রাসূলের সাথে আখেরাতে-9

Share this article
আখেরাতের নবী || গল্পসিরাত || অন্যরকম সিরাত ||
রাসূলের সাথে আখেরাতে আমাদের জীবনটা কেমন হবে? আসুন পড়ি ৯ম পর্ব

জাহান্নামের অনেক স্তর। সর্বনিম্ন স্তরে জ্বলছে মুনাফিকরা। আর একেবারে উপরের স্তর যেখান থেকে পুলসিরাত আর জান্নাতের বহিরাংশ দেখা যায় সেখানে প্রায়শ্চিত্য চলছে পাপী মু’মিনদের। আর মাঝের অগ্নিগর্ভ স্তরগুলো কাফেরে ঠাসা। শাস্তির যন্ত্রণার মধ্যেও কাফেররা টিটকারি দিতে ভুলছে না, মু’মিনদেরকে উদ্দেশ্য করে বলছেঃ দুনিয়াতে তোমরা তো আল্লাহকে খুব তোমাদের অভিভাবক দাবি করতে, আজ তোমরা এখানে কেন? জাহান্নামীদের এই টিটকারী শুনে আল্লাহ আর সহ্য করলেন না। মু’মিনদেরকে জাহান্নামেই তিনি এক ধরণের মৃত্যু দান করলেন। যাতে কাফেরদের টিটকারী তাদেরকে শুনতে না হয়, শাস্তি ভোগটাও লাঘব হয়ে আসে। কিন্তু ততদিনে পৃথিবীর হিসাবে ৫০ হাজার বছর অতিবাহিত হয়ে গিয়েছে। আগুনের লেলিহান শিখায় পুড়ে অঙ্গার হয়ে গেছে নাজুক দেহ।

জান্নাতের নেয়ামত যেমন বর্ণিল, জাহান্নামের শাস্তিও তেমন ক্ষণে ক্ষণে নবায়ন হচ্ছে, ধরণ বদলাচ্ছে। জ্বলতে জ্বলতে চামড়া খোলসের মত আলগা হয়ে গেলে নতুন চামড়া পরিয়ে দেয়া হচ্ছে। ছাতিফাটা পিপাসায় মুখ খুললেই রক্তপুঁজ পান করানো হচ্ছে। ক্ষুধার নাম মুখে আনতেই গিলিয়ে দেয়া হচ্ছে তিতকুটে বিষাক্ত যাক্কুম বৃক্ষ। বুকফাটা চিৎকার আর গলগলে ধোঁয়ার মাঝে আক্ষরিক অর্থেই এ এক নারকীয় পরিবেশ। আযাবের ফাঁকে কদাচিৎ উপর দিকে দৃষ্টি গেলেই দেখা যায় জান্নাতের সবুজাভ চাকচিক্যের নেয়ামত। আত্মার গভীর থেকে বেরিয়ে আসা হতাশা আর আক্ষেপ জাহান্নামের আগুনকে যেন আরো বেগবান করে দিচ্ছে।

জান্নাতবাসীরা আপনজনদের খুঁজে খুঁজে হয়রান। ভাই-বন্ধুদের অনুপস্থিতিতে মনের কোথায় যেন খচখচ করে চলেছে। জান্নাতের যে কার্নিশ থেকে জাহান্নাম দেখা যায় ওখানে সবাই জমায়েত হয়ে উঁকিঝুঁকি দিয়ে দেখার চেষ্টা করছে পরিচিতদের দেখা যায় কিনা। কারো কারো দেখাও মিলছে। জান্নাতীদের মনোবাসনা আল্লাহ বুঝতে পারলেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) নতুন করে আল্লাহর দরবারে মিনতি জানালেনঃ ইয়া রব্ব! আপনি আমাকে ওয়াদা দিয়েছিলেন, আমার উম্মতকে আপনি জাহান্নাম থেকে মুক্ত করবেন। আল্লাহ ঘোষণা দিলেনঃ যাও, তোমাদের পরিবার পরিজনদের যাদের মধ্যে ১ দিনার পরিমাণ ঈমান আছে তাঁদেরকে বের করে আনো।

শহিদ, নেককার উলামা, হাফেজরা বিশেষ সুপারিশ করার সুযোগ পেয়েছেন। তারাও তাঁদের আত্মীয়-স্বজনদের মধ্যে জাহান্নামে চলে যাওয়া লোকদের ফেরত আনছেন। ফেরেশতাদের সহায়তায় উদ্ধার করে আনা হচ্ছে মুক্তিপ্রাপ্তদের। আবারো আল্লাহর ঘোষণা শোনা গেলোঃ অর্ধ-দিনার সমপরিমাণও যাদের অন্তরে ঈমান আছে তাদেরকেও নিয়ে আসো মুক্ত করে। তাদেরকেও উদ্ধার করা হলো। এবার ফেরেশতাদের মায়াবি চাহনি দেখে আল্লাহ বললেনঃ ঠিক আছে, যাও। যাদের অন্তরে সরিষাদানা পরিমাণ ঈমানও আছে তাদেরকেও ক্ষমা করে দিলাম। তুলে আনো ওদেরকে।

জান্নাতময় টুকটুক করে খেলে বেড়ানো শিশুরাও এবার বায়না ধরলো, আমরাও আমাদের মা বাবা-ছাড়া এখানে থাকবো না। আমাদের বাবা-মা চাইই চাই। শৈশবেই মা-বাবার কোলে মৃত্যু হয়েছিলো তাঁদের। এদের মধ্যে রাসূলুল্লাহর পুত্র সন্তানরাও আছে। নিষ্পাপ এই শিশুদের কথাও আল্লাহ ফেলতে পারলেন না। তিনি তো তাঁর দয়ার ৯৯ ভাগই রেখে দিয়েছেন আখেরাতের জন্য। দয়াময় আল্লাহ শিশুদের এই আবেদন মঞ্জুর করে নিলেন।

এবার আল্লাহ বললেনঃ নবীদের সুপারিশ প্রয়োগ হয়েছে, জান্নাতীদের সুপারিশও কবুল করেছি, ফেরেশতাদের সুপারিশও রেখেছি। এখন আমি বিশ্বজগতের প্রতিপালকের পালা। জাহান্নামের উপরের স্তরে আযাবে ভাসমান বিপুল পরিমাণ পাপী মুসলিমদেরকে তিন তিনবার করে আল্লাহ তিন মুষ্টিতে তুলে আনলেন। এদের অন্তরে শুধু ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ই ছিলো। তন্ন তন্ন করে খুঁজেও এদের আমলনামায় কোনো ভালো কাজের হদিস পাওয়া যায়নি। মুসলিমদের এমন দলে দলে জাহান্নামমুক্তি দেখে আযাবে জর্জরিত কাফেরদের বুক চিরে বেরিয়ে আসলো আফসোসঝরা আর্তনাদঃ আহ! নিদেনপক্ষে যদি শুধু মুসলিমটুকু হতাম!

জান্নাতমুখে একটা বিরাট সরোবর আছে, নাম তার ‘আবে হায়াত’, দগ্ধপোড়া দেহগুলোকে এখানে পরিচ্ছন্ন করা হচ্ছে জান্নাতের জন্য। জান্নাতবাসীদেরকেও বলা হলো মুক্তিপ্রাপ্ত ভাই-বোনদের উপর জান্নাতের অমিয়ধারা থেকে পানি ঢালার জন্য। আবে হায়াতের ছোঁয়া পেয়ে দেহগুলো যৌবনভরা তৃণলতার মত চিরনবীন রূপ ধারণ করলো। যখন তাঁরা জান্নাত অভিমুখে এগিয়ে আসছিলো দেখে মনে হচ্ছিলো হীরকখণ্ডের জ্বলজ্বলে মিছিল। জহরতমোড়া মাল্য দিয়ে তাঁদেরকে জান্নাতের দরজায় বরণ করে নেয়া হচ্ছিলো। জান্নাতবাসীরা বলাবলি করতে লাগলোঃ এরা রহমানের মুক্তিপ্রাপ্ত বান্দা। নতুন করে আরেকবার ঈদের আমেজ বয়ে গেলো জান্নাতজুড়ে।

আবে হায়াত থেকে নতুন জীবন নিয়ে একে একে জান্নাতপাণে ছুটছে মুক্তিপ্রাপ্তরা। সর্বশেষ যে মানুষটা উঠে দাঁড়ালো তাঁর বিশ্বাসই হচ্ছেনা সে অগ্নি-কারাগার থেকে মুক্তি পেয়েছে। তাঁর মুখ থেকে অজান্তেই বেরিয়ে এলোঃ তিনি কতইনা মহিমান্বিত যিনি আমাকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দিয়েছেন!
মুখ তুলে তাকাতেই তাঁর দৃষ্টি কেড়ে নিলো বহির্জান্নাতের পুষ্পকানন। পড়িমরি করে সেদিকে ছুটতে ছুটতে সে বললোঃ ইয়া আল্লাহ, আপনি আমাকে এটি দান করুন।
গায়েব থেকে আওয়াজ আসলোঃ আচ্ছা, আমি যদি এই উদ্যান তোমাকে দিই, এরপর আর কিছু চাইবে কি?
সে বললঃ না ইয়া রব্ব, আমি আর কিছুই চাইনা। ব্যস এটুকুই।
এরপর সে উদ্যানে পৌঁছে এর প্রশান্তিদায়ক ছায়ায় জিরালো, পানি পান করলো। আর বললোঃ আল্লাহর শুকরিয়া, তিনি আমাকে যা দিয়েছেন তা বুঝি মানবজাতির আর কাউকে দেননি।
একটু পর অদূরেই বেহেশতের দোরগোড়ায় তাঁর নজর কাড়লো আরো মনোরম একটি বাগান। এটি আগেরটির চেয়েও মুগ্ধকর। সে বললোঃ ইয়া আল্লাহ, আমি এটি চাই।
আল্লাহ বললেনঃ তুমি না আমাকে কথা দিয়েছিলে আর কিছু চাইবে না।
সে বললোঃ জ্বী। তবে এবারই শেষ। আর কিছু চাইবো না।
আল্লাহর অনুমতি পেয়ে সে ছুটলো বেহেশতের দরজা সংলগ্ন বাগানের দিকে। সেখানে পৌঁছতেই তাঁর কানে আসলো জান্নাতীদের মিষ্টি মধুর আলাপচারিতা। এবার সে বায়না ধরলোঃ আল্লাহ, আমাকে এখানে প্রবেশ করিয়ে দিন।
আল্লাহ বললেনঃ আচ্ছা, তোমায় যদি দুনিয়া সমান একটা জান্নাত দিই, সেইসাথে আরো একখান সেরকম অতিরিক্ত জান্নাত দিই তাহলে কি তুমি খুশি হবে?!
বিস্ময়ে বিমূঢ় লোকটি বললোঃ বিশ্বজগতের প্রতিপালক হয়ে আপনি আমার সাথে উপহাস করছেন?!

লোকটির এই কথা শুনে আল্লাহ হেসে দিয়ে বললেনঃ আমি ঠাট্টা করছিনা। শুনো, আমি কিন্তু যা চাই তা করতে পারি। তুমি ইতিমধ্যেই তা জেনেছো।

চলবে…

লেখাঃ সাঈদুল মোস্তফা

৮ম পর্ব পড়ুন এখানে

Share this article

Leave a Reply

Your email address will not be published.