যুদ্ধই আবিষ্কারের পসরা মেলে ধরে

যুদ্ধের আবিষ্কার

মুসলিমরা প্রযুক্তিতে পিছিয়ে। কেন? কারন তারা নাকি শিক্ষা দীক্ষায় অনেক পিছিয়ে। কিন্তু ইতিহাস দিচ্ছে ভিন্ন তথ্য। আসলে জিহাদ ও যুদ্ধ থেকে বিমুখ হওয়ার কারণেই মুসলমানরা প্রযুক্তিতে পিছিয়ে পড়েছে।
.
বর্তমান যেসব প্রযুক্তি আমাদের হাতের নাগালে, যে প্রযুক্তি নিয়ে আমাদের সুশীলদের গর্বের শেষ নেই তার ৯০% ভাগই আবিষ্কৃত হয়েছে সিভিল ওয়ার, ইসলামী রাষ্ট্রের যুদ্ধ, প্রথম বিশ্বযুদ্ধ, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, স্নায়ু যুদ্ধ ও সাম্প্রতিক মার্কিন সন্ত্রাসবাদী আগ্রাসনের প্রাক্কালে।
.
যুদ্ধকালীন সময়ে উদ্ভাবিত জিনিসপত্র ও প্রযুক্তির তালিকা দেখলে আপনার চোখ কপালে উঠবে। কি নেই সেখানে? ন্যাপকিন থেকে শুরু করে টি-ব্যাগ কিংবা ইন্টার্নেট থেকে শুরু করে এক্স-রে। সবই যুদ্ধকালীন সময়ের চাহিদা মেটাতে আবিষ্কৃত হয়েছে।


বিভিন্ন গৃহযুদ্ধ

আমেরিকান সিভিল ওয়ারের সময় মিলিটারিদের জন্য সর্বপ্রথম টেলিগ্রাফ ব্যবহিত হয়। প্রেসিডেন্ট লিংকনের নির্দেশেই গৃহযুদ্ধকালীন সময়ে রেললাইন আবিষ্কৃত হয় ও মিলিটারি সাপ্লাইয়ের কাজে ব্যবহিত হয়। এ সময় এম্বুল্যান্সের আবিষ্কারও ঘটে। ১৮৬১-১৮৬৫ সালের বিভিন্ন গৃহযুদ্ধের পরিক্ষামূলক আবিষ্কারের ফলে মিনি বুলেট আবিষ্কার হয় যা দূরপাল্লা অতিক্রম করার সামর্থ্য রাখতো। এ সময় মাইনও আবিষ্কার হয়। যুদ্ধে নিহত সৈন্যদের লাশ ফিরে আসা পর্যন্ত পচনরোধ করতে গিয়ে আবিষ্কার হয় লাশ সংরক্ষণ পদ্ধতি। যুদ্ধের ফলে হাত পা হারানো সৈন্যদের জন্যে আবিষ্কার হয় কৃত্রিম হাত পা


১ম বিশ্বযুদ্ধ

ডে-লাইট সেভিং‘ সিস্টেম প্রথম কার্যকর হয় ১ম বিশ্বযুদ্ধে। যুদ্ধের সৈনিকদের চা ও খাবারের ব্যবস্থা করতে জার্মানী প্রথম টি-ব্যাগ ও টিনজাত খাবার আবিষ্কার করে। হাতঘড়ির আবিষ্কার হয় প্রথম বিশ্বযুদ্ধে যুদ্ধরত সেনাদের সময়ের হিসাব রাখার সুবিধার্থে। সর্বপ্রথম প্যান্টের জিপার উদ্ভাবিত হয় আমেরিকান সৈন্যদের জন্যে। বন্দুকের জন্য আরো মজবুত কাঠামো তৈরির চেষ্টা করতে গিয়ে ব্রিটিশ সেনারা ‘স্টেইনলেস স্টীল‘ আবিষ্কার করে ফেলে। এই যুদ্ধে প্রচুর পরিমাণ যোদ্ধা নিজেদের চেহারার আকৃতি হারানোর ফলে আবিষ্কৃত হয়ে যায় প্লাস্টিক সার্জারি।
.
ড্রোন। এই মাত্র কদিন হলো আমরা ড্রোনের কথা শুনছি, ১৯১৮ সালের ৬ মার্চ সর্বপ্রথম পাইলটবিহীন বিমান দিয়ে বোমা ফেলার চেষ্টা করা হয়। আমেরিকা কর্তৃক এয়ার-ট্রাফিক সিস্টেম আবিষ্কৃত হয় প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়। বহনযোগ্য এক্স-রে মেশিন আবিষ্কৃত হয় ফ্রেঞ্চ আর্মির বদৌলতে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে। এই সময়ে জার্মান যোদ্ধাদের দ্বারা আবিষ্কৃত হয় ক্লোরিন


২য় বিশ্বযুদ্ধ

রাডার আবিষ্কার করতে গিয়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় কাকতালিয়ভাবে মাইক্রোওয়েভ আবিষ্কৃত হয়। পরে রাডারও আবিষ্কার করা হয়। আমেরিকা ও রাশিয়ার মধ্যে স্নায়ুযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে নাসা কর্তৃক আবিষ্কৃত হয় ডিজিটাল ক্যামেরা। আর সেই ক্যামেরায় ধারন করা ছবি পাঠানোর জন্যে উদ্ভাবিত হয়ে পড়ে ইন্টারনেট। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ইনিগমা কোড ভাঙ্গার প্রক্রিয়া আবিষ্কার করতে গিয়েই উদ্ভাবিত হয়ে পড়ে শতাব্দীর সবচেয়ে বড় আবিষ্কার- কম্পিউটার। প্রথমবারের মত বলপয়েন্টও আবিষ্কার হয় এই সময়েই যুদ্ধবিমানের পাইলটদের জন্য। ফটোকপি মেশিনের মতো গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কারও ২য় বিশ্বযুদ্ধের ফলাফল। জার্মান সৈন্যদের হাতে এ সময় আবিষ্কার হয় নাইট ভিশন প্রযুক্তি। এছাড়া তারা জোয়ার-ভাটা নির্ণয় যন্ত্রের আবিষ্কারও করে এই যুদ্ধের সময়ে।
.
খেলনা, চকোলেট, সস, গাম, সুপারগ্লূ, টেপ, নাইলনের পোশাক সবই যুদ্ধের অবদান। ট্রেন, ট্রাক, ট্যাঙ্ক, জাহাজ, জেট ইঞ্জিন, বিমান এগুলোও যুদ্ধের কারণে অস্তিত্বলাভ করেছে। পেনিসিলিন, কেমিক্যাল, রিমোট, টর্চলাইট ইত্যাদি এসবও যুদ্ধের কল্যাণে পেয়েছে মানবসমাজ।


স্নায়ুযুদ্ধ

এটিএম বুথ, ক্রেডিট কার্ড, ট্রান্সিস্টর, স্যাটেলাইট, মহাকাশ অভিযান, ল্যাজার, কম্পিউটার, সেলফোন, এগুলো সব স্নায়ুযুদ্ধের ফলাফল।

ইরাক আফগান আগ্রাসন

২০০২ এর আফগান যুদ্ধের ফলে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে অনেক মার্কিন সেনা মারা যায়। এই রক্তক্ষরণ দ্রূত বন্ধ করার জন্য আবিষ্কৃত হয় “টার্নিকুয়েট” নামের ঔষধ। তৎক্ষণাৎ এনার্জি পেতে এই আফগান আগ্রাসনের সময়েই “ফিব্রিন ব্যান্ডেজ” আবিষ্কৃত হয় যা একইসাথে ঘা সারায় আবার এনার্জি দেয়। তাৎক্ষণিক কাটা-ছেড়া জোড়া লাগানোর প্রক্রিয়া নিয়ে কাজ করতে গিয়েই এই সময়ে মার্কিন চিকিৎসকরা “চিটোসান ব্যান্ডেজ“ও উদ্ভাবন করে ফেলে। ৩৪ থেকে ৪৩ ডিগ্রি তাপমাত্রায় রক্ত সংরক্ষনের মত পাত্রও আবিষ্কৃত হয় এই আফগানে এই আমেরিকান জঙ্গীদের মাধ্যমে যার নাম “গোল্ডেন ব্লাড কন্টেইনার“।
.
ইরাক যুদ্ধের সময়ে রবোটিক মেডিক্যালাইজ প্রথমবারের মত ব্যবহিত হয়। গণহারে মার্কিন সেনাদের আহত হওয়ার কারণে পর্যাপ্ত চিকিৎসক দিয়ে সামলানো যাচ্ছিলনা। আবার “ট্রমা” আক্রান্ত সেনার সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছিল, পরে “হাইপারবেরিক অক্সিজেন থেরাপী” আবিষ্কৃত হয় আক্রান্তদের ট্রিটমেন্ট দিতে।

উপরের এত সব আবিষ্কারের উপর ভিত্তি করে পরে আরো উন্নত ও রকমারি আবিষ্কার ও উদ্ভাবনের দেখা পায় বিশ্ব। যেমন স্যাটেলাইটের কারণে জিপিএস। আধুনিক সাবমেরিন ও ড্রোনআবহাওয়ার রাডাররাবারের টায়ারডিজিটাল ক্যামেরাব্লাড ব্যাংক। এনিগমা কোড থেকে পরবর্তীতে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের ধারণা আসে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বিমানগুলোতে প্রেশারাইজড সিস্টেম না থাকায় পাইলট ও যাত্রীদেরকে অক্সিজেন মাস্ক পরে থাকতে হতো, এর উপর ভিত্তি করে উচ্চতর গবেষণায় আবিষ্কৃত হয় আধুনিক বিমানের কেবিন।


ইসলামী খেলাফতসমূহ

মেকানিকাল ঘড়ি” আবিষ্কার হয় উসমানী খেলাফতের যুদ্ধগুলোতে। “স্টীম পাওয়ার“, অবজারভেটরী (পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র), সেক্সট্যান্ট (তারকাদের দূরত্ব মাপার যন্ত্র), মানচিত্র সহ নানান যুদ্ধাস্ত্র উদ্ভাবিত হয়েছিল উসমানী খেলাফতের বিভিন্ন যুদ্ধের প্রাক্কালে। এছাড়া প্রথমবারের মতো স্থায়ী সেনাবাহিনী পদ্ধতি আবিষ্কার করে উসমানী খেলাফত। সুলতান দ্বিতীয় মেহমেদের শাসনামলে তাদের আগ্নেয়াস্ত্র দিয়ে সুসজ্জিত করা হয় এবং এটিই “বিশ্বের প্রথম স্থায়ী পদাতিক বাহিনী” হয়ে ওঠে।

অটোম্যান মিশরের দার্শনিক, জ্যোতির্বিদ এবং প্রকৌশলী তাকী আল-দ্বীন দ্বারা একটি ব্যবহারিক ইমালস স্টিম টারবাইনটি প্রথম বর্ণনা করা হয়েছিল, যিনি বাষ্পের জেটের সাহায্যে একটি ইঞ্জিন ঘোরানোর পদ্ধতি বর্ণনা করেছিলেন। এটিও ছিলো যুদ্ধ-পরিবহন কাজে উন্নতি আনার কাজে। এছাড়া তিনি বাষ্পীয় জ্যাকও আবিষ্কার করেন।

স্প্যানিশ ইসলামী শাসনামলে যুদ্ধাহতদের ব্যাথা উপশমের জন্য যাহরাওয়ী ইবনে যুহর আবিষ্কার করেন ইনহ্যালেশন এনেস্থেশিয়া

বারোশ শতাব্দীতে আল-জাজারি যুদ্ধাহত সৈন্যদের চিকিৎসা করতে গিয়ে আবিষ্কার করেন রক্ত পরিমাপক ডিভাইস। এছাড়া আল-জাজারি সম্পর্কে ইংরেজ প্রযুক্তি ইতিহাসবিদ ডোনাল্ড হিল লিখেছেন, “আমরা আল-জাজারির কাজে প্রথমবারের মত নকশা এবং নির্মাণ উভয়ের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বেশ কিছু ধারণা দেখতে পাই: কাঠের ল্যামিনেশন, চাকার স্থির ভারসাম্য, কাঠের টেমপ্লেট ব্যবহার , এবং বালির সঙ্গে বন্ধ ছাঁচ বাক্সে ধাতু ঢালাইয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ মৌলিক উদ্ভাবন তার মাধ্যমেই এসেছে।” এছাড়া আল-জাজারি পানির পাম্পও আবিষ্কার করেন। এসব কিছুর পেছনেও ছিলো যুদ্ধ পরিকল্পনার প্রভাব।

১২৭৫ সালে টর্পেডো আবিষ্কার করেন হাসান আল-রম্মাহ। তিনি বর্ণনা করেছিলেন “… একটি ডিম যা নিজেই নড়ে এবং জ্বলে ওঠে”। এছাড়া মুসলিম শাসনামলে ম্যাগ্নিফাইং গ্লাস আবিষ্কৃত হয় যা যুদ্ধক্ষেত্রে দূরবীনের প্রাথমিক সংস্করণ মনে করা হয়। সাবান এবং টুথব্রাশও মুসলিম বিজ্ঞানীদের জরুরি অবস্থার জন্য চিন্তা করতে গিয়ে আবিষ্কার হয়েছে।

১৬ শ শতাব্দীতে মোঘল সম্রাট সর্বপ্রথম সানবালের যুদ্ধের সময় যুদ্ধের হাতির বিরুদ্ধে ধাতব সিলিন্ডার রকেট ব্যবহার করেন। মুসলিম শাসনামলেই হাসপাতালসার্জিক্যাল যন্ত্রপাতি আবিষ্কার হয়। বলাই বাহুল্য এর পেছনে ছিলো যুদ্ধের অবদান।

আধুনিক সময়ে ফিলিস্তিনের যোদ্ধাদের হাতে কোনো সামর্থ্য না থাকা সত্বেও তারা আবিষ্কার করে চলেছে জীবন বাজি রাখার নানান প্রযুক্তি, বেঁচে থাকার বিভিন্ন প্রযুক্তিময় উপায়। ঘুড়ির সাথে আগুন পাঠিয়ে তারা দেখিয়েছে উড়ন্ত অগ্নি প্রেরণের আবিষ্কার। রাশিয়ানদের ফেলে যাওয়া মরচে খাওয়া অস্ত্রের উপর তালেবানরা যোগ করেছে নিজস্ব প্রযুক্তি। আবিষ্কার করেছে শত্রুপক্ষকে ফাঁকি দিতে সক্ষম এমন ওয়াকি-টকি


কি বুঝলেন? প্রযুক্তিতে মুসলমানরা ততদিন পিছিয়ে থাকবে যতদিন জিহাদ বিমুখ হয়ে ফেসবুকে ডুবে থাকবে। আর আমেরিকা এগিয়ে যাবে, ওরা কখনোই যুদ্ধ থামাবেনা। ওরা জেনে গেছে যুদ্ধ কত কিছুর পসরা মেলে ধরে। এটা সবসময়ের জাগতিক নীতি। যুদ্ধই চাহিদা সৃষ্টি করে। আর চাহিদা আবিষ্কারের প্রসূতি।

Share with your friends

Share on facebook
Facebook
Share on twitter
Twitter
Share on skype
Skype
Share on whatsapp
WhatsApp
Share on email
Email
Share on print
Print

Write your comment below