সূরা ফাতিহাঃ ইসলামী আক্বীদার অব্যর্থ তীর

সূরা ফাতিহা

পৃথিবীতে যত মতবাদ কিংবা ধর্ম এসেছে প্রত্যেকটার আছে নিজস্ব বিশ্বাস ও ভিত্তি। যেহেতু ইসলাম সব মতাদর্শ ও ধর্মের উপর বিজয়ী হতে এসেছে তাই বাকী সব ভুঁইফোড় বিশ্বাসের গোঁড়ায় কুঠারাঘাত করা ইসলামের মূল মিশনের একটি অংশ।
.
সূরা ফাতিহার অনেকগুলো নামের মধ্যে একটি হলো ‘আসাস’, অর্থ- মূল ভিত্তি। যে শিকড়ের সামনে অন্যান্য পরজীবী উদ্ভিত দাড়াতে পারেনা। সূরা ফাতিহা কিভাবে ভুল আক্বীদাগুলোর মূলোৎপাটন করে?
.
তোরাহ এবং বাইবেলের ইশ্বর শুধুমাত্র ইহুদী ও খৃষ্টান জাতিরই ইশ্বর। ওল্ড কিংবা নিউ টেস্টামেন্টে বর্নিত ইশ্বর গোটা মানবজাতিকে নিয়ে কখনোই ভাবেনি। সবখানেই বনী ইসরাঈলের ইশ্বর কিংবা নাজারানের ইশ্বর বলেই অভিহিত হয়েছেন। এই সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গির স্রষ্টার প্রতি চ্যালেঞ্জ জানিয়ে পবিত্র কোরআনের প্রথম আয়াত-

“সকল প্রশংসা একমাত্র আল্লাহর, যিনি জগতসমূহের প্রতিপালক।” 

শুধু মুসলমান কিংবা মানবজাতির নয়, বরং প্রতিটি সৃষ্টি ও প্রতিটি জগতের প্রতিপালক।
.
পারসিয়ান জরথুস্ত্র ধর্মে দ্বৈতবাদ বা দুই স্রষ্টার বিশ্বাস আছে। মঙ্গল ও আলোর জন্যে এক স্রষ্টা, মন্দ ও আঁধারের জন্য এক স্রষ্টা। হিন্দু ধর্মের কিছু কিছু শাখাতেও এই প্রথা আছে। আবার কনফুসিয়াসিজম ও টাওইজমেও এই বিশ্বাসকে লালন করা হয়। সূরা ফাতিহার দ্বিতীয় আয়াতে আল্লাহ্‌ এই সব বিশ্বাসকে শুধু মূলোৎপাটনই করেননি বরং এ বিষয়ে বাস্তবসম্মত প্রকৃত আক্বীদা কি হওয়া চায় তা বাতলে দিয়েছেন।
দ্বিতীয় আয়াত বলছে-

“যিনি পরম দয়ালু ও দয়াময়”। 

“রহমান” ও “রহীম” উভয় গুন একই মৌল থেকে এসেছে। রহমত শব্দ থেকে। তাহলে দু রকম করে ‘রহমান’ আবার ‘রহীম’ বলার কি দরকার? মুফাসসিরগণ বলেন- আল্লাহ্‌ হলেন কাফের ও মুসলিম উভয়ের জন্যই রহমান। আর রহীম শুধুমাত্র মু’মিনদের জন্য। সূরা আহযাবের ৪৩ নং আয়াতে আল্লাহ্‌ বলছেন-

“তিনি মু’মিনদের জন্য ছিলেন রহীম”।

ইমাম ত্বহাবী বলছেন-

এই পৃথিবীতে আল্লাহর পক্ষ থেকে যা কিছু ফায়সালা হয় তার প্রতিটিই মানুষের জন্য কল্যাণজনক। মানুষের বিবেচনায় কিছু ঘটনা কদাচিৎ মন্দ বা অমঙ্গল মনে হলেও তা বরাবর আল্লাহর দয়া ও হেকমতের আওয়াতাধীন। যেমন কারো পিতা মারা গেল বা সম্পদ হারালো। আপাতদৃষ্টিতে তা দুর্ভাগ্য মনে হলেও যিনি গোটা তাকদীর পরিচালনা করছেন তিনি ভালো করেই জানেন এ সিদ্ধান্ত ভালোর জন্যেই ছিল।

(শরহ আক্বীদাতুত ত্বাহাবী- ১/৫৫২)

রাসূলুল্লাহ (স) বলেছেন-

“হে আল্লাহ্, মন্দ তো তোমার দিকে সম্বন্ধিত নয়”। 

তাই ইসলামী আক্বীদায় মন্দের কোনো স্থান নেই। আমরা যা মন্দ হিসেবে দেখি তাও আল্লাহর পক্ষ থেকে শুভ ও মঙ্গল হিসেবেই সূচিত হয়ে আসে।
.
পরবর্তী আয়াতটি পৌত্তলিক ধর্মের গোঁড়ায় আঘাত।

“তিনি বিচার দিবসের মালিক”। 

আল্লাহ্ হাশরের মাঠের, হাশরের দিনের একচ্ছত্র মালিক এবং হাশরের বিচারকার্যের নিরংকুশ সঞ্চালক। হিন্দু ধর্ম সহ বৌদ্ধ ধর্মের একটি বিশ্বাস হলো মৃত্যুর পরপর ব্যক্তির কর্মফলের পরিণতি হয়ে যায় বিড়াল কুকুর হয়ে আবার পৃথিবীতে আসা বা ‘জন্মান্তরের’ মাধ্যমে। আর এর চূড়ান্ত পরিণতি হলো “নির্বান” নামের বিলীনতার মাধ্যমে। অর্থাৎ চূড়ান্ত কোনও বিচার-হিসাব নেই। অর্থাৎ এটিও এক ধরণের নাস্তিকতা। সূরা ফাতিহার ৩য় আয়াতে আল্লাহ্ এই অবাস্তব বিশ্বাসকে ভেঙ্গে দিয়ে বলছেন- বিচারের মুখোমুখি তো প্রত্যেকে হবেই, সেই বিচারকার্য হবে বিশাল সমাবেশে।
.
এরপরের আয়াতে বস্তুবাদী চিন্তা-চেতনা ও বিশ্বাসকে নির্মূল করা হয়েছে। “আমরা কেবল আপনারই ইবাদত করি, কেবল আপনার কাছেই সাহায্য চাই”। অধুনা বিশ্ব নিত্যনতুন মতবাদ ও বিশ্বাসের ডালপালা ছড়াতে দেখছে আর সেই ফাঁদে পা দিচ্ছে। ‘ইলুমিনাতি’র বিশ্বাস, ‘লুসিফারে’র পূজা অর্চনা, ব্ল্যাকম্যাজিকের বেদীর মত কাল ফাঁদে যেন মানুষ না পরে সেই রক্ষাকবজ জানিয়ে দেয়া হয়েছে এই সূরার ৪র্থ আয়াতে। কম্যুনিজমের ভয়াল থাবা, পূজিবাদের বিষ, সেক্যুলারিজমের চক্রান্ত, সমাজতন্ত্রের নাগপাশের কাছে যেন হাত পেতে না বসে সেই দীক্ষা দেয়া হচ্ছে।
.
এরপরের আয়াত থেকে আহলে সুন্নাতের আক্বীদার কাঠামো দেখতে পাই আমরা। যে আক্বীদা মধ্যপন্থী, যে বিশ্বাস অতিরঞ্জন ও সংকীর্ণতার মাঝামাঝি, যে সিদ্ধান্ত ও মতামত সহজ সরল পথের বাহিরের সব ভুয়া বিশ্বাসকে দূরীভূত করে। “আমরা হক পথের দিশা চাই, যে পথের পথিক আপনার অনুগ্রহপ্রাপ্ত বান্দারা, এই পথের বাহিরে অবস্থান করা অভিশপ্ত ও পথভ্রষ্টদের পথ আমরা চাইনা”।
.
শেষোক্ত আয়াত থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ ম্যাসেজ আমরা পাই। তা হলো- হকপথ একটি, তবে এই পথের পথিক অনেক। এই পথিকদের কাঁধেই সিরাতুল মুস্তাকীমের বহির্শত্রু দমনের দায়িত্ব অর্পিত। হকপন্থীরা সবাই যে এক কাফেলায় করে হকের পথ অতিক্রম করবে তা না, হতে পারে তাদের তিনটি কাফেলা। যখন যে কাফেলা শত্রুর সম্মুখীন হবে বাকী দুই কাফেলা তাঁর দুই পাশে এসে দাঁড়াবে।
.
ইসলামের আক্বীদার প্রধানতম উদ্দেশ্যই এটা যে ইসলামের মূলধারার বাহিরে যাদের অবস্থান তাদেরকে প্রতিহত করা। নিজেদের মধ্যে শক্তিক্ষয় করা নয়।
.
সূরা ফাতিহা তথা ‘আসাস’ এর মজবুত শিক্ষা আমাদেরকে নিয়ে যাক মানযিলে মাকসুদে। আমীন।

  • ২৭/০১/২০২০

Share with your friends

Share on facebook
Facebook
Share on twitter
Twitter
Share on skype
Skype
Share on whatsapp
WhatsApp
Share on email
Email
Share on print
Print

Write your comment below