রাসূলের সাথে আখেরাতে- 6

Share this article
রাসূলের সাথে আখেরাতে আমাদের জীবনটা কেমন হবে? আসুন পড়ি ৬ষ্ঠ পর্ব

নিশ্ছিদ্র অন্ধকারের গুমোট পরিবেশ চিরে একটা শব্দই প্রতিধ্বনিত হচ্ছেঃ হে আল্লাহ, আপনি আমার উম্মতকে নিরাপদে পার করে দিন… মুহাম্মদ (সঃ) এর দেখাদেখি অন্যান্য রাসূলগণও নিজ নিজ উম্মতের পরিত্রাণের জন্য মিনতি জানাতে সিজদায় লুটিয়ে পড়লেন। চরম উৎকণ্ঠায় জমায়েত হওয়া মানুষগুলো তাকিয়ে আছে সামনের নিঃসীম অন্ধকারের দিকে। পুলসিরাতের তলদেশ থেকে উদগিরিত হচ্ছে জাহান্নামের ক্রোধান্বিত শ্বাসপ্রশ্বাস, যেন ক্ষুধার্ত কেউ ফোঁসফোঁস করছে শিকারের দিকে তাকিয়ে।

জান্নাতের দোরগোড়ায় জাহান্নামের উপর স্থাপিত হয়েছে সর্বশেষ কন্টকাকীর্ণ পরীক্ষাকেন্দ্র। পুলসিরাত যার নাম। দুর্লঙ্ঘ্য পিচ্ছিল ধারালো পারাপার। চুলের মত সূক্ষ্ম এই সাঁকো বহুমাত্রিক নাটকীয়তায় ভরপুর। পুরো কাঠামোজুড়ে ছুঁচোলো আংটা ও তীক্ষ্ণ বাঁকানো হুক, ‘সাদান’ কাঁটায় পরিপূর্ণ প্রতিটি ইঞ্চি। দুই কিনারায় কাঁটাযুক্ত লৌহশলাকা ঝুলানো। অপেক্ষমাণ মানবদেহ ছিন্নভিন্ন করে দিতে উৎ পেতে আছে।

হাশরের দীর্ঘ কাঠগড়ায় মুনাফিকরা ভাবছিলো দুনিয়ার মতো এখানেও তারা বুঝি ছলেবলে পার পেয়ে যাবে। কিন্তু পুলসিরাতের ফিল্টারিং এদেরকে বিশেষ করে আলাদা করার জন্যেই বসানো হয়েছে। এই সেতুর দুইপাশে অপেক্ষা করছে “আমানত” ও “আত্মীয়তার সম্পর্ক”। যারা দুনিয়াতে আমানত ও আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করতো তাদেরকে দুপাশ থেকে গাইড করার জন্য প্রস্তুত। পরীক্ষার্থী সবাইকে নিজ নিজ আমল অনুযায়ী আলো দেয়া হলো। শুরু হলো আমলের পাথেয় হাতে আলোর অভিযাত্রা।

মানবেতিহাসের বিভিন্ন সময়ে যত গরিব মুহাজির ছিল আজ ওরাই পুলসিরাত পারের সম্মুখ সারিতে। মুহাম্মদ (সঃ) তাঁর উম্মতের দরিদ্র মুহাজিরদলকে সাথে করে চলে গেলেন সেদিকে। ঘুটঘুটে আঁধারের দিগন্তে চোখের পলকে সেতু পার হয়ে যাচ্ছে পাহাড়সম আলোবাহী প্রথম অভিযাত্রীদল। তাঁদের পূর্ণিমা চাঁদের মতো উজ্জ্বল চেহারা এখান থেকেও দেখা যাচ্ছে। দুনিয়াতে এরা ছিলো পরিপূর্ণ আমলদার ব্যক্তি। আজ আমলগুলো নেমে এসেছে পথের দিশা হয়ে।

পরবর্তী দলের হাতেও আলোর ফোয়ারা, তবে সে আলো আগের দলের চেয়ে কম। বিদ্যুতের গতিতে তারাও পার হয়ে গেলো। আরেকদল আলোর মশাল হাতে বাতাসের গতিতে পেরিয়ে এলো ভয়ানক পুলসিরাত। এরপরের দল এক মুষ্টি আলো নিয়ে ছুটে পার হলো ঘোড়সওয়ারের মত। পুলসিরাতের কাঁটায় লেগে তাদের গায়ের চামড়া কেটে গেলো কী! এরপরের দলগুলো ছোট ছোট আলোয় (আমল অনুপাতে) পথ দেখে পার হতে গিয়ে ক্ষতবিক্ষত অবস্থায় হেঁটে পার হলো। যাদের কোনো আমলই ছিলোনা তারা পায়ের বুড়ো আঙ্গুলে খেজুর সমান আলো নিয়ে পুলসিরাত মাড়ালো। মিটিমিটি সে আলো একবার জ্বলে একবার নিভে। কোনো রকম হামাগুড়ি দিয়ে যখন তারা শেষ প্রান্তে পৌঁছল ততক্ষণে দেহ পরিণত হয়েছে রক্তাক্ত-পোড়া মাংসপিণ্ডে। প্রতি কদমে মুমি’ন নর-নারীর  দোয়া ছিলোঃ ইয়া রব্ব! আমাদের নূরকে পূর্ণতা দান করুন। আমাদেরকে ক্ষমা করে দিন।

এদের ফাঁকে ফাঁকে মুনাফিকরা ছদ্মবেশে পাড়ি দেয়ার চেষ্টা করেছে। তাদের কেউ পুলসিরাতে পা রাখতেই দ্বিখণ্ডিত হয়ে হারিয়ে গেল জাহান্নামের সত্তর হাজার ঋতুর সমান গভীর তলদেশে। স্তুপে স্তুপে পতনোন্মুখ দেহগুলো থেকে গগনবিদারী চিৎকার ভেসে আসছিলো। আর কেউ কিছুদূর যেতেই তাদের কাছে বিন্দুপরিমাণ যে আলো ছিলো তাও ধুপ করে নিভে গেলো, তখন তারা সামনে থাকা মু’মিন নর-নারীদেরকে বললঃ তোমরা একটু দাঁড়াও, একটুখানি আলো দিয়ে যাও…।

মু’মিনদল বললোঃ আবার ফিরে গিয়ে আলোর খোঁজ কর। সেই মুহুর্তে তাদের মাঝে একটি দেয়াল দাঁড়িয়ে যাচ্ছিলো, যে দেয়ালে একটি দরজা আছে, সে দরজা ধরে মু’মিনরা পথ পেরোচ্ছিলো। দেয়ালের এপাশে নূরভর্তি রহমত, ওপাশে আযাবের কুরুক্ষেত্র। মুনাফিকরা বলছিলোঃ আমরা কি তোমাদের সাথেই এতদূর আসিনি? মু’মিনরা উত্তর দিয়েছিলোঃ কিন্তু তোমরা ছলনার আশ্রয় নিয়েছিলে, দুনিয়াতে ডুবে ছিলে, অন্তরে ছিলো অবিশ্বাস। আজ কোনো কিছুর বিনিময় কিংবা উসিলা গ্রহণ করা হবেনা।

 পোড়া রক্তাক্ত মুনাফিকদের গুটি কয়েক একটু এগোতে পারলেও শেষমেশ ছিটকে পড়ল জাহান্নামের নিম্নস্তরে।

পুলসিরাত পাড়ি দিয়ে কঠিন পরীক্ষা পার হয়ে আসা মু’মিন নর-নারীরা পিছনে ফিরে তাকাচ্ছিলো ফেলে আসা বিভীষিকার দিকে। আর মস্তক অবনত হয়ে বলছিলোঃ সমস্ত কৃতজ্ঞতা আল্লাহর জন্য যিনি আমাদের দুঃখ দুর্দশা দূরীভূত করেছেন, তিনি পরম ক্ষমাশীল ও কৃতজ্ঞতার বিনিময় দানকারী। তিনি আমাদের জন্য অনুগ্রহ করে চিরস্থায়ী বাসস্থান প্রস্তুত করে রেখেছেন, যেখানে আমাদেরকে ক্লান্তি ও কষ্ট কখনও ছুঁতে পারবেনা।

পুলসিরাতের ওপারে বড়সড় আরেকটি সেতুসদৃশ পাটাতন। মু’মিন নর-নারীরা সেখানে সমবেত হয়েছেন। সাথে আছেন নবী-রাসূলগণ, শহিদগণ, সালেহিন ও সিদ্দিকীন। অদূরেই জান্নাতের ঝলমলে দরজা দেখা যাচ্ছে। সন্নিবেশিত ফেরেশতারা দাঁড়িয়ে আছেন জান্নাতের আঙ্গিনায়। কিন্তু এখনও দরজা খুলছেনা কেনো? জান্নাতে প্রবেশের কোনো আয়োজন দেখা যাচ্ছেনা। জান্নাতপ্রত্যাশীদের যে আর তর সইছে না। এত এত ধকলের পর জান্নাতের নেয়ামত পেতে তৃষ্ণার্ত হয়ে আছে হৃদয়। কিন্তু কিছু একটা এখনও বাকী আছে মনে হচ্ছে।

ফেরেশতারা নেমে আসতে শুরু করেছেন… হাতে বড় বড় হিসাবপত্র… মনে হচ্ছে নতুন কোনো বিচারিক কাঠগড়ার মুখোমুখি হতে চলেছে জান্নাতপ্রত্যাশীরা। দুরুদুরু বুকে সেদিকে তাকিয়ে আছে তাঁরা।

পড়ুন ৫ম পর্ব

সিরাতের বই কিনতে ভিজিট করুন ইকরাহাউজ বুকশপ

Share this article

Leave a Reply

Your email address will not be published.