াত সংখ্যক প্রাসাদের স্তর। এ এক অসম্ভব সুন্দর দৃশ্য!

আরেক অনুষ্ঠানে ন্যায়পরায়ণ শাসকদেরকে ‘রাজকীয় তাজ’ পরানো হচ্ছে। জমজমাট হয়ে উঠছে বেহেশতী পরিবেশ।

জান্নাতে মসজিদ আছে। দুনিয়াতে যারা আল্লাহর জন্যে মসজিদ নির্মাণ করেছিলো অনুরূপ জান্নাতেও তাঁদের জন্য বরাদ্দ করা আছে। সেসবেও ঢুঁ মারছেন তাঁরা। প্রত্যেক জান্নাতীর মালিকানায় একেকটি জগত। কী নেই সেখানে?! মুহুর্তেই তাঁদের ইচ্ছামত গড়ে উঠছে রকমারি কাঠামো, আবার মনে না ধরলেই তা অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে। পার্থিব জীবনের অভিজ্ঞতা আর শখ জান্নাতিদের মধ্যে রয়ে গেছে। কেউ বাগান করছেন শখের বশে। এই বীজ ছড়াচ্ছে তো পরমুহুর্তে তা ফসলে ভরে উঠছে। দুনিয়ার নিঃসন্তান দম্পতিদের কেউ কেউ আবার সন্তান গ্রহণের স্বাদ পেতে চাইছেন। বলতে না বলতেই চোখের পলকে গর্ভধারন ও জন্মদান হয়ে গেলো। আবার সেই শিশুটিও পলকেই ত্রিশ বছরের যুবক বা যুবতী হয়ে গেলো।

সর্বোচ্চ জান্নাতটা নবী-রাসূল ও সালেহীনদের। তবে সেখানে বিশেষ বিবেচনায় স্থান পেয়েছেন রাসুলুল্লাহ মুহাম্মদকে (সঃ) প্রাণ থেকে ভালোবাসা প্রতিটি মানুষ, তাঁকে মনেপ্রাণে অনুসরণ করা ব্যক্তি, অধিক সিজদা আদায়কারী, সচ্চরিত্রের অধিকারীরা, ইয়াতীমের দায়িত্ব নেয়া মানষগুলো, কন্যা সন্তানকে আদর যত্ন ও দ্বীনের উপর লালন-পালনকারীরা।

জান্নাতে আফসোসের স্থান নেই। যে যেখানে আছেন সেখানেই সুখী। চাইলেই প্রিয় মানুষদের সাক্ষাৎ পাওয়া যাচ্ছে। চাইলেই যা ইচ্ছা করা যাচ্ছে। শুধু চাওয়াটাই ব্যাপার। ছোট ছোট শিশুরা সারাক্ষণ প্রাণচঞ্চল করে রাখে। ফেরেশতারা নিয়ে যায় খোঁজ। হুরেরা গান গায়। প্রতিক্ষণ রাজকীয় ভোজ। স্ত্রীরা রাণী হয়ে আছে। স্বামীরা তাঁদের রূপে রোমাঞ্চিত ক্ষনে ক্ষণ। এখানে পাপ নেই, নেই শঙ্কার কোনো কারণ। মানুষের কল্পনার জগত যেমন অবারিত আর বর্ণিল, কল্পনার রঙে আর সাজে গড়ে উঠছে বেহেশতের পৃথিবী।

আরশ বরাবর বিশাল মিলনায়তন। থরে থরে সাজানো নূরের আসন। অদৃশ্য থেকে ঘোষণা আসলো সবাই যেন মিলনায়তনে আসন গ্রহণ করেন। এই ঘোষণাটি ছিলো প্রচন্ড সম্মোহনী, প্রত্যেকেই কী এক অমোঘ আকর্ষণে মিলনায়তনে এসে হাজির। কেউ কেউ ফিসফিসিয়ে টুকটাক গল্প করছে। হঠাৎ অদৃশ্য কোন ইশারায় পিনপতন নিরবতা নেমে আসলো জান্নাতজুড়ে। আরশের দিক থেকে ভেসে আসলো সেই বহুল আকাঙ্ক্ষিত কন্ঠঃ আমার প্রিয় বান্দারা, তোমাদেরকে আমি ভীষণ ভালোবাসি। এই বেহেশত আমি তোমাদের জন্য সাজিয়েছি। তোমাদের প্রতিটি মনোবাসনা পূর্ণের ব্যবস্থা করেছি। তোমাদের আর কিছু চাই কি?

জান্নাতীরা বললঃ ইয়া আল্লাহ! আপনি আমাদের মুখ উজ্জ্বল করেছেন। জান্নাতে প্রবেশ করিয়ে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দিয়েছেন। এর বেশি আর কীইবা হতে পারে?!

আল্লাহ বললেনঃ তোমরা কি চাওনা আমি তোমাদেরকে এর চেয়েও বেশি এমন কিছু দান করি যা আর সবকিছুকে ছাপিয়ে যাবে?!

এরপর আল্লাহ তাঁর পবিত্র আদি রূপ নিয়ে জান্নাতবাসীর দিকে তাকালেন। যে একমাত্র পর্দাটি এতদিন আড়াল করে রেখেছিলো মহাজগতের রহস্যকে, তা সরিয়ে নিলেন। জান্নাতীরা উপরে আরশের দিকে তাকিয়ে আল্লাহর প্রকৃত চেহ্রা দেখতে পেলেন। চারপাশের সবকিছু থেমে গেলো। বিশ্বজগতজুড়ে কেবল একটিই অস্তিত্ব! দয়াময় আল্লাহ!!

সেই জাদুমাখা সাক্ষাতের মধ্যেই শোনা গেলো আল্লাহর কন্ঠঃ আজ আমি তোমাদেরকে আমার সন্তুষ্টি উপহার দিলাম। আর নিজেকে আত্মপ্রকাশ করলাম আমার ভালোবাসায় তৃষ্ণার্ত প্রতিটি আত্মার জন্য। তোমরা চিরসুখে থাকো, চিরঞ্জীব হও।

এভাবে কতকাল কেটে যাবে জানিনা। কালের হিসাব আসছে কেন? কালের বিনাশ তো হয়েছে সেই কবেই!

লেখাঃ সাঈদুল মোস্তফা

৯ম পর্ব পড়ুন এখানে

Share this article

Leave a Reply

AllEscort